'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন আমার মতো বিতর্কিত একজনকে মনোনয়ন দেবেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজুবুর রহমানের কন্যা কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন না নিতে পারেন না। আমার মতো একজন বিতর্কিতকে মনোনয়ন দিলে হয়তোবা কিছু প্রশ্ন উঠত। তখন আমি যা করেছি তা আওয়ামী লীগের জন্য ইতিবাচক ছিল না। তবে আমি স্বতন্ত্রভাবে জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনে নির্বাচন করব এবং বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে আমার আসন তুলে দেব' বলছিলেন অডিও কেলেঙ্কারিতে মন্ত্রিত্ব ও দলীয় পদ হারানো সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ডাক্তার মুরাদ হাসান।
আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে মন খারাপ কিংবা অভিমান তৈরি হয়েছে কী না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একদম মন খারাপ নেই আর রাজনীতি অভিমানের জায়গা নয়। আমি মনে করি মানুষকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন না দিয়ে হয়তোবা পরীক্ষা করছেন। দেখুন বিগত সময়ে আমাকে নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমে আমাকে নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা প্রচারিত হয়েছে। এমতাবস্থায় তিনি কেনো একজন বিতর্কিত মুরাদ কে মনোনয়ন দেবেন। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী একদম ঠিক কাজটাই করেছেন। এ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি যদি জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে পারি, মানুষের ভোট পাই এবং আমার ভুল সংশোধন করতে পারি প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় দেখবেন এবং আমাকে ক্ষমা করে দিয়ে কাছে টেনে নেবেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে আমি বিব্রত করেছি কিন্ত তিনি আমাকে ৩বার মনোনয়ন দিয়েছেন, ২বার মন্ত্রী বানিয়েছেন। তিনি আমাকে স্নেহ করেন বলে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেননি এমনকি বহিষ্কারও করেননি।
২০২১ সালে খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে নারী বিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য কড়া সমালোচনা মুখে পড়েন সেসময়ের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মুরাদ। এর কিছুদিন পর চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকে নিয়ে টেলিফোনে অশালীন মন্তব্য ও হুমকি দেওয়ার একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ দুই ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে হয় মুরাদকে।
এ ঘটনার পর তিনি অনেকটা আড়ালে চলে যান। তবে কিছুটা আড়াল হলেও রাজনীতির বাইরে কোনোদিন ছিলেন না বলে দেশ রূপান্তরকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন মুরাদ হাসান। তার আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রস্তুতি, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া, বর্তমান জীবন ও বিতর্কিত সেই সময়সহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ বলেন, অনেকদিন হলো ঢাকায় যাওয়া হয় না, নিজ নির্বাচনী এলাকায় থেকে মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি। দলের মনোনয়ন না পেয়ে এলাকার মানুষের আহ্বান ও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব। আমার আসনে দল মনোনয়ন দিয়েছে মাহবুবুর রহমান হেলালকে যিনি আমার হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৩ নম্বরে থাকবেন। ওনার চেয়ে জনপ্রিয়তায় স্থানীয় কলেজের প্রিন্সিপাল রশিদ ভাই এগিয়ে আছেন। আমার ধারণা ও বিশ্বাস আমি এই আসনটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিতে পারব।
এবারের নির্বাচন ব্যতিক্রমী ফলে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। তাই প্রতিবার নির্বাচন আসলেই যারা মনোনয়ন ফরম কেনেন তারা সবাই যোগ্য এবং জনপ্রিয় বলে দাবী করেন। কিন্ত এবার বিএনপি নির্বাচনে না থাকা ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নির্বাচনে স্বতন্ত্র হওয়ার অনুমতি দেওয়ায় দেখা যাবে কে কত জনপ্রিয়।
এবারের নির্বাচন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে বলে বিশ্বাস মুরাদ হাসানের। তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী এবার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন সুষ্ঠু ভোটের। এবার মার্কা পেলেই কারও জয় নিশ্চিত নয়। মাঠের যুদ্ধে ভোটারদের মন জয় করে তবেই জিততে হবে। এবারের নির্বাচনে প্রশাসন বা সরকারের দিক থেকে কারচুপীর কোনো সুযোগ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন নির্বাচন দিয়ে দায় নিতে চাইবেন না। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন সুতরাং আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ফলে ব্যক্তিকে জিতিয়ে দল ডুববে এমন কোনো কাজ এবার করা হবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
ডাক্তার মুরাদ কখনো যুদ্ধে হারে না, হারার কোনো ইতিহাসও নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওপরওয়ালা আমাদের তকদির লিখে রাখছেন, চেষ্টা ছাড়া তকদির বদল হয় না। ডাক্তার মুরাদ লড়বে, কে আসল যুদ্ধা তা রাজপথ প্রমাণ করে নেবে। সেই ছাত্র রাজনীতি থেকে আমার লড়াই শুরু হয়েছে যা মৃত্যু পর্যন্ত চলমান থাকবে।
আপনাকে নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল তার অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এখন যদি প্রশ্ন করি, সে সময় যা করেছিলেন তা কী ভুল ছিল- অবশ্যই ভুল ছিল। আমি ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বলেছি, আমি আগুন সন্ত্রাসের মদদদাতাকে নিয়ে কথা বলেছি যা অনেকেই ভালো ভাবে নেননি। হয়তো আমার কথা বলার ধরনেও সমস্যা ছিল। কিন্ত আমার বক্তব্যে আমার দল বিব্রত হয়নি, সরকার এবং আমার নেত্রীও সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ হননি। আমি যা বলেছি তাতে আমার নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছি।
তার বিতর্কিত ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা সঠিক ছিল বলেও মন্তব্য করেন মুরাদ হাসান। সে সময় তিনি এমন একটা ইস্যু ছিলেন যে যাই বলতেন তাই আলোচনা সমালোচনা তৈরি করতো। ফলে গণমাধ্যমের তা এড়ানোর সুযোগ ছিল না। তবে অধিকাংশ গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলেও অনেকের উপস্থাপনা ভালো ছিল না বলে বলে দাবি তার। তিনি বলেন, তখন আমি তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলাম কিন্ত কোনো মিডিয়াতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করিনি। গণমাধ্যমের কাজ প্রশ্ন তুলা, প্রশ্ন করা আপনারা তাই করেছেন।
এখন ডাক্তার মুরাদ আর অতীতে পড়ে থাকতে চান না। তিনি চান ভুল শুধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা একবার বাদ পড়েন সংসদ সদস্য পদ কিংবা মন্ত্রিত্ব হারান তাদের ফিরে আসা অনেকটা কঠিন হয়। আওয়ামী লীগের এক সময়ের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতা হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় দল ও রাজনীতি থেকে এমনভাবে বিলীন হয়েছেন যে তাকে আর খুঁজেও পাওয়া যায় না।
ফলে মুরাদ হাসান রাজনীতিতে আবার ফিরে আসতে পারবেন কী না এটাও একটা বড় প্রশ্ন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি তো রাজনীতির মধ্যে আছি। একদিনের জন্যও এর বাইরে যাইনি। এখন বলতে পারেন এই মুহুর্তে আমি দলের মনোনয়ন পাইনি, মন্ত্রী সভায় নেই। আমার বিশ্বাস আবারও আমি ফিরে আসব। দেখুন এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে ১০ জন আলোচিত মানুষের নাম তৈরি করেন দেখবেন আমার নাম থাকবে, আমার জনপ্রিয়তা কোনো অংশেই কমে যায়নি। রাজনীতিতে অনেকেই দুর্নীতি করে দলকে ডুবিয়েছেন সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। কিন্ত দুইবার প্রতিমন্ত্রী মুরাদের নামে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। সুতরাং আমি ফিরে আসবই।
