সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কয়েক জায়গায় বার্ধক্যজনিত কারণে অবসর নেওয়া কয়েকজন ইমাম-খতিবকে অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিদায় জানানোর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি যেমন আনন্দের তেমনি এটা সমাজের একটি অনালোচিত বিষয়কে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। তা হলো, এ দেশের ইমাম-খতিবরা কোনো মসজিদে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে দিয়ে দীর্ঘ সময় সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও বার্ধক্যজনিত কারণে অব্যাহতি নিলে ফিরতে হয় একেবারে খালি হাতে। এটাই সাধারণ রীতি। অনেক ইমাম আবার অবসর নেওয়ার সুযোগ পান না, দায়িত্বপালনরত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন, তখন মসজিদ প্রদত্ত কোনো সুযোগ-সুবিধা ইমাম-খতিবের পরিবার পায় না।
চলতি বছরের জুন মাসে জাতীয় সংসদে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খানের দেওয়া তথ্যানুসারে দেশে মসজিদ রয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ১২৫টি। তন্মধ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের জমিয়াতুল ফালাহ ও আন্দরকিল্লাহ শাহি মসজিদ, রাজশাহীর হেতেম খাঁসহ কয়েকটি মসজিদের ইমাম-খতিবসহ সংশ্লিষ্টরা সরকারি স্কেলে বেতন-ভাতা পান। এর বাইরে সরকারের নির্মাণাধীন ৫৬০টি মডেল মসজিদের বেতন স্থানীয় প্রশাসন নির্ধারণ করে। এ ছাড়া অন্যসব মসজিদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মসজিদ পরিচালনা কমিটি এলাবাসীর সহায়তায় ব্যবস্থা করে। প্রতিটি মসজিদে গড়ে তিনজন করে লোক কর্মরত থাকলে এ সেক্টরে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ মানুষ।
বেশির ভাগ মসজিদ কমিটি মসজিদের অবকাঠামোগত খরচকে যতটা গুরুত্ব দেয়, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতার ব্যাপারে তার সিকিভাগও দেয় না। মসজিদের বিশাল বিশাল মার্কেট থেকে প্রাপ্ত লাখ লাখ টাকায় উন্নত কার্পেট, লাইটিং, টাইলস, এয়ারকন্ডিশনের মতো আয়েশি খাতগুলোতে অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতা থাকলেও ইমাম-মুয়াজ্জিনের একান্ত প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্মানী দিতে কৃপণতার প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। ভাবখানা এমন যে মসজিদের আয় নিজেদের আয়েশের জন্য; ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য নয়। মসজিদের অন্য সব খরচই প্রয়োজনের, শুধু ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানীটাই অপ্রয়োজনের খাত। আলোকসজ্জা ও এয়ার ফ্রেশে বছরে হাজার হাজার টাকা খরচ করা হলেও মন বাধা দেয় না, কিন্তু বছর শেষে ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী বাড়ানোর প্রসঙ্গ এলেই যেন কমিটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
দেশে জীবনযাত্রার মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দ্রব্যমূল্যের দামও। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও তাদের বেতন-ভাতা বাড়ে না। বেতনের পরিমাণও একেবারে নগণ্য। অনেকের ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতোও নয়। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, বাসাবাড়ির ভাড়া, যাতায়াত খরচ ও চিকিৎসা খরচসহ সবকিছুই ঊর্ধ্বমুখী। ধনী, গরিব, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সময়ে সময়ে বাড়ানো হয়। কিন্তু ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী ভাতা যুগ-চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য বললেই চলে। এর বড় একটা কারণ হলো, ইমামদের জন্য কোনো কার্যকর বেতন কাঠামো না থাকা। ২০০৬ সালে মসজিদ পরিচালনানীতি, কমিটি ও মসজিদের পদবিসহ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তাতে আটটি পদ এবং সেগুলোর বিপরীতে সম্মানী ধরা হয়, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। কার্যকর না হওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। যেমন ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা ধর্ম মন্ত্রণালয় মনে করে, তারা দেশের মসজিদগুলোর অভিভাবক। নানা সময় তারা তাদের কাজেকর্মে সেটা প্রমাণও দেওয়ার চেষ্টা করে, মসজিদের ইমাম-খতিব ও মোয়াজ্জিনদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।
বাস্তবতা হলো, মসজিদগুলো পরিচালিত হয় নিজ নিজ মহল্লার অধীনে। এখানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা কোনো কর্র্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই। স্থানীয় কমিটিই মসজিদ পরিচালনার ক্ষেত্রে শেষ কথা। ইমাম নিয়োগ-বিয়োগ থেকে শুরু করে সবকিছু তারা নিয়ন্ত্রণ করেন। এমতাবস্থায় মন্ত্রণালয়ের বিধি কার্যকর হয় না। বিধিমতো একটি মসজিদে খতিব, সিনিয়র পেশ ইমাম, পেশ ইমাম, ইমাম, প্রধান মুয়াজ্জিন, জুনিয়র মুয়াজ্জিন, প্রধান খাদেম ও খাদেমের পদ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ বাদে এই পরিমাণ জনবল নেই। অনেক জায়গায় ইমামই খতিবের দায়িত্ব পালন করেন, অনেক জায়গায় ইমামই মোয়াজ্জিন, আবার অনেক মসজিদে মোয়াজ্জিনকেই খাদেমের কাজ করতে হয়। এটা নিয়ে কথা বলার কিংবা আলোচনা করারও কেউ নেই। কমিটির ভাবা উচিত যে ইমাম আমাদের, তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের প্রতি অর্থনৈতিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না তা হাশরের ময়দানে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেকে অবশ্যই তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।’-সহিহ বোখারি : ৩০৪
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মসজিদ, অজুখানা, মসজিদের বাথরুম থেকে শুরু করে মসজিদ সংশ্লিষ্ট স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজটি করেন মসজিদের খাদেম। আর ফজর থেকে এশা পাঁচ ওয়াক্ত সময়মতো নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন মসজিদের একজন ইমাম। আর এ প্রতিটি নামাজের আগেই সময় মেনে আজান ও ইকামত দেন মুয়াজ্জিন। খুব বেশি শারীরিক অসুস্থতা না থাকলে ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাদের ছুটিও অনেকটাই অধরা, কারণ যেসব কারণে দেশে সাধারণ ছুটি থাকে, সেগুলোর অধিকাংশই ধর্মীয়। আর এ সময়ই তাদের দায়িত্ব আরও বেশি করে পালন করতে হয়। যেমন, দুই ঈদ, সপ্তাহের শুক্রবার ও শবেবরাত ইত্যাদি সরকারি ছুটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এর বাইরে স্থানীয় মহল্লায় কেউ মারা গেলে, কোনো দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তাদের না পেলে শুনতে হয় নানা কটুকথা। তখন তাদের কর্র্তৃপক্ষ হয়ে যায় সবাই, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় কাউকে পাওয়া যায় না। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের এমন চিত্র শহরের তুলনায় গ্রামে আরও প্রকট। শহরের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা টিউশনি করে, মাদ্রাসায় পড়িয়ে কিংবা অন্য কিছু একটা অল্প কিছু টাকা পেলেও সেই টাকায় সংসার চালানো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। এমন অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুসলমানের জীবনের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছেন ইমাম-খতিব ও মোয়াজ্জিনরা। খতিব সাহেব যেমন প্রতি জুমায় সমাজের সমস্যাগুলো তুলে ধরে এর ধর্মীয় সমাধান বর্ণনা করেন, সমাজের মানুষের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে যেমন উদ্বুদ্ধ করেন। মুসলমানদের সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও থাকে ইমামের মমতার হাত। সেই তিনিই থাকেন চরমভাবে উপেক্ষিত।
আলোচ্য বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের একটি ফতোয়া উল্লেখ করা যেতে পারে। দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যে মসজিদে ইমামের বেতন কম দিয়ে মসজিদ নির্মাণের জন্য চাঁদা কালেকশন করে বা কালেকশনের চাঁদা ইমামকে না দিয়ে মসজিদ নির্মাণের জন্য রেখে দেয়, সেই মসজিদে চাঁদা দেওয়া হারাম।’ আর মিসরের আজহার থেকে প্রকাশিত ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘বর্তমান অবস্থায় ইমামদের ১৫-২০ হাজার টাকার কম বেতন দেওয়া মানে, ইমামদের প্রতি জুলুম করা, তাই কেয়ামতের দিন আল্লাহ মসজিদের কমিটিকে জালেমদের কাতারে রাখতে পারেন।’ ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, যে মসজিদের এই পরিমাণ সামর্থ্য নেই- সেই মসজিদকে অন্য একটি মসজিদের সঙ্গে মিশে যাওয়া।
প্রসঙ্গত আরেকটি কথা বলা দরকার, বর্তমানে অনেক মুসল্লি ও কমিটির সদস্য মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের কাজের লোক মনে করে। কাজের লোকের মতো এই কাজ, সেই কাজ করার হুকুম দেয়। এমন আচরণও কাম্য নয়।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়কগবেষক
