শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) উপাচার্য হিসেবে গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভুঁইয়া তিন বছর সম্পন্ন করেছেন। গেল তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে ভূমিকা রাখায় তিনি সুনাম অর্জন করেছেন।
উন্নয়ন পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলো, কতটুকুই বা বাকি রইলো সেসব নিয়েই অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভুঁইয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো. এমদাদুল হক।
দেশ রূপান্তর: বিগত তিন বছরে উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
উপাচার্য: আমি করোনা মহামারি চলাকালে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর শেকৃবির উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করি। এখানে আগে থেকেই সেশনজট ছিল। করোনার কারণে তা আরো বাড়ে। আমি উপাচার্য হিসেবে প্রথমেই সেশনজট কমানোর দিকে নজর দেই। এ লক্ষ্যে সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শেকৃবি অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা চালু করে। এখন সেশনজট অনেকটা হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। কৃষি শিক্ষাকে আরো যুগোপযোগী করতে আমরা দুটি নতুন বিভাগ চালু করেছি। এগ্রি জার্নালিজম ও ফুড সেফটি নামক বিভাগ দুটিতে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। আগামীতে এগ্রি মেটিওরোলজি বিভাগ চালু করা হবে। বিশ্বব্যাপী এ বিষয়গুলোর চাহিদা বিবেচনা করেই চালু করা হয়েছে।
আমি যখন উপ-উপাচার্য ছিলাম তখন ইনস্টিটিউট অব সিড টেকনোলজি চালু করি। সেটা এ বছরই স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউটে পরিণত হবে। ক্লাসরুমগুলোকে সংস্কার করে আরো পাঠদান উপযোগী করা হয়েছে। তবে বাজেট স্বল্পতায় সাউন্ড সিস্টেম মেরামত করা হয়নি, আগামীতে করা হবে। মাস্টার্সে ভর্তি সিস্টেম ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে এনরোলমেন্ট এবং ফরম পূরণ করা যায় এখন। আগামী সেমিস্টার থেকে অনলাইনে ফি জমা দেওয়া যাবে। ফলে এসব কাজে শিক্ষার্থীদের জটিলতা অনেকটা কমেছে। ১৯৩৮ সালে নির্মিত কৃষি অনুষদ ভবনটি ঝুাঁকপূর্ণ। এটি পুনঃনির্মাণের পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হয়েছে।
দেশ রূপান্তর: বর্তমান প্রশাসনের হাত ধরে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কতোটুকু অগ্রগতি হলো?
উপাচার্য: শিক্ষকদের গবেষণায় আগ্রহী করতে আমরা ‘অ্যানুয়াল রিসার্চ রিভিউ সিস্টেম’ চালু করেছি। এখানে বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত গবেষকরা উপস্থিত থেকে রিভিউ করে পরামর্শ দিয়ে থাকে। ভালো গবেষকদের প্রজেক্ট বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ ছাড়া আমার সময়ে ‘বহিরাঙ্গণ কার্যক্রম’ বিভাগ আগের চেয়ে অনেক সক্রিয় করা হয়েছে। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানের কৃষকদের মাঝে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ বিভাগ কর্তৃক ‘কৃষি প্রযুক্তি’ বই বের করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আগ্রহীরা শেকৃবি কর্তক উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারছে।
এ ছাড়াও ওয়াজেদ মিয়া কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এখন অনেক জটিল কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস শেকৃবিতে করা সম্ভব হচ্ছে। নতুন করে আধুনিক ফুড সেফটি গবেষণাগার তৈরি করা হয়েছে। শেকৃবির মৎস্য গবেষণায় উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। শেকৃবি কর্তৃক বেশকিছু নতুন প্রজাতির মাছ শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও আমার দায়িত্বকালে টুনা ও ইলিশ মাছ কৌটাজাতকরণে সাফল্য পেয়েছে শেকৃবি। এ খাতের গবেষণায় আরো গতি আনতে তিনটি ফিশারিজ গবেষণা পুকুর প্রস্তুত করা হচ্ছে। যুগোপযোগী পশু চিকিৎসক গড়তে ভেটেরিনারি ক্লিনিক ও আধুনিক পোল্ট্রি শেড নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও শেখ সায়েরা খাতুন হলের সামনের কিছু পরিত্যক্ত জায়গায় মাটি ভরাট করে গ্রিন হাউজ নির্মাণ করা হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর: গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষকরা অভিযোগ করে থাকেন। এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে কি না?
উপাচার্য: ইউজিসি থেকে গবেষণার জন্য যে বাজেট দেওয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয়। তারা বরাদ্দ বাড়ালে আমরাও বাড়াতে পারব। তা ছাড়াও আমরা বেশি সংখ্যক শিক্ষকদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রজেক্ট বরাদ্দ করে থাকি। ফলে গবেষকরা কম বাজেট পেয়ে থাকেন। কিন্তু বাইরের বিভিন্ন প্রজেক্টে আমাদের শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে থাকি। সেখান থেকে বড় বাজেট তারা পেয়ে থাকেন।
দেশ রূপান্তর: ভেটেরিনারির শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেলেও কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীরা পায় না। এ বিষয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
উপাচার্য: আমরা অ্যাক্রিডিটেশন পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। এজন্য কিছু খাতে ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি। তার মধ্যে কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ চালুর বিষয়টাও আছে। আগামীতে ৬ মাস মেয়াদি ইন্টার্নশিপ চালু করা হবে। ইন্টার্নশিপ চলাকালে শিক্ষার্থীরা ভাতাও পাবে।
দেশ রূপান্তর: বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে প্রশাসন থেকে আগের মতো সহায়তা পাওয়া যায় না বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। আসলে বাস্তবতা কী?
উপাচার্য: সরকার সকল খাতে আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। তাই আমরাও ব্যয় সংকোচন করেছি। তবে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আমরা সাধ্য আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতা করে থাকি।
দেশ রূপান্তর: টিএসসির কক্ষ কেন সংগঠনগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না?
উপাচার্য: আগের উপাচার্যের সময় অপরিকল্পিত টিএসসি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৩০টির মতো সংগঠন আছে। কিন্তু ওই ভবনে সংগঠনগুলোর জন্য কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে মাত্র ২টি। এখন আমরা পরিকল্পনা করেছি যখন যে সংগঠনের কক্ষ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করবে। কোনো সংগঠনের জন্য টিএসসিতে আলাদা কোনো কক্ষ থাকবে না।
দেশ রূপান্তর: নিরাপদ ক্যাম্পাসের প্রতিশ্রুতি কতোটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলো?
উপাচার্য: নিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিটি হল, আবাসিক ভবন, ফ্যাকাল্টি ভবন, রাস্তা, গেটসমূহ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকে। চুরি আগের চেয়ে কমেছে। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরাপত্তা বিভাগের তত্ত্বাবধানে হটলাইন চালু করা হয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডির তৎপরতায় মাদকের বিস্তার কমেছে। গণরুম তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শতভাগ নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রতি বছর ভর্তি চলাকালে আঞ্চলিক গ্রুপের সংঘর্ষ হতো। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি। বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ হওয়ার উপক্রম হলেও আমরা তা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। প্রভাবশালীদের চাপ থাকা সত্ত্বেও বস্তির পরিসর কমিয়ে আনা হয়েছে। আমি বস্তি বিস্তৃত হতে দিইনি।
দেশ রূপান্তর: আপনার সময়ে সৌন্দর্য বর্ধনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে নান্দনিক রূপদান করা হয়েছে। তবে একমাত্র খেলার মাঠ আগের মতোই রয়েছে। এটা সংস্কার করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
উপাচার্য: সরকারের অনুমতি ছাড়াই আগের প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরির কাজ শুরু করেছিল। এক কোটি টাকার বেশি খরচ করার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। আমি পরে অনুমতি নিয়ে ভাস্কর্যের পরিবর্তে ম্যুরাল তৈরি করেছি। ফলে কোটি টাকার লোকসানের হাত থেকে ভার্সিটিকে বাঁচাতে পেরেছি। এ ছাড়াও উপাচার্যের বাসভবনের পেছনের পরিত্যক্ত অংশ মাটি ভরাট করে শিশু পার্ক করেছি, প্রতিটি পরিত্যক্ত ভবন ভেঙে পরিচ্ছন্ন মাঠ করেছি, টিএসসির সামনের অপ্রয়োজনীয় ভবন ও জঙ্গল কেটে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে, ক্যাম্পাস জুড়ে বড় বড় টবে ও মাটিতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে নান্দনিক রূপদান করেছি। ক্যাম্পসের কোথাও ভাঙা রাস্তা নেই। বাজেট পেলে খেলার মাঠও সংস্কার করা হবে।
দেশ রূপান্তর: সমাবর্তন আয়োজনের কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
উপাচার্য: সমাবর্তন করতে গেলে বড় বাজেটের প্রয়োজন। সেটা পেলে আমরা আয়োজন করব।
দেশ রূপান্তর: আপনার পরিকল্পনার কতোটুকু বাস্তায়ন করা সম্ভব হলো?
উপাচার্য: আমার পরিকল্পনার অনেকাংশ বাস্তবায়ন করেছি। আগামী এক বছরে গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়ক একটি ইনস্টিটিউট ও ‘এগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং’ অনুষদ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়াও গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য নতুন ক্যাম্পাস তৈরির লক্ষ্যে একশত একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। আমি স্বপ্ন দেখি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবে দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকে কৃষির যুগোপযোগী জ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন হবে। যা সারা বিশ্বের কৃষিতে নবজাগরণ সৃষ্টি করবে।
দেশ রূপান্তর: ব্যস্ততার মাঝে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
উপাচার্য: আপনাকেও ধন্যবাদ, দেশ রূপান্তরের জন্য শুভ কামনা।
