গাজার উত্তর ধ্বংস করে এখন দক্ষিণ গাজায় হামাসের শক্ত ঘাঁটি খান ইউনিস শহরকে কেন্দ্র করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন ‘সন্ত্রাসী’ হামাসকে নিশ্চিহ্ন না করে তারা থামবে না। কিন্তু গাজায় হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান যখন চলছে তখন ফিলিস্তিনের অপরভাগ পশ্চিম তীরে স্বাধীনতাকামী সংগঠনটির প্রতি সমর্থন বাড়ছে।
গাজায় ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসনের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একটি জরিপে দেখা গেছে, দখলকৃত পশ্চিম তীরে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। শুধু পশ্চিম তীর নয়, বিধ্বস্ত গাজাতেও তাদের জনপ্রিয়তা উর্ধ্বমুখী। পশ্চিম তীরের শাসক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের পদত্যাগ চান প্রায় ৯০ শতাংশ ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে।
জরিপটি পরিচালনা করেছে প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চ (পিএসআর)। গাজা ও পশ্চিম তীরের এক হাজার ২৩১ জন ফিলিস্তিনি এই জরিপে অংশ নিয়েছেন। ২২ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর এটি পরিচালনা করা হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গাজার ৫৭ শতাংশ এবং পশ্চিম তীরের ৮২ শতাংশ মনে করেন, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা সঠিক ছিল।
জরিপে অংশ নেওয়াদের অধিকাংশ মনে করেন, জেরুজালেমে আল আকসা মসজিদ রক্ষায় এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্ত করতে হামাস এই পদক্ষেপ নিয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশ মনে করেন, ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ১২০০ জনকে হত্যার মাধ্যমে হামাস যুদ্ধাপরাধ করেছে। বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী করে বলেছেন, হামাসের যোদ্ধারা নৃশংসতা চালাচ্ছে এমন ভিডিও তারা দেখেননি।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের হামলার পর পশ্চিম তীরে, বিশেষ করে নাবলুস ও জেনিনে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। পশ্চিম তীরের ক্ষমতাসীন দল ফাতাহ’র একজন যুবনেতা ও রাজনৈতিক গবেষক রায়েদ দেবাই বলেন, ‘লোকজনের মুখের ভাষায়, গাড়িতে চালানো গান কিংবা ফেসবুক বা সামজিক যোগাযোগমাধ্যম বা আমার ছাত্রদের বিতর্কে সব ক্ষেত্রেই আমি তাদের পক্ষের শক্তিকে দেখতে পাই।’
রায়েদ দেবাই বলেন, ‘ইসরায়েলিদের আক্রমণ ফিলিস্তিনিদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করছে। লোকজন বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এখন আগের তুলনায় হামাসের পক্ষে আরও বেশি করে সমর্থন দিচ্ছে। গত ৩০ বছরে নতুন প্রজন্মের সামনে কোনো আদর্শ ছিল না, কোনো শ্রদ্ধার পাত্র ছিল না। তবে এখন তারা অন্যরকম কিছু দেখছে, একটি নতুন গল্প তৈরি হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড মূলত গাজা ও পশ্চিম তীর, দু’ভাগে বিভক্ত। ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। অন্যদিকে পশ্চিম তীর শাসন করছে ফাতাহ দলের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। দুপক্ষই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা চাইলেও বিগত দশকে তাদের আন্দোলনের ধারা ভিন্ন। হামাস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা চাইছে অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে কূটনৈতিক উপায়ে স্বাধীনতা চাইছে। যদিও তাতে ইসরায়েলি আগ্রাসন কমেনি বরং নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে ইসরায়েলি সেনারা। ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর খণ্ড খণ্ড অভিযানে ২০২২ এবং ২০২৩ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন প্রাণ হারিয়েছে ফিলিস্তিনিরা।যা স্বাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনি তারুণ্যকে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করেছে। পশ্চিম তীরের তরুণরাও এখন সশস্ত্র সংগ্রামে বেশি ঝুঁকছে। হামাসের প্রতি তাদের সমর্থন বাড়ছে। সম্প্রতি কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনেকটা এক সুরেই বলেছেন, হামাসকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না ইসরায়েল, কারণ হামাস কোনো ব্যক্তি বা কেবল সংগঠনই নয়, এটা একটি ধারণা, চেতনা।
