সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে গত ৩০ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ২৮তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনটি চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারের সম্মেলনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ যেমন খরা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবদাহ ইত্যাদি নানা কারণে পৃথিবী বিপর্যস্ত। আবার এল নিনোর কারণে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের উষ্ণ তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত পৃথিবীর উষ্ণতার রেকর্ড ভেঙে চলছে, পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে বরফগুলো দ্রুতগতিতে গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে যার ভুক্তভোগী বাংলাদেশের মতো সমুদ্র উপকূলীয় দেশগুলো।
এই মুহূর্তে জলবায়ু সম্পর্কিত আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে কার্বন নির্গমনের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনা। সেই বিবেচনায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জলবায়ু অভিযোজন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, পৃথিবীর কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করা। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পৃথিবীব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ত্বরান্বিত করা। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ২৬তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন থেকে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠন নিয়ে দাবি ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনা জোরদার হচ্ছে। তবে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর ক্ষয়ক্ষতি তহবিল সম্পর্কিত আলোচনার পালে হাওয়া লাগলেও এখনো সুনির্দিষ্টভাবে এই কাঠামো নির্ধারণ ও তহবিল গঠন করা সম্ভব হয়নি। গত বছর মিসরের শারাম আল শেখ-এ ২৭তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে এমন প্রত্যাশা করছে সবাই।
অন্যদিকে কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনতে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিপরীতমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ইউরোপের কয়েকটি দেশ জ্বালানি উৎপাদনে কয়লার বাড়িয়েছে যার মধ্যে জার্মানি অন্যতম। অস্ট্রেলিয়ার কার্বন নির্গমন ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৩ শতাংশ কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকছে। বিবিসি জানাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকরা কয়লা নিয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। এই ধরনের পরিস্থিতি জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি বিপরীতমুখী যাত্রা। প্যারিস চুক্তিতে প্রতিশ্রুত ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণে নিরপেক্ষ অবস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে যা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। কার্বন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বিশ্ব যত দেরি করব ততোধিক বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যাবে।
ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও তহবিল গঠনের জন্য বিশ্বব্যাপী কার্বন কর আরোপের ক্ষেত্রে নানা পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর উইন্ডফল বা দৈবলাভ কর আরোপ নিয়েও দাবি উঠছে। কার্বন কর আরোপের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলো ও জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে এক্ষেত্রে দায়বদ্ধ করতে হবে। কিন্তু এই দায়বদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলো এখনো এই ধারণার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। এদের কেউ কেউ কার্বন নিঃসরণ সীমিত করার জন্য কার্বন ক্যাপচার বা কার্বন ধরে রাখার কথা বলছে। সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় দুবাই জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি সুলতান আল যাবের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ফেইজ আউট না করে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন সরিয়ে নেওয়া ও গুদামজাত করার প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। এর আগে আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ফেইজ আউটের পরিবর্তে ‘ফেইস ডাউন’ শব্দ শুনেছি। ইতিমধ্যে কার্বন ক্যাপচার ও কার্বন স্টোরেজকে বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভুল সমাধান হিসেবে দেখছেন। এই প্রযুক্তি ব্যয়বহুল ও বিস্তৃত পরিসরে বাস্তবায়নযোগ্য না। অনেকে এটাকে অন্যায্য হিসেবে বলছে, বর্তমান প্রজন্মের দায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এবং সর্বোপরি কার্বন নিঃসরণে ‘নেট জিরো’ প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। অন্যদিকে কার্বন ধরে রাখার বিনিময়ে দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা কার্বন ক্রেডিট বিক্রি সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিতর্কের কারণে কার্বন ক্রেডিট পরিচালনাকারী ও নিরীক্ষা সম্পর্কিত সংস্থা ভেরা-এর প্রধান বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন এই বছর।
এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্ব উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি ও কার্বন ক্রেডিটের বাণিজ্যের এই লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটকালীন মুহূর্তে এই ধরনের ভুল সমাধানের মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। ২৮তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এ সম্পর্কে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সক্রিয় হওয়া দরকার যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়া গতিশীল করতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্ভাবনা অনেক কিন্তু তার জন্য এই দেশগুলোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর দরকার। বিশ্বে ৭৫ শতাংশ গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী এই জীবাশ্ম জ্বালানি। এখন বিশ্ব উষ্ণায়নের গতি কমিয়ে আনার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত ও ন্যায্য উপায়ে কমিয়ে আনতে হবে। এবারে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করার জন্য জোরদার দাবি উত্থাপন করা দরকার।
এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে তহবিল সম্পর্কিত আলোচনা সম্মেলনের কেন্দ্রীয় বিষয় হতে যাচ্ছে। যা ইতিমধ্যেই বোঝা যাচ্ছে। যার একটি বিষয় হচ্ছে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও অন্যটি জ্বালানি ব্যবস্থার টেকসই রূপান্তর। এর আগে জলবায়ু তহবিল নিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বছরে উন্নত দেশগুলোর ১০০ বিলিয়ন ডলারের সংস্থান করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা দীর্ঘদিন অপূর্ণ থেকে গেছে, এবার তা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ইতিমধ্যে এর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এক সমীক্ষা মতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ২০৩০ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি বছর ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল দরকার। আপাত দৃষ্টিতে এই পরিমাণটা বিপুল হলেও এর সংস্থান করা মোটেও অসম্ভব না যেখানে আইএমএফ-এর তথ্য মতে ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী ৭ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে যা ২০২০ সালের তুলনায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার বেশি। আইএমএফ-এর এই সমীক্ষা মতে ২০৩০ জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ৮.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও এ সংক্রান্ত যাবতীয় গৃহীত পদক্ষেপের পর্যালোচনা, যাকে বলা হচ্ছে ‘গ্লোবাল স্টকটেক’। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের গড় উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি বা ২ ডিগ্রির বেশি নিচে রাখার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার বাস্তবায়নে গ্লোবাল স্টকটেক অভিযোজনের পাশাপাশি গ্রিন হাউজ গ্যাস প্রশমনের উদ্যোগকে আরও বেশি জোরদার করবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই আলোচনা করা খুবই দরকার কারণ এটি ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ নেট জিরোতে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে গ্লোবাল স্টকটেক সম্পর্কিত আলোচনা উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিযোজন সম্পর্কিত দাবিকে পাশ কাটানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে সম্মেলনে সে সম্পর্কে উন্নয়নশীল ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিশেষ সচেষ্ট থাকা দরকার।
বিশ্বের অনেক ধনী ও উন্নত দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে আনা ও বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না, এমনকি যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিল তা থেকেও সরে আসছে। বর্তমান সভাপতি, সুলতান আল যাবের, তিনি একটি তেল কোম্পানির সভাপতি বর্তমান জরুরি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তার সফলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায় ধনী দেশগুলো বা তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে কিন্তু তারা জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিচ্ছে না। কার্বন নির্গমনকে কোনো একটি দেশের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা যায় না, পুরো পৃথিবীই কার্বন নিরপেক্ষ হতে হবে, একটি দেশ কার্বন নিরপেক্ষ আরেকটি দেশ অনেক পিছিয়ে আছে এই অবস্থা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করতে পারবে না। এখন এটাই দেখার বিষয় এই বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতৃবৃন্দ কতটুকু জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কতটুকু সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
