এক. দেবদাসের কথা বলতে চাই। তবে, এটা কোনো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নায়ক দেবদাসের কথা নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একজন নায়ক সারা শরীর জুড়ে তার আখ্যান। দেবদাস পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তবু তার কথা লিখতে গেলে শুধু এইটুকুই বলতে হবে যে ‘এমন মানুষও ছিলেন’। লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিলেন ‘জীবন্ত ইতিহাস’ হয়ে। যা ঘটছে, আমাদের চারপাশে। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা-অসহিষ্ণুতার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হলো, দেবদাসের কথাটা জানানো প্রয়োজন।
দুই. বেশির ভাগ মানুষের কাছে তিনি অজানা। তার জন্ম ১৯৩০ সালে জয়পুরহাট জেলায়। ১৯৪৬ সালে স্থানীয় খঞ্জনপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করার পর বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় নিজের জায়গা করে নেন মুজিবুর রহমান । ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে দ্বিতীয়বার এমএসসি করেন। ১৯৬৭ সালের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনে তিনি ছিলেন ধীরস্থির, কিন্তু অসম সাহসী।
তিন. এগুলো কোনোটাই বড় কিছু নয়। বহু মানুষের জীবনপঞ্জি খুঁজলে এমনটা হরহামেশা পাওয়া যাবে। সেখানে তার অনন্যতা নয়। তার অসাধারণ কর্ম এবং অবদানটি ঘটল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পরে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের দুটো দিক তাকে বড় বিচলিত করে এক. বাঙালি জাতির প্রতি, বিশেষত, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপরে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস কর্মকাণ্ড এবং দুই. প্রাণ বাঁচানোর জন্য হিন্দু জনগোষ্ঠীর বহু মানুষের নিজস্ব ধর্ম-বিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া।
চার. বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা মনে করলে, গা শিউরে ওঠে। মাসের পর মাস তার ওপর নৃশংসতা চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বেই অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে দেন, সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। সেনা ক্যাম্প সরানো এবং তাদের গণহত্যা-নির্যাতন বন্ধ না হলে তিনি ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন না। সেই সঙ্গে নিজের নামটি বদলে রাখলেন ‘দেবদাস’। একাত্তর সালের ২৯ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। চিঠির বক্তব্য ছিল এ-রকম : ‘ক্যাম্পাসে সেনা ক্যাম্প বসিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাহানি করা হয়েছে। এজন্য আমি ক্যাম্পাস ত্যাগ করছি। আমি তখনই ক্যাম্পাসে ফিরে আসব, যখন সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও পবিত্রতা পুনরুদ্ধার করা হবে এবং সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আমি আশা করি, নিচে উল্লিখিত ঠিকানায় আমাকে পরিস্থিতি জানানো হবে। আমি আরও আশা করি এই দুর্যোগে, গণহত্যা, স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলো সেখানে কাটাব।’ তিনি এই চিঠিতে কর্র্তৃপক্ষকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন, এখন থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যেন ‘দেবদাস’ নামটিই ব্যবহার করা হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন। পাকিস্তানিদের সমর্থক এই শিক্ষাবিদ কেবল ক্যাম্পাসে সেনা ক্যাম্প স্থাপনের অনুমতিই দেননি, তাদের অপকর্ম যাতে কেউ প্রকাশ না করে, সে জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের সতর্কও করে দিয়েছিলেন। ফলে ধারণা করা যায়, তার সম্মতিতেই বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার বরাবর লেখা অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের চিঠিটি ত্বরিত সেনা দপ্তরে চলে যায়।
পাঁচ. চিরকুমার অধ্যাপক মুজিবুর রহমান একাই ছিলেন শূন্য ফ্ল্যাটে। ক্যাপ্টেন প্রশ্ন করলেন : আপনার নাম কী?
‘দেবদাস’ নির্বিকার। চিঠির সূত্র ধরে ক্যাপ্টেনের দ্বিতীয় প্রশ্ন : গণহত্যা বলতে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
অধ্যাপকের সাফ জবাব : এই দিনগুলোতে তোমরা যা করছো।
এরপর ক্যাপ্টেন বললেন, ‘আমার সঙ্গে আসুন।’
অধ্যাপক উত্তরে বললেন, ‘আমাকে আগে দুপুরের খাবার খেতে দাও। আমি এখন রান্না করছি।’ কিন্তু ক্যাপ্টেন তাকে সেই সময় দিলেন না। বললেন, ‘আমি তোমার জন্য আরও ভালো খাবারের ব্যবস্থা করব।’ এরপর পাকিস্তানি সেনারা এমন ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে, মুজিবুর রহমানকে যার চিহ্ন বহন করতে হয়েছে সারা জীবন। প্রথমে রাজশাহী বিশ্ববদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্থাপিত সেনা ক্যাম্পে আটকে রেখে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। দেওয়া হয় বৈদ্যুতিক শক, লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। পরে রাজশাহী থেকে পাবনা নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। পাবনা থেকে নেওয়া হয় নাটোরে। সেখানেও নির্মম নির্যাতন চলে তার ওপর। নির্যাতনের এক পর্যায়ে মুজিবুর রহমান মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ৫ সেপ্টেম্বর নির্যাতন শিবির থেকে ছেড়ে দেওয়া হলে তিনি জয়পুরহাটে নিজের বাড়িতে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের বাকি সময়টা বাড়িতেই ছিলেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত। তবে তার চেতনা ছিল। যতদিন জীবিত ছিলেন, তার সামনে ঘটে যাওয়া নৃশংস বাঙালি হত্যা করার কথা বিড়বিড় করে বলেছেন।
ছয়. দেশ স্বাধীন হয়। ‘৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে মুজিবুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। তিনি কথা রেখেছিলেন, যতদিন সেনা ক্যাম্প ছিল, ততদিন তিনি ক্যাম্পাসে আসেননি। তার থাকার জায়গা হয় জুবেরি হাউজে। কিন্তু তিনি কাজে যোগ দেননি তখনো। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুজিবুর রহমান আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে ঘোষণা করেন, আজ থেকে আমার নাম ‘দেবদাস’। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন, তাকে যেন ‘দেবদাস’ নামে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫২তম সিন্ডিকেট সভায় তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদনও পায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে তার কাছে কোনো চিঠি দেওয়া হয় না। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ-বীতশ্রদ্ধ-অভিমানী মুজিবুর রহমান ওরফে দেবদাস ১৯৭৩ সালের ৫ মে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং জানিয়ে দেন, তার পদত্যাগ ১৯৭১ সালের ৬ আগস্ট থেকে যেন কার্যকর করা হয়। ৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন। এবার খুবই ত্বরিত গতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেবদাসকে জানিয়ে দেন যে, তার ইচ্ছানুযায়ীই পদত্যাগপত্র কার্যকর করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ব্যাংক হিসাবে (সাবেক হাবীব ব্যাংক, বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক) অনেক টাকা জমা ছিল। নাম পরিবর্তন করার কারণে সেই টাকাও তুলতে পারেননি দেবদাস। সবারই এক কথা তিনি তার পূর্ব মুসলিম নাম ‘মুজিবুর রহমানে’ ফিরে যান। তিনি আপস করলেন না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদকারী মুজিবুর রহমানকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে। অজুহাত দেখানো হয়েছে, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ নন। তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর দায়িত্ব ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তথা রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করেনি।
সাত. দেবদাস ফিরে গেলেন জয়পুরহাটের নিজ গ্রামে। সেখানে নীরবে-নিভৃতে কাটিয়েছেন জীবন। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অবস্থান বদলায়। ১৯৯৮ সালের ২ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সংবর্ধনা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি হিসেবে সে সময় অধ্যাপক দেবদাস, জুবেরী ভবনে বেশ কয়েকদিন ছিলেন। অনেকদিন পরে চিরচেনা ক্যাম্পাসে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে তিনি যেন তার স্মৃতিতে কখনো কখনো অতীতকে খুঁজে পেতেন। এসময় ক্যাম্পাস, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে অনেক দূরে থাকা এ সাহসী মানুষটা ক্যাম্পাসে আরেকটি চমক দিলেন। অনেক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান জানালেন। ১০ আগস্ট ১৯৯৮, রাবি শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা পরিদর্শন শেষে নির্লিপ্তভাবে তিনি মন্তব্য খাতায় লিখলেন Visited the museum on 10th August, 98—I hope history will be able to overcome the distortion of facts depicted through pictures here..’ তার লেখা মন্তব্য থেকে কী মনে হয়, তিনি অপ্রকৃতিস্থ? আসলে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন আর যে বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি পবিত্র অঙ্গন মনে করতেন, যার মর্যাদা রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়েই স্বাভাবিকতা এবং অস্বাভাবিকতার এক বিচিত্র ভুবনে বসবাস করে বাকি জীবন পার করেছেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান দেবদাস। রাষ্ট্র বিলম্বে হলেও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে মুজিবুর রহমান ওরফে দেবদাসকে একুশে পদক দিয়ে ঋণ শোধের চেষ্টা করেছে।
আট. একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। আসলে একজন প্রতিবাদী দেবদাসকে গ্রহণ করার জন্য যে ঔদার্যের প্রয়োজন, সেটি আমাদের রাষ্ট্র অর্জন করতে পারেনি। এ পাপস্খলন করব কীভাবে?
(তথ্যসূত্র : যখন ক্রীতদাস : স্মৃতি’৭১, নাজিম মাহমুদ
কান পেতে রই, মফিদুল হক পরিচালিত ডকুমেন্টারি
মুজিবুর রহমান দেবদাসের বীরোচিত আখ্যান মো. হাসিবুল আলম প্রধান, দেশ রূপান্তর)
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক
[email protected]
