দায় নিতে হবে ক্ষমতাসীনদেরও

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:০০ এএম

ক্ষমতায় থাকার জন্য একটি রাজনৈতিক দল নানা কৌশলের আশ্রয় নেবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের দেশে এই কৌশলটা অনেক ক্ষেত্রেই হয় চরম। মেরে-কেটে, হামলা করে মামলা দিয়ে, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ব্যবহার করে বিরোধী দলের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ক্ষমতায় থাকার জন্য সামরিক শাসকরা এমন পথ অবলম্বন করেছে। গণতান্ত্রিক তকমাধারী রাজনৈতিক দলগুলোও একই কাজ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বর্তমান শাসক দলও ব্যতিক্রম নয়।

দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক উত্তেজনাও তত বাড়ছে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও সঙ্গীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি ঘোষণা করছে। এসব কর্মসূচিকে ঘিরে গাড়িতে আগুন দেওয়া, বোমা নিক্ষেপ, হামলার ঘটনাও ঘটছে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহিংস ঘটনার দায় চাপানো হচ্ছে, বিএনপি ও তার রাজনৈতিক মিত্রদের ওপর। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের ঘটনার দায় কি কেবলই বিএনপির? বিএনপির এই সহিংস হয়ে ওঠার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের কি কোনো দায় নেই? বিএনপি কেন আন্দোলনমুখী হয়েছে? কেন তারা সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো কি অবান্তর?

টানা তৃতীয় মেয়াদ ধরে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। এই দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে তারা তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দেশের একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের দাবি-দাওয়াকে উপেক্ষা করা, নানা কৌশলে তাদের রাজপথে ঠেলে দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীনরা দায় এড়াতে পারে না। দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রাখা, বিরোধী পক্ষের যৌক্তিক দাবি-দাওয়াকে বিবেচনায় নিয়ে বিরোধ-বিসম্বাদ মিটিয়ে সবাইকে নিয়ে পথ চলাটা ক্ষমতাসীনদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সক্রিয় ও শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব অনিবার্য। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা একদলীয় ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার মিশন নিয়েই যেন মাঠে নেমেছে। বিরোধী দলের প্রতি তাদের মনোভাব ও আচরণ দেখে তাই-ই মনে হয়। নির্বাচন নিয়ে অস্থির ও সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ চাপকে পাশে ঠেলে বীরদর্পে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার আগ্রহ তাদের মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে না। এর আগে ২০১৪ সাল এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল দেশে-বিদেশে। সে জন্য এবার বেশ আগে থেকেই আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন সময় অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সবার সব পরামর্শকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নির্বাচনব্যবস্থা ও নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে রাখার বিধিব্যবস্থা পাকা করার পথেই হেঁটেছে। 

নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন করে। নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৪ সালে বিএনপি এবং তার মিত্ররা বর্জন করায় একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ওই সময় বিদেশিদের মধ্যস্থতায় দেনদরবার হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি অনড় থাকায় এবং আওয়ামীল লীগ তা না-মানার ব্যাপারে অটল থাকায় তা ভেস্তে যায়। ২০১৮ সালে বিএনপিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ হয়েছিল। অনেক নাটকীয় ঘটনার পর ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণও করে। নির্বাচনের পর ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। বিএনপি বিভিন্ন উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনও বর্জন করে। তখন থেকে বিএনপিসহ তার মিত্ররা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশ কিছু শক্তিশালী দেশও বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা সরকারকে জানিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র গত ২৪ মে বাংলাদেশের জন্য ঘোষণা করেছে নতুন ভিসা নীতি। কিন্তু সরকার নিরপেক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে সংবিধান অনুযায়ী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে। 

ক্ষমতাসীনরা কখনই বিরোধী দলের কথা শোনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়নি। তাদের নিয়মতান্ত্রিক সভা-সমাবেশেও বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। নিত্যনতুন মামলা দিয়ে, পুরনো মামলায় হুলিয়া জারি করে, গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে, দলের আজ্ঞাবাহী পরিবহন নেতাদের দিয়ে ধর্মঘট ডেকে বিরোধী দলের আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জনসমাগম ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায়ে বিএনপির ডাকা মহাসমাবেশ টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। বিএনপির সমাবেশ পণ্ড হওয়ার পটভূমিতে দলটি ও তার সহযোগীরা হরতাল ও অবরোধের যেসব কর্মসূচি দিয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায়ও পুলিশকে একটু বেশিই মারমুখী হতে দেখা গিয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদও বিবৃতি দিয়ে পুলিশের শক্তি প্রয়োগে আইনের মূলনীতি অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। মিছিল, হরতালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন যেকোনো দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই রাজনৈতিক কর্মসূচি যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে, তা খেয়াল রাখা সরকারের কর্তব্য। কিন্তু মিছিল দেখলেই পুলিশকে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে, তা মোটেও স্বাভাবিক নয়। বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদ জানানোর স্বাভাবিক পথকে শক্তি প্রয়োগে রুদ্ধ করার অর্থ হচ্ছে তাদের অস্বাভাবিক পথে ঠেলে দেওয়া, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

নানা কারসাজির কারণে দেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের পথও রুদ্ধ হয়ে গেছে। গণহারে নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের কাছে আপসরফা অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দল নৈরাজ্যের পথ বেছে নিলে, এর দায় কি ক্ষমতাসীনদের কাঁধে বর্তায় না? আওয়ামী লীগ যদি তার সরকারের অধীন নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড় থাকে এবং সেই নির্বাচনকে যদি গ্রহণযোগ্য করতে চায়, তবে তাতে বিএনপির অংশগ্রহণ লাগবেই। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে সেটা অংশগ্রহণমূলক হবে না। তাতে বৈধতার সংকট সৃষ্টি হবে। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনদের বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে একটি তুলনামূলক ‘ভালো’ নির্বাচন করা যায়, তার পথ খুঁজে বের করতে হবে। মনে রাখতে হবে- রাজনীতির পরীক্ষা হয় রাজপথে, আন্দোলনে, নির্বাচনে ও যুক্তিতে। এখানে পরাজয় আছে, জয়ও আছে। পরাজিত হলে যেমন দায়িত্বশীল হওয়া দরকার, জয়ী হলেও তা দরকার। রাজনীতিতে ঐকমত্যের বদলে বিভেদের পথ প্রশস্ত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠায় জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কেবলই দূরে সরে গেছে। দেশ শাসনে সুশাসনের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ অবস্থায় রাজনৈতিক বাহাস, ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাদ দিয়ে একটা আপস-মীমাংসার পথে অগ্রসর হতে হবে। আমরা যদি গণতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পথ চলা মসৃণ হবে না। প্রতি কদমে বাধাগ্রস্ত হতে হবে।

গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, নির্বাচন হলো ‘গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা’। সে নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও স্বচ্ছ। যে দেশে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, জবরদখল ও কারসাজি হয় সেটিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় না। নির্বাচনে মানুষ ভোট দেবে অবাধে, ভোট গণনা হবে নির্ভুলভাবে, ফলাফল ঘোষিত হবে যথাযথভাবে এবং মানুষ তা মেনে নেবে নির্বিবাদে। এমন একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে তারা বিএনপির চেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় আছে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের পথে হেঁটে তাদের বর্জন-হরতাল-অবরোধ ও নৈরাজ্যের পথে ঠেলে দেওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ যদি তার দায়িত্ব ঠিকঠাক মতো পালন করে, আপস-মীমাংসার পথে এগিয়ে যায় তাহলে আগামী দিনের রাজনীতিতে তারাই টিকে থাকবে।

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত