রিকশা নগরী হিসেবে ঢাকার পরিচয় বিশ্বস্বীকৃত। ২০১৪ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ঢাকাকে এই স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবার ইউনেস্কো আমাদের রিকশা ও রিকশাচিত্রকে বিমূর্ত
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিল। ইউনেস্কো থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস, স্থাপনা, সংস্কৃতি ও শিল্পের ধারাবাহিক স্বীকৃতি আমাদের আনন্দিত করে। তবে একই সঙ্গে নিজেদের ইতিহাস, স্থাপনা, সংস্কৃতি ও শিল্পের সংরক্ষণ, চর্চা ও নিরাপত্তার ঘাটতিও আলোচনায় আসা উচিত।
আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানার কাসানে শহরে অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ক কনভেনশনের ১৮তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিষদের সভায় এ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। বাউল সংগীত, জামদানি, শীতলপাটি, মঙ্গল শোভাযাত্রা, সুন্দরবন, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার ও ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর রিকশা ও রিকশাচিত্রের এই বিশ্বস্বীকৃতি। জামদানি বয়ন শিল্প, শীতলপাটি বয়ন শিল্প, বাউল গান ও মঙ্গল শোভাযাত্রার পর প্রায় ৬ বছরের বিরতিতে বাংলাদেশের পঞ্চম অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র এ স্বীকৃতি লাভ করল। উল্লেখ্য, গত ৬ বছর ধরে এ চিত্রকর্মের নিবন্ধন ও স্বীকৃতির প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও প্রথম চেষ্টায় তা ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালে পুনরায় নথিটি জমাদানের সুযোগ প্রদান করা হলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ও প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ নথিটি নতুনভাবে প্রস্তুত করা হয়।
এ স্বীকৃতির ফলে বিগত আট দশক ধরে চলমান রিকশা ও রিকশাচিত্র একটি বৈশ্বিক ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করল। এ অর্জনের মাধ্যমে ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যের মুকুটে আরও একটি পালক যুক্ত হলো। বাংলাদেশ বিশ্বে কেবল শিল্প ঐতিহ্যের অংশীদারই নয়, বরং প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও ধারক। এছাড়া, চলমান বা জীবন্ত শিল্পেরও বাহক। পাশাপাশি বিশেষভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসও বিশ্বঐতিহ্যের অংশ হতে পেরেছে।
জাতিসংঘের সহায়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্বে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো এবং উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়ে আসছে ১৯৪৬ সাল থেকে। এটি সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে তাদের সংরক্ষণ, সংস্করণ এবং সম্প্রসারণের জন্য উদ্দীপনা ও প্রণোদনা প্রদান করে। কোনো দেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতির বিমূর্ত উপাদানকে স্বীকৃতি প্রদান করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনেস্কো এসব উপাদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে। তারা এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণে উৎসাহিতও করে। কাজটি প্রথম শুরু হয় ২০০১ সালে। ঐ বছরের ১৮ মে বিভিন্ন দেশের ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মাস্টারপিস অব দ্য ওরাল অ্যান্ড ইনটেনজিবল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি হিসেবে ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশসহ মোট ১৭৮টি রাষ্ট্র নির্বস্তুক ঐতিহ্য রক্ষা এবং এসব ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে একটি কনভেনশন স্বাক্ষর করে। সেসব সংরক্ষণের জন্য ইউনেস্কো অর্থও প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিমূর্ত উপাদান ইউনেস্কোতে প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছে ২০০৯ সালে বাউল গানের হাত ধরে। এরপর থেকে আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এমন আরও অনেক উপাদান ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয়েছে।
তবে স্বাক্ষরিত দেশগুলোর যেসব ইনটেনজিবল হেরিটেজ স্বীকৃতির জন্য ইউনেস্কোতে পাঠানো হবে, সেগুলো অবশ্যই দেশের সরকারি বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় থাকতে হবে। কিন্তু সরকারিভাবে প্রস্তুতকৃত কোনো তালিকা বাংলাদেশের ছিল না। ইউনেস্কোর বৈঠকে তারা শিগগিরই তালিকা তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি। অথচ ‘বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন’ সরকারিভাবে এ বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো কমিশনের ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া বিষয়গুলোর তালিকাটিই অসম্পূর্ণ। বলা হয়েছে ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ আর সৃষ্টিশীলতাকে লালন করার প্রত্যয়ে ইউনেস্কো ঘোষিত সংস্কৃতি বিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের আলোকে কমিশনের সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকা- পরিচালিত হয়। এছাড়াও, বাংলাদেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ, তুলে ধরা এবং টেকসই উন্নয়নের বাহন হিসেবে সংস্কৃতির ভূমিকাকে আরও গতিশীল করতে বিভিন্ন সভা, সেমিনার, কর্মশালা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো নানামুখী কর্মকান্ড পরিচালনা করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কমিশন কতটা তৎপর ও সক্রিয় তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তালিকাহীনভাবে ২০১৭ সালের শীতলপাটি পর্যন্ত সফল হলেও এরপর আর কোনো স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ১০৯টি বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নাম সংবলিত তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। আশা করা যায়, এবার ইউনেস্কোর শর্তসমূহ পূরণপূর্বক ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ সম্পর্কিত আরও স্বীকৃতি বাংলাদেশ পাবে।
সর্বশেষ রিকশা ও রিকশাচিত্রের বিশ^স্বীকৃতি গর্বের তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই রিকশাচিত্রের ফর্ম আমাদের চিত্রশিল্পীদের ক্যানভাসে বিশেষ মর্যাদা, পরিচয় ও চর্চা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিল্পভাষা নির্মাণে ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি শিল্পীদের আরও উৎসাহিত করবে। কিন্তু ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের হাত ধরে ইতিমধ্যেই আমাদের রিকশার শরীরে আর সেই প্রথাগত রিকশা পেইন্টারদের কাজ কমে আসতে দেখছি। ফলে রিকশা ও রিকশাচিত্রের সেই ধারা বজায় রাখতে হলে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে রিকশাচিত্র রিকশার শরীর থেকে হারিয়ে কেবল শিল্পীদের ক্যানভাসে একটা ফর্ম হিসেবে দেখতে হবে। লেখার শুরুতে ঢাকা রিকশার শহর হিসেবে যে কথা বলা হয়েছে, সেটা নিয়েও ভাবার দরকার বলে মনে করি। উন্নয়নের যে গতি আর সুবিধা মানুষকে আরও বেশি গতিশীল, মানবিক করে তুলছে, সেখানে রিকশাচালকদের শ্রমঘন পেশার বিষয়টি ভাবা দরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না যে তারা অনেকটাই বাধ্য হন রিকশাচালকের পেশা বেছে নিতে। আবার গণপরিবহন সংকট ও সড়কের বিশৃঙ্খল দশায় বাহন হিসেবে রিকশাকে বেছে নেওয়া ছাড়াও আপাতত কোনো উপায় ঢাকাবাসীর নেই। কিন্তু এই ধীরগতির বাহন সড়কে অন্যান্য যানবাহনের গতি হরণের অন্যতম কারণ। ফলে রিকশাকে উঠিয়ে দিয়ে নয়, বরং সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে রিকশা চলাচলকে সীমিত করে ঐতিহ্য ও পর্যটনকে রক্ষা করার কথা জোরেশোরেই ভাবা দরকার। পাশাপাশি রিকশাচালকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব মূর্ত সমস্যার সমাধান না করে রিকশা বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতির উদযাপনে হারালে চলবে না।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
