বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে আজ রবিবার রাজধানী ঢাকা ও সারা দেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপিসহ সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক রাজনৈতিক দলগুলো। দীর্ঘদিন হরতাল, অবরোধের পর প্রথম প্রকাশ্যে কর্মসূচি এটি। এই কর্মসূচি ঘিরে বড় ধরনের শোডাউনের পরিকল্পান করছে দলগুলো। বিএনপির পক্ষে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যৌথভাবে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জড়ো করার কাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। বাংলাদেশে এমন একসময়ে আমরা দিবসটি পালন করতে যাচ্ছি, যখন দেশের মানুষের কোনো মানবাধিকার নেই। শুধু মানবাধিকার কেন ভোটাধিকারসহ সংবিধান স্বীকৃত কোনো অধিকার দেশের মানুষের নেই। এ অবস্থায় গুম, খুনের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবার, স্বজন, কারাবন্দি নেতাদের স্বজনসহ নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগণ এই মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন। আমরা আশা করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এ দেশের সন্তান। সাধারণ মানুষের মতো তারাও ভালো নেই। ভালো থাকার কোনো সুযোগ নেই। তাই তারা দেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগণের পক্ষে থাকবেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যান্য দলের মতো আমাদের তো আর সহজে কর্মসূচি পালন করতে দিতে চায় না। তবে আমরা আমাদের সাধ্যমতো যেখানে সুযোগ পাই, সেখানে কর্মসূচি পালন করব। মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে দিলে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করব। পাশাপাশি আলোচনা সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘সরকার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে অবৈধভাবে খুন, গুম করাত। এখন বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের কঠোর নজরদারির কারণে তা পারছে না। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে গুপ্ত হত্যা চালাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে গুম করা একটি মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সমাজের মধ্যে ত্রাস ছড়িয়ে দিতে এই ভয়াবহ অপরাধটি করে থাকে।’
ঢাকা মহানগর বিএনপির পক্ষে বিএনপির মিডিয়া সেল গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, কর্মসূচি পালনের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে (ডিএমপি) জানানোর বিধান থাকায় মানবাধিকার দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি পালনের বিষয়টি গতকাল মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে ডিএমপিকে অবহিত করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সাইদুর রহমান মিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আশা করছি, উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন।’
দলগুলো যে যেখানে কর্মসূচি পালন করবে : বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের উদ্যোগে বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ (বিএসপিপি), জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এবং বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ একই সময়ে, একই কর্মসূচি পালন করবে। বেলা ১১টায় গণতন্ত্র মঞ্চ কারওয়ান বাজার বিটিএমসি ভবনের কাছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অফিসের সামনে, ১২-দলীয় জোট বিজয় নগর পানির ট্যাংকির সামনে, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টন আলরাজী কমপ্লেক্সের সামনে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, গণফোরাম ও পিপলস পার্টি হাইকোর্ট কদমফুল ফোয়ারার উল্টো দিকে, গণ অধিকার পরিষদ বিজয়নগর পানির ট্যাংক, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে, গণ অধিকার পরিষদ (ড. রেজা কিবরিয়া ও ফারুক হাসান) পুরানা পল্টন দলীয় অফিসের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে। দুপুর ১২টায় লেবার পার্টি তোপখানা রোড মেহরাব প্লাজার সামনে, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি বিকেল ৩টা বিজয় চত্বর বিজয়নগর ৭১ হোটেলের সামনে কর্মসূচি পালন করবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিবসটি উপলক্ষে আমরা রাজপথে কর্মসূচি পালন করব। এই দিনে সারা দেশের মানবাধিকারবঞ্চিত সাধারণ জনগণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। আশা করি কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দেবে না। দিলে তার দায়দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।’
গতকাল বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘মানুষকে গুম, খুন, অপহরণ করে, গোপন বন্দিশালা “আয়নাঘর” বানিয়ে, কারারুদ্ধ করে বিনা ভোটে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রেখে শেখ হাসিনা মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং সমালোচনা সত্ত্বেও সরকার ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।। বাংলাদেশেও গুমের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনরত বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। এ ছাড়া গুমের শিকার হয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনকে কবজায় নিয়ে দেশে চলছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ। এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরণে রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংস্থা, সুশীল সমাজসহ বিবেকবান সব মানুষকে সোচ্চার হয়ে এই মানবাধিকার লুটের সরকারের বিরুদ্ধে আজ কর্মসূচি পালন করবে।’
সংবাদ সম্মেলনে গুমের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৬৪৭ জন ব্যক্তি গুম হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮৪ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, ৩৯৯ জনকে জীবিত ফেরত পাওয়া গেছে অথবা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, ৩ জনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এবং ১৬১ জনের এখন পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে এম ইলিয়াস আলী ও সাইফুল ইসলাম হিরুর মতো সংসদ সদস্য, কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, হুমায়ুন পারভেজ, জাকির, সুমন, দিনার, জুনেদসহ অসংখ্য বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতাকে অদৃশ্য করা হয়েছে। যদিও আমাদের হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা আরও তিন থেকে চার গুণ বেশি। কারণ এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে কেবলমাত্র গুম হয়ে যাওয়া পরিবার কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে, আর অনেক আতঙ্কিত পরিবারই রিপোর্ট করার সাহস পায়নি।’
৬৫৫