দেশে যে কজন আলেম নিজের দক্ষতা ও মেধার মাধ্যমে দ্বীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন, তাদের একজন মিরপুরের দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম ঢাকার মুহতামিম মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তরুণ আলেমদের কর্মসংস্থান, বক্তাদের আলোচ্য বিষয়, কোরআন প্রতিযোগিতাসহ প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে তার অভিমত জানিয়েছেন দেশ রূপান্তরকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বেলায়েত হুসাইন
দেশ রূপান্তর : তরুণ কওমি আলেমদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশকে মাদ্রাসায় শিক্ষকতার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে, এর কারণ কী?
মুফতি রেজাউল হক : বর্তমানে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষাসমাপনকারী বিপুল সংখ্যক আলেম শিক্ষকতা বা মাদ্রাসাকেন্দ্রিক অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হচ্ছেন না, বরং ব্যবসায়-বাণিজ্য, সাংবাদিকতা, লেখালেখি বা অন্য কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেনশ্ব এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ, কোনো শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয় বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের এমন মানসিকতা রাখা ঠিক নয় যে- তাদের শিক্ষা সমাপনকারীরা শুধু শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকবে। আর প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষা সমাপনকারী বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক চাকরির ব্যাপারটিও কঠিন। এরপরও মাদ্রাসা-মসজিদের বাইরে তাদের কর্মক্ষেত্র হওয়াটা অনেকের কাছে অপছন্দ। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলোশ্ব চেতনার অনুপস্থিতি, শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষার অভাব, শিক্ষা কারিকুলামের অনুপযোগিতা ও বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। নানা কারনে মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। তাই একান্ত বাধ্য হয়ে অনেককে বিকল্প আয়-রোজগারের পথ ধরতে হয়েছে। এতে আমি কোনো দোষের কিছু দেখি না।
দেশ রূপান্তর : তরুণ আলেমদের অনেকে মাদ্রাসার মুহতামিম ও কমিটির ব্যবহার ও আচরণে অসন্তুষ্ট। তাদের দাবিশ্ব প্রাইভেট মাদ্রাসাগুলোতে সাধারণ শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হয় না বললেই চলেশ্ব এর বাস্তবতা কতটুকু?
মুফতি রেজাউল হক : আমাদের পূর্ববর্তী আলেমরা দ্বীনদারী, নীতি-নৈতিকতার উচ্চমার্গে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দায়িত্বে সচেতন ও আমানতদার ছিলেন। ফলে তাদের সময়ে সাধারণত শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো অভিযোগ ছিল না মুহতামিমের বিরুদ্ধে আর মুহতামিমের কোনো অভিযোগ ছিল না অধীনস্তদের বিরুদ্ধে। পক্ষান্তরে এখন আমরা কেউ দায়িত্বে সচেতন নই, আর আমানতদারিতার চরম অভাব রয়েছে। ফলে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বাভাবিক। আর প্রাইভেট মাদ্রাসার মুহতামিমরা যেহেতু প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাই অনেক প্রাইভেট মাদ্রাসার মুহতামিম সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করেন। আসলে প্রাইভেট মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের ছদ্মাবরণে অর্থ উপার্জনের নিরাপদ উপায় হিসেবে বিবেচিত। বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া এ পুরো ব্যবস্থাই অনৈতিক। তবে এসব অভিযোগ অধিকাংশ নিরসন হতো যদি যথাযথভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত।
দেশ রূপান্তর : আমাদের পূর্ববর্তী আলেমদের অনেকে ইলম চর্চার পাশাপাশি ব্যবসা ইত্যাদি পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। বর্তমান আলেমদের জন্য এটা কতটুকু উপযুক্ত নাকি মাদ্রাসাই তাদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র?
মুফতি রেজাউল হক : পবিত্র কোরআনে ধন-সম্পদকে মানবজাতির স্থিতি ও উপজীবিকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈধপথে পবিত্র রিজিক উপার্জন করতে কোরআন-হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কর্মবিমুখতা, অলসতা ও পরনির্ভরশীলতা ইসলামে নিন্দিত। আর নিবিষ্ট মনোযোগ ও গভীর অধ্যবসায়ের জন্য আর্থিক সচ্ছলতা অপরিহার্য। স্বাধীনভাবে ইলম চর্চা, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, ফতোয়া প্রদান, মতপ্রকাশ ও সার্বিক দ্বীনি কর্মসূচি বাস্তবায়নেও আর্থিক সচ্ছলতা প্রয়োজন। পূর্ববর্তী আলেমরা স্বাধীনচেতা ছিলেন। বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতাশ্ব এসবই এর অন্তর্ভুক্ত। আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই ছিলশ্ব এ ক্ষেত্রে তাদের নিয়ামক শক্তি।
আমরা দেখি, সামান্য অর্থের জন্য বিত্তবানরা আলেমদের ব্যবহার করে। নানা সময় আলেমরা বিত্তবান শ্রেণির কাছে অপদস্ত হন। প্রয়োজনের দিকে খেয়াল করে অনেক ক্ষেত্রে তারা এসব অনাচার মুখ বুঝে সহ্য করেন। এই অনাকাক্সিক্ষত অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথশ্ব আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করা। আলেমদের জন্য পার্থিব লোভ-লালসা মহা ফেতনা। আর লোভ-লালসা আসে দরিদ্রতা থেকে। তাই ধন-সম্পদ উপার্জন করতে মনোযোগী হতে হবে। ব্যবসা হলোশ্ব হালাল উপার্জনের উত্তম মাধ্যম। তাই আমি আলেমদের মাঝে যারা ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেছেনশ্ব তাদের সাধুবাদ জানাই। উপরন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকহারে আলেমদের ব্যবসায়-বাণিজ্যের উদ্যোগ গ্রহণে এগিয়ে আসা কর্তব্য বলে মনে করি। তবে অবশ্যই ব্যবসা-বাণিজ্য কায়-কারবার সম্পর্কিত ইসলামের সব বিধিনিষেধ কঠোরভাবে অনুশীলন করতে হবে, এর অন্যথা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দেশ রূপান্তর : কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের (মাস্টার্স) সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। এর দায় কার?
মুফতি রেজাউল হক : দাওরায়ে হাদিসের সনদের ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দীর্ঘদিনের দাবি। ধারাবাহিক আন্দোলন ও আলোচনার মাধ্যমে তা সংসদে আইন পাসের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। সনদের স্বীকৃতি দ্বারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সামাজিকভাবে শিক্ষার মর্যাদা ও সম্মানই মুখ্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। সেদিক থেকে এটাকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই স্বীকৃতিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করলে আমাদের ছেলেরা অনেক লাভবান হতো। তাদের দ্বীনি খেদমতের কর্মপরিধি বৃদ্ধি পেত। দাওয়াতি কার্যক্রম সম্প্রসারিত হতো। বৃহৎ পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত। আমি আশাবাদী, সময় সুযোগ মতো এটা অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ওয়াজ মাহফিলের জন্য একটি উর্বরক্ষেত্র, এখন ওয়াজের ভর মৌসুম চলছে। দেখা যাচ্ছে, ইলমে-আমলে প্রশংসিত অনেক বক্তা লাগামছাড়া দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলছেনশ্ব এতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এর কারণ কী?
মুফতি রেজাউল হক : ওয়াজ মাহফিল আয়োজনে আমাদের দেশে যে অবারিত সুযোগ রয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহ্য ইদানীং ক্ষুন্ন হচ্ছে কতিপয় অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত পেশাদার বক্তার কারণে। এ জন্য বহুলাংশে দায়ী সমাজের কুরুচিবোধসম্পন্ন শ্রোতারা। যারা মধুর সুর, কোকিল কণ্ঠ, মাঠ কাঁপানো আর কন্ট্রাক্ট বক্তাশ্ব তাদের হাসি-কান্না, অভিনয় আর বিনোদনের পাগল। ফলে মাহফিলের ধর্মীয় আবেদন আর প্রভাব আজ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশের শীর্ষ আলেমদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। যাদের অনুমোদন ছাড়া কেউ ওয়াজ করতে পারবে না। যারা ধর্মীয় জ্ঞান, আমলের উৎকর্ষ, চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে যোগ্যদের ওয়াজের অনুমতি দেবেন। বরং ক্ষেত্রবিশেষে অনুরোধ ও আহ্বান জানাবেন।
জাতির সম্মান রক্ষায় এবং ধর্মের অবমাননারোধে এটা অতি আবশ্যক। এমন কঠোর ও কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া এ নৈরাজ্য দূর করা অসম্ভব।
দেশ রূপান্তর : কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের রিয়েলিটি শোতে প্রচুর হাফেজ অংশ নিচ্ছেন, অনেকে এটাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সফলতার মানদণ্ড হিসেবে প্রচার করছেন, বিষয়টা কীভাবে দেখেন?
মুফতি রেজাউল হক : কোরআনে কারিমের হেফজ, বিশুদ্ধ তেলাওয়াত, সুস্পষ্ট উচ্চারণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাফল্য অর্জন করে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। কিন্তু বিজয়ীদের জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব খুব কম দেখা যায়। কোরআনকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় তাদের অংশগ্রহণ খুব একটা দেখা যায় না। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের অসৎ উদ্দেশ্যে মেধাবী ছেলেদের দীর্ঘদিন হেফজ পড়ায় লাগিয়ে রাখা, মিথ্যা প্রচার ও প্রতারণাসহ বিস্তর অভিযোগ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
কোরআন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের জন্য নাজিল হয়নি। কোরআন নাজিল হয়েছে ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত এবং রান্নাঘর থেকে সংসদ পর্যন্ত সবকিছু আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য। যেসব দেশ আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তারা তাদের দেশে কোরআনের আইন বাস্তবায়ন করে না। এমনিভাবে যেসব ব্যবসায়ী শিল্পগোষ্ঠী জাতীয় পর্যায়ে কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তারাও ব্যক্তিজীবনে, ব্যবসা পরিচালনায় কোরআনের আইনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। আসলে তারা নিজেদের অর্থ উপার্জনে অন্যায়-অবিচার, ব্যক্তিগত জীবনের অপকর্ম-পাপাচারের কুৎসিত চেহারা সর্বসাধারণের কাছে আড়াল করে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রদর্শনের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে কোরআন প্রতিযোগিতার মতো সুন্দর আয়োজনকে। যার জীবনযাপনে কোরআন উপেক্ষিত, তার জন্য কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা কোরআনের প্রতি অবমাননা ছাড়া কিছুই নয়।
