ডিসেম্বর মাস, বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিজয়ের মাস, স্বাধীনতার মাস। আর আমাদের ভারতীয়দের কাছে এই মাস নিঃসন্দেহে বিষাদ, শোকের মাস। ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর পৃথিবীর অন্যতম বড় শিল্প দুর্ঘটনা ঘটেছিল মধ্যপ্রদেশের ভুপাল শহরে। গ্যাস লিক করে মৃত্যু হয়েছিল হাজার হাজার শ্রমিকের। ঘটনার পঁচিশ বছর পরে আমি যখন দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় যাই, তখনো সেখানে জনমনে ছিল শোকের ছায়া।
বলছি বটে দুর্ঘটনা, কিন্তু তথ্য-টথ্য ঘেঁটে যে কেউই একমত হবেন যে, এ কোনো মামুলি দুর্ঘটনা ছিল না। বহুজাতিক কোম্পানির ঔদাসীন্য ও অবহেলায় ভুপালের পরিস্থিতি হয়েছিল দ্বিতীয় হিরোশিমা, নাগাসাকির মতো ভয়াবহ। দোসরা ডিসেম্বর রাতের কাহিনী বলতে বলতে এখনো স্থানীয় মানুষজন ক্ষোভে, আতঙ্ক ও ক্রোধে ফেটে পড়েন। বহুবার সতর্ক করার পড়েও আমেরিকার ইউনিয়ন কার্বাইড কর্তৃপক্ষ শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন ছিলেন বলেই অত বড় ঘটনা ঘটেছিল। পঁচিশ বছর পরেও আসল অপরাধীদের সেভাবে কোনো শাস্তি হয়নি। আহতদের যেটুকু যা ক্ষতিপূরণ মিলেছিল তা নিতান্তই কম। তাও দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর গড়ে ওঠা একাধিক অধিকার আন্দোলনের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ফলে।
ওই রাত, এখনো ভুলতে পারেন না পুরনো ভুপালের মানুষ। শীতের রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জনগণের আচমকাই হুঁশ ফিরেছিল, ‘ভাগো’, ‘ভাগো’ চিৎকারে। সাদা ধোঁয়া নিমেষে ঢেকে দিয়েছিল পুরো মহল্লা। গ্যাসের জ্বালায় ছুটতে ছুটতে মুহূর্তে রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়েছিলেন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। কোলে শিশু নিয়ে মা। স্বামীর হাত ধরে নতুন বিয়ে করা স্ত্রী। বৃদ্ধ মা, বাবার হাত ধরে সন্তান ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। অসংখ্য গবাদি পশুর কথা না হয় না-ই লিখলাম।
আজ, এত বছর বাদেও গ্যাসের বিষে জন্ম নিচ্ছে বিকলাঙ্গ শিশু। কত কত শ্রমিক কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছেন অকালেই। একটা পুরো প্রজন্ম শেষ হয়ে গিয়েছিল যে দুর্ঘটনায়, তাকে নিছক অ্যাক্সিডেন্ট বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ নিশ্চিত এক অর্থে জেনোসাইড বা গণহত্যা। এখনো পরিষ্কার হলো না, ইউনিয়ন কার্বাইডে ঠিক কোন ধরনের গ্যাস তৈরি করা হতো! ওই সময়েই পাঞ্জাবে সবুজ বিপ্লবের সূচনা। বিপ্লব সংঘটিত করতে যে বিপুল পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হতো উৎপাদন বাড়াতে, ভুপালের গ্যাস কোম্পানির তার রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করার সম্ভাবনা, উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সবুজ বিপ্লব নিঃসন্দেহে ভারতের শস্য উৎপাদনে রাতারাতি রেভলিউশন এনেছিল এটা ঠিক। কিন্তু পাশাপাশি জন্ম দিয়েছিল বহুবিধ সমস্যার।
সমাজতাত্ত্বিক বন্দনা শিবার চমৎকার একটি বই আছে, ‘টেররিজম অব গ্রিন রেভলিউশন’। তাতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সবুজ বিপ্লব পরবর্তী পাঞ্জাব ‘চরমপন্থি’ খালিস্তান আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে কীভাবে ক্যানসার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে। ওই মারণ গ্যাসের জন্মকাহিনি লুকিয়ে আছে ভুপালের বহুজাতিক কারখানায়।
উন্নত প্রযুক্তি আমাদের নিশ্চিত অনেক বিষয়ে স্বনির্ভর করেছে। অর্থনীতি মজবুত করেছে। দেশে খাদ্য সংকট এখন আর নেই। এ সবই ইতিবাচক। পাশাপাশি তথাকথিত উন্নয়ন এদেশে অনেক বিপদ ডেকেও আনছে। এদেশের শিল্প দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। এই তো কয়েকদিন আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের প্রকল্প চারধামের জন্য পাহাড় কাটতে গিয়ে একচল্লিশ জন শ্রমিক সুরঙ্গের মধ্যে আটকে চরম বিপদের মুখে পড়েছিলেন। নির্মাণ প্রকল্প কিংবা পরিবহন অথবা আজকের অ্যাপ নির্ভর হোম ডেলিভারি সব ক্ষেত্রেই শ্রমিক সুরক্ষা অবহেলিত। শ্রমিকদের যাবতীয় অধিকার সারা দুনিয়াতেই আজ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আট ঘণ্টা কাজ এখন কোথাও সেভাবে মানা দূরে থাক, চিন্তাও করা হয় না। করপোরেট দুনিয়ার চাকরিজীবীদের তো মোটা বেতনের আধুনিক শ্লেভ ভাবা হয়। অসংগঠিত শিল্পব্যবস্থায় নতুন নামে পুরনো মহাজনী নীতি ফিরে আসছে।
মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের রেজাল্ট বের হচ্ছে আজ। বিজেপির জয়জয়কার সর্বত্রই। বাজির আওয়াজ আর জয় শ্রীরাম চিৎকারে ধামাচাপা পড়ে যাবে ভুপাল গণহত্যার কান্না, হাহাকার, বিষাদ। ঠিক যেমন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক কালো অধ্যায়কে মুছে ফেলা হচ্ছে। কেউ ভোলে, কেউ ভোলে না বাবরি মসজিদ কীভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষে নিঃসন্দেহে শোকের দিন। আজ ভারতে নব্য যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির রমরমা, তার পেছনে, লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে রাম রথযাত্রা, বাবরি মসজিদ ভাঙা ও গুজরাট গণহত্যার ভূমিকা বিরাট। ধর্মনিরপেক্ষ দেশে খোলাখুলি যারা প্রাচীন, ঐতিহ্যশালী এক স্থাপত্য ভাঙে, তারা ক্ষমতায় এসে দেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি বাদ দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটাবে এটাই তো স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হচ্ছে সাধারণ মানুষের বড় অংশের ভেতর ইতিমধ্যেই এই বিদ্বেষ বিষ চারিয়ে যাওয়া।
কয়েক বছর আগে, তখনো বাবরি ধুলোয় মিশে যায়নি। আওয়াজ উঠত, ‘এক ধাক্কা ঔর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো’। তার পরের ঘটনা তো সবার জানা। এখন নতুন ধ্বনি উঠছে, ‘ইয়ে তো স্রেফ ঝাঁকি হায়, কাশি মথুরা বাকি হ্যায়’। কত কিছু দেখার ও শেখার এখনো যে বাকি তাই বসে বসে ভাবি। মহাকাব্যের সর্বজনপ্রিয় এক চরিত্র কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে তাও আগে কখনো বুঝিনি। আগামী জানুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে উদ্বোধন হবে কয়েকশো কোটি টাকার রাম জন্মভূমি। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠবে, জয় শ্রীরাম। ইতিহাস মুছে ফেলা হবে নির্মমভাবে।
লেখক : প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
