যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের স্বার্থ এক নীতি ভিন্ন

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০১:৪৩ এএম

নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বৈশি^ক নীতিতে হাঁটছে প্রায়ই একই পথে। তবে কোথাও কিন্তু আছে, যদি আছে। সেটা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় যেমন প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি ভারতকে অন্ধকারে রেখে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারেও প্রমাণ হয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিলে দুই দেশের দ্বিমতের জায়গাগুলো নিয়ে ফের আলোচনা ওঠে।

দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এন্ট্রি ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে। সময়ে সময়ে এই সম্পর্ক নানাভাবে টার্ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে নিয়ে একটি ‘অফসোর ব্যালান্সার’ হিসেবে ভূমিকা রাখা শুরু করে। ‘অফসোর ব্যালান্সিং’ হলে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে আঞ্চলিক শত্রু মোকাবিলায় আঞ্চলিক বন্ধু তৈরি করে তাকে নিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার পদ্ধতি। ধারণাটি দেন ব্রিটিশ ভারতে সর্বশেষ ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব স্যার ওলাফ ক্যারো। তিনি ১৯৫১ সালে একটি বই লিখেন ‘ওয়েলস অব পাওয়ার’ নামে। সে বইয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ‘অফসোর ব্যালান্সার’ হিসেবে কাজ করতে উৎসাহিত করেছেন। মূলত ব্রিটিশ-মার্কিনিরা পাক-ভারত স্বাধীনতার প্রাক্কালে বুঝেছিলেন নেহরুর ‘উপনিবেশবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি’ তাদের জন্য সুবিধার হবে না। এই ভাবনাকেই ভারত ভাগের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। কারণ আরব সাগর থেকে আন্দামান, লাহোর থেকে আরাকান এত বড় একটি দেশ প্রতিবাদী হয়ে উঠুক, পশ্চিমাবিরোধী হোক, তা চায়নি পশ্চিমারা। ফলে মুসলমানদের ক্ষোভ ও জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্বকে ব্রিটিশ-মার্কিন বলয় লুফে নেয়।

১৯৭১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ১৯৪৭ সালের পর সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। নতুন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছে ‘নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো’ ছিল একই। ১৯৯০-এর দশকে ভারতের একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়। দেশটি ১৯৯১ সালে ‘লিবারেল অর্থনৈতিক পলিসি’ গ্রহণ করে, ফলে জিডিপি প্রায় ৮% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। পরের বছর ১৯৯২ সালের ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরো’ নামে নতুন একটি ব্যুরো চালু করে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশ ও মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দেখভাল করে থাকে। ১৯৯৮ সালের মে ও জুন মাসে যখন ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা প্রদর্শন করল তখন ব্যুরোটির ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়।

আফগানিস্তানে সোভিয়েতের পতন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব কমানোর পাশাপাশি ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেশটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ফলে ২০০০ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে একটা বড় পরিবর্তন দেখা যায়। বছরটির মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২২ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভারত সফর করেন। সে সফরে তিনি পাঁচদিন ভারতে অবস্থান করলেও পাকিস্তানে ছিলেন মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। তিনি মূলত এই সফরে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের হেজেমনিকে স্বীকার করে নেন। কিন্তু তার ১৯ মাস পর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে ১/১১ হামলা  যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ এশিয়াকে নিয়ে নতুন করে ভাবায়। এই ভাবনায় ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এ যুক্তরাষ্ট্র শুধু পাকিস্তান নয় ভারতকেও অংশীদার করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আসলে কেমন বন্ধু হিসেবে চায়? ওয়াশিংটন চায় ভারত তার ‘ব্যান্ডওয়াগন’ হয়ে উঠুক। এটি কূটনীতির একটি টার্ম, যার অর্থ ট্রেনের যেভাবে ওয়াগন বা কামরা একটা একটা যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট পথ অতিক্রম করে সেভাবে একাধিক রাষ্ট্রের একই পথে একই উদ্দেশ্যে হাঁটা। কিন্তু ভারতকে ‘ব্যান্ডওয়াগন’ হিসেবে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা সহজ কাজ নয়। অন্যতম কারণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৯৪৭ সালের পর এই পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অন্তত চারটি যুদ্ধ হয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী মার্কিন সমর্থন পেয়েছে এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়েছে। এছাড়া রাশিয়া, ইরান ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন মহলে অসন্তুষ্টি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে নয়াদিল্লির সন্দেহ ও অবিশ^াস তো রয়েছেই।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালে ভারতের সামরিক বাজেট ৩৫% বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ বিলিয়ন ডলার পার হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল ভারত ছিল বিশে^র সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ এবং তার  ৪৫% এসেছে রাশিয়া থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত ইরান থেকে জ¦ালানি আমদানি বন্ধ করেনি। মিয়ানমারকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দেখে ভারত সেভাবে দেখে না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করতেও ভারত প্রস্তুত। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের শত অনুরোধেও নয়াদিল্লি কোনো পক্ষ নেয়নি। অন্যদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মাধ্যমে তার ‘বার্মা অ্যাক্ট’ বাস্তবায়ন করতে চায়। এর মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমার থেকে চীনের প্রভাবের লাগাম টানতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মিয়ানমার নীতি এক নয়। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দেখার ভিন্নতা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ‘ছোট দেশগুলো’ নিয়েও। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর নানা রকম গুরুত্ব তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরো’তে অন্তত আটটি উপশাখা বা অফিস রয়েছে। সেখানে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান নিয়ে যেমন আলাদা অফিস রয়েছে তেমনি একটি নতুন অফিস হয়েছে যেটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ’ পলিসি নিয়ে কাজ করবে। অফিসটির অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র ও সুশাসনকে প্রাধান্য দেওয়া, মানবিক সহায়তা ও উন্নয়নের অংশীদার হওয়া, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা সহযোগিতা বিনিময়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক বাণিজ্য নিশ্চিত করা। ফলে এই দেশগুলোতে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অন্যান্য ‘সফট পাওয়ার’ চর্চার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একরৈখিক নয়। নেপাল ও ভুটানের সার্বভৌমত্ব ভারতকে সবসময় একটি ডিলেমায় রাখে। অন্যদিকে মালদ্বীপে স্বাধীন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নিয়েও দেশটির উদ্বেগ রয়েছে। ভারত মহাসাগরে ব্রিটিশ দ্বীপ ডিয়াগো গার্সিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও নয়াদিল্লির জন্য সুখকর নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে চীনা উপস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দ্বিমত নেই। তবে কোন প্রক্রিয়ায় তারা এই প্রভাব মোকাবিলা করবে তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ভারত যেমন বাংলাদেশে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে চায় তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশটি তার ‘চিকেন নেক’ ডিলেমা ঘুচাতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য গণতন্ত্র, সুশাসন দিয়ে বাংলাদেশকে চীনের নরম্যাটিভ ও ম্যাটেরিয়াল দুই ধরনের প্রভাব থেকেই দূরে রাখা। দেশ দুটির স্বার্থ একেবারে অভিন্ন নয়। আবার অভিন্ন স্বার্থেও তারা ভিন্ন ভিন্ন পলিসিতে আগাতে চায়। ফলে দেশ দুটির বাংলাদেশ নীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একইভাবে চিন্তা করলেও বাংলাদেশে তা ভিন্ন।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক রিসার্চ স্কলার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত