ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি পূর্বের মর্যাদা হারিয়েছে! আবার অনেকে এও বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাতন্ত্র্য’ আগের মতো নেই! যারা এ বিষয়ে কথা বলছেন, তারা পরিপূর্ণভাবে না জেনেই বলছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস হাতড়ালেই তা জানা যাবে। কোনো মানুষ এমন কথা কি উপলব্ধি করে, কীসের ভিত্তিতে বলছেন তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। যদি কেউ বিবেচনা না করেই ভাসা ভাসা মন্তব্য করেন, তাহলে তো কিছু বলা মুশকিল। আগে আমাকে জানতে হবে, যে বলছে তার ভিত্তি কী? অথবা তার বক্তব্যের যৌক্তিক গভীরতা কতটুকুদ?
যে সমস্ত অভিযোগের কথা মৃদুস্বরে শোনা যায়, তা সর্বৈব মিথ্যা। আগের থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনেক উন্নত হয়েছে। এর একটা মর্যাদা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সমাজে মেধাবী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন একজন হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। আমাদের পাবলিকেশন নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে। তবে এটা হতে পারে পৃথিবীর কিছু দেশ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে, হয়তো অনেকদূর এগিয়ে গেছে। সেটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়। শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোর কারণে হয়তো তারা অগ্রসর হতে পেরেছে। কিন্তু আমাদের আর্থ-সামাজিক কারণে বাজেটের পরিমাণ আগের তুলনায় ততটা বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে সুবিধা সেভাবে বাড়েনি। যে কারণে হয়তো বৈশ্বিক বিচারে আমরা একটু পিছিয়ে রয়েছি। তাই বলে, লেখাপড়ার মান কোনোভাবেই অধঃপতিত হয়নি। বরং অতীতের তুলনায় আরও ভালো হয়েছে।
অনেকে না জেনে, না বুঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলেন। এসব কথা বাইরে থেকে না বলে, সামনাসামনি বললে ভালো হয়। কারণ তখন বিষয়টি তাকে পরিষ্কার করে বোঝানো যায় ভালোমতো। সেই ব্যক্তি তখন সবকিছু বুঝতে পারতেন। না হলে অনেকের মনেই এ বিষয়ে বিভ্রান্তি থাকতে পারে। আসলে সমালোচনা করতে তো কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করতে হয় না। আমার যা মনে হলো, তাই-ই বলে ফেললাম। কেউ কেউ বলেন শিক্ষকদের মধ্যে নৈতিকতার মূল্যবোধ আগের মতো নেই। ছাত্রদের মধ্যেও সেই সংগ্রামী চেতনা নেই। আসলেই কি তাই? বিষয়টি একটু গভীরভাবে চিন্তা করার অনুরোধ করব। শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও সংগ্রামী চেতনা আগের মতোই রয়েছে। এখন প্রেক্ষাপট আলাদা। কারণ সংগ্রামের তো দরকারই নেই। মানুষের কোনো কিছুর অভাব হলেই, সংগ্রামী হয়ে ওঠে। এখানে তো কোনো অভাব নেই। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব কিছুই গড়ে ওঠে ‘বর্তমান’কে বিবেচনা করে। আমি মনে করি না, বর্তমানে কোনো সমস্যা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। একইসঙ্গে অনুরোধ করব, যারা এসব বলেন, তারা যেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তাহলেই উপলব্ধি করতে পারবেন, তারা কেমন? তাদের চিন্তা, বোধ এবং রুচি নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন নেই। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন থাকা উচিত নয়।
আগে শিক্ষকের সংখ্যা ছিল, ৫০০-৬০০। বর্তমানে শিক্ষকের সংখ্যা ২০০০। আগের পড়াশোনার মান এবং পদ্ধতি এবং বর্তমানের মান-পদ্ধতির মধ্যে অনেক তফাৎ। বর্তমানে আমরা অনেক উন্নত হয়েছি। একই সঙ্গে ভাবতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু সমাজেরই অংশ। এটা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। সমাজ দ্বারা সবাই প্রভাবিত হয়। আমরা অতীতের রেকর্ড বের করলে কী দেখতে পাই? একইসঙ্গে বর্তমানের বিষয়টিও জানি। কোনো প্রশ্ন থাকলে, সামনাসামনি বসে পরিষ্কার করা সম্ভব। ফলে বিষয়বর্জিত বা অযৌক্তিক মুখরোচক কথা বলে, শুধু শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টির কারণ খুঁজে পাই না।
লেখক: উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
