সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে দল ভাঙা বা দল গড়ার খেলা নতুন নয়। প্রত্যেক নির্বাচনের আগে ভাঙা-গড়ার এ খেলায় যুক্ত হয় নতুন কিছু দল, যারা ‘কিংস পার্টি’র খেতাব পায়। রাতারাতি গঠন করা নামসর্বস্ব এসব দল যাত্রা শুরু করে ঢাকঢোল পিটিয়ে। আবার রাজনীতির মাঠ থেকে হারিয়েও যায় স্রোতের টানে, চোখের পলকে।
আগের কয়েকটি নির্বাচনের মতো দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশ তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)।
নির্বাচনের আগে বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট করে নিজেদের আখের গোছানোর পথ পরিষ্কার করাই ‘কিংস পার্টির’ উদ্দেশ্য। অতীত সাক্ষ্য দেয়, বড় দলগুলোর আশ্বাসে গড়ে ওঠা ‘কিংস পার্টি’ নিঃশেষ হয়ে গেছে ধূমকেতুর মতো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিংস পার্টির’ পরিণতি কখনো সুখকর হয়নি। যাদের ইশারা বা ইন্ধনে দলগুলো গঠিত হয়েছিল, প্রয়োজন শেষে ছুড়ে ফেলতেও দ্বিধা দেখা যায়নি তাদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে নিজেদের ‘গুরুত্ব’ ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, সুপ্রিম পার্টির মতো দলগুলো। বিএনপির নেতাদের নির্বাচনে আনতে না পারায় দলগুলোর বিষয়ে আওয়ামী লীগের আগ্রহ ফুরিয়ে যায়। যদিও কয়েকটি দলকে ভোটে সহায়তার আশ্বাস আওয়ামী লীগ দিয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।
যেহেতু ব্রিটেন থেকে এখনো রাজতন্ত্র উঠে যায়নি। তাই ‘কিংস পার্টি’র ধারণা ওই দেশ থেকেই প্রথম এসেছিল, ধরে নেওয়া যায়। এর দালিলিক প্রমাণ যদিও নেই। রাজা বা রানী সবসময় চায় অনুগত দল। শুধু ব্রিটেনে তথা যুক্তরাজ্যে নয়, যেখানে রাজতন্ত্র আছে (হোক তা নিরঙ্কুশ বা নিয়মতান্ত্রিক) সেখানেই কিংস পার্টি আছে বা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ স্বাধীন ‘হাওয়াই কিংডম’ থাকাকালে নিয়ম ছিল, রাজার বংশগত উত্তরাধিকার না থাকলে এবং তিনি কাউকে মনোনীত না করে গেলে বিধানসভা পরবর্তী রাজা নির্বাচন করবে। ১৮৭৪ সালে কিং লুলালিলোর মৃত্যুর পর রাজকীয় সেনাপ্রধান ডেভিড কালাকাউয়া ও পূর্ববর্তী রাজা চতুর্থ কামেহামেহার স্ত্রী রানী এমা নির্বাচনে দাঁড়ান। বিধানসভার সদস্যরা তখন ‘কিংস পার্টি’ ও ‘কুইনস পার্টি’ নামে বিভক্ত হন এবং ৩৫-৬ ভোটে কালাকাউয়া নির্বাচিত হন। জনসাধারণের মধ্যে রানীর প্রভাব বেশি থাকায় নির্বাচনের পর দাঙ্গা বেধে যায় এবং মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌ সেনাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে দেড় দশকের মধ্যে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয় এবং হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের ‘টেরিটোরি’ হিসেবে ‘ইউনাইটেড স্টেটস’-এ যোগ দেয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কোনো না কোনো ‘কিংস পার্টি’ গঠিত হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে এর প্রথম ধারণা মেলে। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের উদ্যোগে ১৯৮৭ সালের ৩ আগস্ট গঠিত হয়েছিল ‘ফ্রিডম পার্টি’। দলটি ওই নির্বাচনে প্রায় সব আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র দুটিতে জয়ী হয়েছিল। তবে কিংস পার্টির ধারণা বাংলাদেশে মুখরোচক বিষয় হয়ে ওঠে ‘এক-এগারো’র সরকারের সময়। জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনীতিক ও সাংবাদিক ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি বা পিডিপি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৪৫ দিন আগে দলটি নিবন্ধন পায়। যদিও ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর নিবন্ধন হারায় পিডিপি। ২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর নিবন্ধন পেয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। দলটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করে আগামী ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে দলীয় সরকারের অধীনেই অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের মিছিলে শামিল হয়েছে। এক বা দুটি আসনে জয়ী হয়ে আসার আশ্বাস পেলেও সর্বশেষ জোট শরিকদের যে ছাড় দিয়েছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাতে কল্যাণ পার্টিকে কোনো আসন দেওয়া হয়নি।
এক-এগারোর সময় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল ‘নাগরিক শক্তি’ আত্মপ্রকাশের মাস তিনেক পরেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকার তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী ফারুক আহম্মদের ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা স্থায়ী হয়নি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস আগে নিবন্ধন পেয়েছিল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)। কল্যাণ পার্টি বা পিডিপি না পারলেও এই দলের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ঢাকা-১৭ আসনে বিজয়ী হন। দলটি এবারও মাঠে আছে। তবে নবাগত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্টের (বিএনএম) দাপটে খানিকটা আড়ালে। নিজেদের ‘আসল বিএনপি’ ঘোষণা করে আলোচনায় আসেন কামরুল হাসান নাসিম নামের একজন। বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলসহ বেশ কিছু কর্মসূচি দেওয়ার পর তারাও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিংস পার্টির দৌরাত্ম্য খুব একটা দেখা যায়নি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচটি নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পায়; ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৃণমূল বিএনপি, ৮ মে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, ৮ মে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ, ১০ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম ও ১০ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি। তৃণমূল বিএনপি, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাসদকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন দিতে ‘বাধ্য’ হয় ইসি। বিএনএম ও বিএসপি নিবন্ধন পায় ‘নিয়ম অনুযায়ী’। চলতি বছরের এপ্রিলে ওই দুই দলের সঙ্গে ‘প্রাথমিক বাছাইয়ে’ টিকে যাওয়া আরও ১০টি দল যেমন এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও নিবন্ধনবঞ্চিত। দুই দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় গণসংহতি আন্দোলন উচ্চ আদালতের আদেশ পেয়েও ইসির আপিলের কারণে আটকে আছে।
এবারের জাতীয় নির্বাচনে কোনো আসনে ভরসা পায়নি কিংস পার্টিগুলো। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হলেও আসন ‘নিশ্চিত’ করতে পারেনি তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম ও বিএসপি। তাদের প্রার্থীর আসন থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে সরানো হয়নি। ফলে নির্বাচনে তাদের জয়ের বিষয়টি অনিশ্চিত।
বিএনএম ও তৃণমূল বিএনপি সূত্র বলছে, তারা পেয়েছে শুধু ‘আশ্বাস’ দুয়েকটি আসনে তাদের প্রার্থীদের জেতাতে আওয়ামী লীগ সহায়তা করবে।
প্রয়াত মন্ত্রী নাজমুল হুদার প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন তার মেয়ে অন্তরা হুদা। তাকে সরিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর দলের প্রথম সম্মেলনে সভাপতি হন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। তৃণমূলে আসার আগে ছিলেন বিকল্প ধারায়। তৃণমূলের মহাসচিব বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা (২০২২ সালে বহিষ্কৃত) তৈমূর আলম খন্দকার। শমসের মবিন চৌধুরী সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনে নির্বাচন করছেন। আর তৈমূর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচন করছেন।
১৪-দলীয় জোটের শরিক তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভা-ারী চট্টগ্রাম-২ আসনে জোটের মনোনয়ন পাননি। এ আসনে তার ভাতিজা ও নতুন নিবন্ধিত দল বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভা-ারীও প্রার্থী হয়েছেন। ধারণা করা হয়েছিল, এ আসনে সৈয়দ সাইফুদ্দিনকে ছাড় দিতে পারে আওয়ামী লীগ। কিন্তু তা হয়নি।
নির্বাচনী আসন নিয়ে দোটানায় পড়েছেন সৈয়দ ইবরাহিম। কক্সবাজার-১ আসন থেকে তিনি হাতুড়ি মার্কায় নির্বাচন করছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের সালাউদ্দিন আহমদ মনোনয়ন পেলেও ঋণখেলাপি হওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। লড়াইয়ে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলমের ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী তুহিন। জাতীয় পার্টির হোসনে আরাসহ আরও চার প্রার্থী রয়েছেন ইবরাহিমের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী), কক্সবাজার-১ ও কক্সবাজার-৪ আসন থেকেও মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন তিনি। তার এলাকা হাটহাজারীতে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে উপজেলা বিএনপি। ২০১৮ সালে ধানের শীষ নিয়ে তিনি ওই আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বেপারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা প্রকৃতই দেশের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করতে আসেন, তারা মানুষের ভালোবাসা নিয়ে টিকে থাকেন। কিন্তু যারা রাজনীতিকে পুঁজি করে ব্যবসা করতে চান, পদ-পদবি বিকিয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা নেন, তারা দ্রুত হারিয়ে যান। কিংস পার্টিগুলোর দিকে তাকালে সেটি পরিষ্কার বোঝা যায়।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন করার অধিকার সবার আছে। জনগণ যাকে ভোট দেবে, সে-ই নেতা, ওই দল জনসমর্থিত হবে। তবে তার জন্য গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। কিংস পার্টিগুলো হারিয়ে যাওয়ার জন্যই আবির্ভূত হয়।’
