চতুর্থ দিন ১১৩ রানে নিউজিল্যান্ডের ৭ উইকেট তুলে নিয়ে সিলেট টেস্ট জয়ের আয়োজনটা সেরেই রেখেছিল বাংলাদেশ। দেখার ছিল শেষ তিন উইকেট কতটা দ্রুত নিতে পারেন তাইজুলরা। গতকাল সকালে ঘণ্টা দেড়েকের মতো সময় লাগল কিউইদের ১৮১ রানে মুড়িয়ে দিতে। ১১টার দিকে তাইজুল ইসলামের বল ইশ শোধির ব্যাট ছুঁয়ে যখন শর্ট কভারে দাঁড়ানো জাকির হাসানের হাতে চলে গেল, সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আঙিনা উদযাপনের মঞ্চ বানিয়ে ফেলল বাংলাদেশ। তবে সে উদযাপনে ছিল পরিমিতিবোধ।
বিশ্বকাপে ভরাডুবিতে সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ দল। কারও দূর ভাবনাতেও ছিল না নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে টেস্ট জিততে পারবে। মাঠের বাইরের নানান আলোচনা আর অক্রিকেটীয় নানান পরিস্থিতিতে টালমাটাল ছিল বোর্ড। তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবে পড়েছে ক্রিকেটারদের মস্তিষ্কে। কিন্তু সিলেটে অবিশ্বাস্য জয়ে সেই গুমোট আবহ থেকে বেরুনোর রাস্তা পেলেন তারা।
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে অভিব্যক্তি প্রকাশ শেষে যখন ড্রেসিংরুমে ফিরছিলেন শান্ত, তখন সতীর্থদের কাছ থেকে পেয়েছেন অভিবাদন। আর পাবেনই বা না কেন! অধিনায়কত্বের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি আর দিনশেষে জয়ের সৌরভ। সব মিলিয়ে শান্তর খারাপ থাকার কোনো কারণ অবশ্য নেই। তবে সংবাদ সম্মেলনে এসে মাটিতে পা রেখেই কথা বলেছেন অধিনায়ক, বললেন ‘অর্ধেক কাজ শেষ, এবার ঢাকা টেস্ট।’
সংবাদ সম্মেলন শেষে ড্রেসিংরুমের পথ ধরার সময় শান্তর চওড়া হাসিতে বোঝা গেছে বাড়তি আত্মবিশ্বাসী এখন এই দলটা। তবে দলের অন্য সব সদস্য উদযাপন সেরেছেন সাদামাটাভাবেই। তবে ১০ উইকেট শিকারে ম্যাচসেরা তাইজুল নিজের উদযাপনে রেখেছিলেন ভিন্নতা। ম্যাচ শেষের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেন্টার উইকেটে এসে ছবি তুলেছেন গ্রাউন্ডসম্যানদের সঙ্গে। তাইজুলকে পেয়ে ফ্রেমবন্দি করে রাখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি কেউ। সেন্টার উইকেটে তখন ৫-৬ জন গ্রাউন্ডসম্যান কিউরেটরের পরামর্শে উইকেটে রোল করার প্রস্তুতি সারছিলেন। তখন তাইজুলের উপস্থিতি তাদের মুখের হাসিকে করে দিয়েছে চওড়া। মাঠের অন্য প্রান্তে থাকা কয়েকজন গ্রাউন্ডসম্যানও দৌড়ে আসেন তাইজুলের এমন উদযাপনের সঙ্গী হতে।
ফ্রেমবন্দি হয়ে তাইজুলের ফিরে যাওয়ার সময় সংবাদমাধ্যম তাকে ঘিরে ধরলে জানান নিজের অনুভূতি। সিলেটে টানা দ্বিতীয় টেস্টে ১০ উইকেট শিকার করা এই স্পিনার সিরিজের বাকি টেস্টের ওপর চোখ রাখছেন। হয়তো উদযাপনটা আর সবার মতো তিনিও মিরপুরের জন্যই তুলে রেখেছেন!
ড্রেসিংরুমে নিজেদের ক্রিকেট সরঞ্জাম গোছাতেই ব্যস্ত যখন ক্রিকেটাররা তখন তাদের উদ্দেশ্য করে মাঠে আসা শ’খানেক দর্শকের গলা ফাটিয়ে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ চিৎকারের ধ্বনি ভেদ করতে পারেনি ড্রেসিংরুমের কাচের দেয়াল। তবুও এমন জয়ের পর স্টেডিয়ামের তপ্ত রোদকে উপেক্ষা করে তাদের সেøাগান যেন ক্রিকেটারদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা। তাইতো কয়েকজন ক্রিকেটার হাত নেড়ে তাদের জানালেন শুভেচ্ছা। গ্যালারি থেকে, কেউ কেউ দূর থেকেই তোলার চেষ্টা করলেন সেলফি।
এমন জয়ের দিনে সাদামাটা উদযাপনে অন্যতম আকর্ষণ মমিনুলের সেলফি। দুই ইনিংসে দারুণ শুরুর পরও নিজের স্কোর বড় করতে পারেননি এই ব্যাটার। তাতে কী, ম্যাচ জিতে ফেরার চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে! আর প্রতিপক্ষ যদি হয় নিউজিল্যান্ডের মতো কোনো দল, তাহলে তো আর কথাই নেই। ম্যাচ শেষে পুরো দলকে নিয়ে তার তোলা সেলফিতে ক্রিকেটারদের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট, উদযাপনে পরিমিতিবোধ থাকলেও ভেতরে ভেতরে কতটা রোমাঞ্চিত টাইগাররা।
সাকিব নেই, নেই লিটন। অনেকটা বাধ্য হয়েই শান্তকে অধিনায়কত্ব দেয় বোর্ড। আর সেই শান্ত অধিনায়কত্বের প্রথম টেস্ট জিতে উঠে গেলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়। সংবাদ সম্মেলন কিংবা পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে অধিনায়ক হিসেবে নিজের টেস্টের শুরুর গল্পের এমন মঞ্চায়নে আবেগের বহিঃপ্রকাশ না ঘটালেও ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের নিয়ে উদযাপনে মেতেছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ড্রেসিংরুমে সবাইকে নিয়ে তোলেন ছবি। পোস্ট করেন নিজের ফেসবুক পেইজে।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় চক্রের শুরুর ম্যাচে এমন জয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচটা মিরপুরে টাইগারদের জন্য হতে পারে ইতিহাস গড়ার মঞ্চ। যদি শেষ পর্যন্ত যদি ম্যাচটা নিজেদের করে নেওয়া যায় তবে বড় দলের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় পাওয়া যাবে। তাই চূড়ান্ত উদযাপনটা না হয় মিরপুরের জন্যই তোলা থাকল!
