এবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত 'অসহযোগ আন্দোলনের' ডাক দিয়েছে। সাত জানুয়ারির ভোট বর্জন করা, কর ও ইউটিলিটি বিল না দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে।
সরকারের পতনের দাবিতে প্রায় ৯ বছর পর গত ২৯ অক্টোবর সারা দেশে সকাল–সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। সেই কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর গত ৩১ অক্টোবর অবরোধ কর্মসূচিও দিয়েছিল দলটি। এরপর আরও কয়েক দফা হরতাল আর অবরোধ করেছে দলটি।
বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি— যেমন হরতাল, অবরোধ কিংবা বিক্ষোভের সঙ্গে পরিচিত থাকলেও অনেকেই 'অসহযোগ আন্দোলন' কী বুঝতে পারছেন না। স্বাভাবিকভাবেই হরতাল, অবরোধ ও অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য কী— এ প্রশ্নটি এখন সবার মনে।
সরকারের সঙ্গে জনসাধারণের অসহযোগিতামূলক আন্দোলনকে সাধারণভাবে অসহযোগ আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়।
সরকারের সঙ্গে জনসাধারণের অসহযোগিতামূলক আন্দোলনকে সাধারণভাবে অসহযোগ আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়। উপমহাদেশের রাজনীতিতে অসহযোগ আন্দোলন প্রথম পরিচিতি পায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরে। আর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রাওলাট আইন পাস হয়। ভারতের বিপ্লবীদের দমনের লক্ষ্যে তৈরি এই আইনে যেকোনো সময় যেকোনো ভারতীয়কে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার, ডিটেনশন ও বিনা বিচারে দুই বছর কারাবন্দি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সংবাদপত্রের ওপরও বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ।
কোনো প্রমাণ ছাড়াই ব্রিটিশ পুলিশ ভারতীয়দের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। বাজেয়াপ্ত করে তাদের সম্পত্তি। এই আইন পাসের কিছুদিন পরই অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে সমবেত নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণ করে অনেক মানুষকে মেরে ফেলে জেনারেল ডায়ার।
রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯২০ সালে এক আন্দোলনের ডাক দেয়, ইতিহাসে যা অসহযোগ আন্দোলন নামে পরিচিত।
অহিংস পদ্ধতিতে সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করে ভারতের ব্রিটিশ শাসনকে ব্যর্থ করে দেওয়াই ছিল এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এর সূত্র ধরে সব অফিস ও কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ভারতীয়রা সরকারি স্কুল, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী থেকে সরকারি চাকরি ত্যাগ করেন।
তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অসহযোগ আন্দোলন নতুন নয়। বাংলাপিডিয়া বলছে, অসহযোগ আন্দোলন ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত আন্দোলন। এ আন্দোলনে কেন্দ্রীয় শাসনের বিপরীতে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণের মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন ডেকেছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে। দুটো আন্দোলনেই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্য ছিল। বিএনপি এই সময়ে এসে যে অসহযোগ আন্দোলনের কথা বলছে সেটা সময়োপযোগী কি না এটাই এখন দেখার বিষয়।
বুধবার (২০ ডিসেম্বর) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে দলের মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, অবৈধ সরকারকে অসহযোগিতার বিকল্প নেই। সাতই জানুয়ারির ডামি নির্বাচন বর্জন করুন। আপনারা ভোট কেন্দ্র যাবেন না, এটা আপনার অধিকার। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকুন।
একই সঙ্গে সরকারকে ট্যাক্স, খাজনা ও ইউটিলিটি বিল দেওয়া স্থগিত রাখার আহবান জানিয়েছে বিএনপি। সেই সঙ্গে ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ কি না তা ভাবা এবং আদালতে মামলায় হাজিরা দেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়েছে।
বিএনপির অসহযোগ আন্দোলন প্রসঙ্গে সিলেটে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি এখন কী বলে? অসহযোগ আন্দোলন করবে। বানরে সংগীত গায় শিলা জলে ভাসে। সেরকম হলো না? এরা নাকি অসহযোগ আন্দোলন করবে? ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সরদার।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম-কমিশনার (অপারেশনস) বিপ্লব কুমার সরকার বলেছেন, কেউ যদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে মানুষের জীবন হানির চেষ্টা করে, জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত করে, বাসে অগ্নিসংযোগ করে মানুষকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে, তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
আগামী সাত জানুয়ারি দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচন বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টিসহ তাদের মিত্র দলগুলো এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ এরইমধ্যে নির্বাচনী প্রচারাভিযানও শুরু করেছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, অসহযোগিতার আহবান জানানোর মধ্য দিয়ে বিএনপি অহিংস আন্দোলনেই থাকলো। তবে দেখার বিষয় হবে যে মানুষ- এমনকি বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এটা কতটা পালন করে।
হরতাল ও অবরোধের মধ্যে পার্থক্য কী?