‘মেরি মা বাহিনো আপকা পিয়ারা আপকা দুলারা ... ৭ জানুয়ারি কো আপনা কিমতি ওট দেকার কামিয়াব কিজিয়ে’— আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে সৈয়দপুরে বাংলার পাশাপাশি ঠিক এভাবেই মাইকিং চলছে অবাঙালি বিহারিদের জন্য। নীলফামারীর-৪ আসনের (সৈয়দপুর ও কিশোরীগঞ্জ) এই স্থানে নির্বাচন এলেই উর্দুতে মাইকিং একটি স্বাভাবিক ঘটনা, যেহেতু সৈয়দপুর শহরে প্রায় ৬০ হাজার অবাঙালি ভোটার রয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলছে মাইকিং। এতে প্রার্থীদের পক্ষে ভোটপ্রার্থনাসহ বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (২০ ডিসেম্বর) বিকাল ৩টায় দেখা যায়, সৈয়দপুর পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশায় মাইকিং করছেন আহমেদ হোসেন (৩৬)। তিনি দীর্ঘ আট বছর ধরে উর্দুতে মাইকিং করছেন। সাবলীল উর্দু জানায় যেকোনো আয়োজনে ডাক পড়ে তার। নির্বাচনী মৌসুমে তার দম ফেরার ফুরসত থাকে না। আহমেদ বলেন, লোকজন আগ্রহ নিয়ে উর্দুতে নির্বাচনী প্রচারণা শোনে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সূত্র মতে, নীলফামারী-৪ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ২৬ হাজার ৩৪ জন। বর্তমানে কিশোরীগঞ্জ উপজেলায় ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ১০ হাজার ৬৫১ জন এবং সৈয়দপুরে দুই লাখ ১৫ হাজার ৩৮৩ জন। এর মধ্যে সৈয়দপুর পৌর এলাকায় অবাঙালি ভোটাররাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা জানান, মূলত বয়স্কদের ভোট চাইতেই উর্দুতে মাইকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে তারা সহজে বুঝতে পারছে কোন প্রার্থীর কি নাম, কোন প্রতীক। যদিও অবাঙালিদের নতুন প্রজন্ম বাংলা বোঝে, পড়তে পারে। কিন্তু যারা একদম বৃদ্ধ তারা অনেকে বোঝেন না।
এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী মোখছেদুল মোমিনের পক্ষে মাইকিংয়ে বলা হচ্ছে, ‘ইসবারকে চুনাবমে উমিদবার আওয়ামকা রাহনুমা মোখছেদুল মোমিনকে আপ আপনা কিমতি ওট দেকার কামিয়াব বানাইয়ে আউর শুকরিয়াকা মউকা দে’। বাংলায় এর অর্থ— এবারের নির্বাচনে প্রার্থী মোখছেদুল মোমিনকে আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত করুন এবং সেবা করার সুযোগ দিন।
অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিকের পক্ষে মাইকিংয়ে বলা হচ্ছে, ‘জানে মানে হাস্তি, গারিবো কো দোস্ত সিদ্দিক ভাই কো কাইচি মার্কামে কিমতি ওট দেকার কামিয়াব বানাইয়ে।’ অর্থাৎ সবার পরিচিত ব্যক্তি, গরিবের বন্ধু সিদ্দিক ভাইকে কাচি প্রতীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করুন।
এদিকে বিজয়ের মাসে সৈয়দপুরে ভিন্ন ভাষায় মাইকে প্রচারণার ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের সংবিধান নিজ নিজ ভাষায় কথা বলার অধিকার দিয়েছে। আমাদের ক্যাম্পের নতুন প্রজন্ম এখন বাংলা জানে। তারা দেশের নামিদামি ভার্সিটিতে পড়ছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে। বয়স্কদের জন্য উর্দুতে প্রচারণা হলেও অসুবিধা নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৈয়দপুর আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, উর্দুভাষীরা এ দেশের ভোটার হয়েছেন। তারা এখন নাগরিক। এছাড়া একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। কাজেই উর্দুভাষার নাগরিকদের কাছে তাদের মাতৃভাষায় ভোট প্রার্থনায় দোষের কী?
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ ইসমাইল দেশ রূপান্তরকে জানান, যদি দেশের সংবিধান ও নির্বাচন আচরণবিধি পরিপন্থি না হয়ে থাকে তাহলে যে কোনো ভাষায় প্রচারণা করা যায়। যদি নির্বাচন পরিপন্থি হয় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীলফামারী-৪ আসনে সাতজন প্রার্থী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এবারও জাতীয় পার্টিকে আসন ছেড়ে দেওয়ায় নৌকা প্রার্থী প্রত্যাহার হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে স্বতন্ত্রদের মধ্যে। এবার ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে সক্রিয় আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোখছেদুল মোমিন। অপরদিকে তাকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাচি প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
অপর প্রতিদ্বন্দ্বিরা হলেন লাঙ্গল মার্কা নিয়ে জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য আহসান আদেলুর রহমান, নোঙ্গর প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এম সাজেদুল করিম, সোনালী আঁশ প্রতীক নিয়ে তৃণমূল বিএনপির ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের, মশাল প্রতীক নিয়ে জাসদের আজিকুল হক, আম প্রতীক নিয়ে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির আব্দুল হাই সরকার।
উল্লেখ্য, সৈয়দপুরে ভোটের সময় অবাঙালিরা ভোটের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। অতীতে একজন অবাঙালি পৌর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। অবাঙালি কাউন্সিলরও আছে। এসব বিহারিরা পরিশ্রমী। ক্যাম্পে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও যারা বাইরে বসবাস করে তারা সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। বাঙালি পরিবারের সঙ্গে বিয়েসহ নানা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই।
