আগামী ৭ জানুয়ারি ২০২৪-এ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কমিশনের তথ্যানুযায়ী, মোট তিনশ আসনের বিপরীতে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৮টি নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। বিএনপিসহ বাকি ১৬টি দল নির্বাচনের বাইরে থাকছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন চৌদ্দদলীয় জোট ও জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১৮৯৬ জন; এর মধ্যে দলীয় ১৫২৯ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩৫৭ জন। প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারও বেশ সরগরম হয়ে উঠছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। তাদের এই দাবি জাতীয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, বিদ্যমান সংবিধানের ৫৭(৩) ও ৫৮(৫৪) অনুচ্ছেদ তাদের এই দাবিকে স্পষ্ট রূপে সমর্থন করে না। কখনো আবার সরকার পতনের একদফা দাবিতেও তাদের অনড় থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা বিএনপি কখনো জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেনি। এমনকি বর্তমান সরকার পদত্যাগ করলে পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তাও তারা জাতির সামনে স্পষ্ট করতে পারেনি। ফলে তাদের এই দাবিদ্বয় বাস্তবতাবিবর্জিত এক প্রহসনী কৌশলরূপে প্রতীয়মান হয়েছে। কেননা, এসব অবাস্তব ও অযৌক্তিক দাবিগুলো শুধু সাংবিধানিক সংকটই সৃষ্টি করবে না বরং রাষ্ট্রকেও এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।
২০১৪ সালের দশম সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে ভয়ংকর নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ভোট প্রতিহত করেছিল। ব্যাপক জনভীতি সৃষ্টি করে অনেক ভোটারকে ভোট প্রদানে বাধা ও নিরুৎসাহী করেছিল। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও নির্বাচনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত করার নীলনকশার অংশ হিসেবে ভোটগ্রহণের প্রায় মাঝপথে সামগ্রিক নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনকে বয়কট করে; যদিও সামগ্রিক কারচুপির দালিলিক প্রমাণ আজও কেউ দেখাতে পারেনি। অথচ তাদের দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ ছয়জন নির্বাচিত হন। তার মধ্যে পাঁচজন শপথ গ্রহণপূর্বক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ লাভ করে এবং রীতিমতো সব সংসদীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে থাকে। এমনকি একটি সংরক্ষিত নারী আসনও তারা গ্রহণ করে। তাদের এই দ্বিচারিতা তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ সমালোচনার জন্ম দেয়। আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনে তারা ২০১৪ সালের মতোই ধ্বংসাত্মক আচরণ শুরু করেছে। গণবিরোধী হরতাল-অবরোধের মাধ্যমে শুধু জনজীবন ও অর্থনীতি বিপর্যস্তই করছে না, উপরন্তু বাসে, ট্রেনে আগুনসন্ত্রাসের মাধ্যমে নির্মমভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারারও নিষ্ঠুর-হিংসাত্মক পথ বেছে নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা আসন্ন নির্বাচন প্রতিহতেরও ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য, তফসিল ঘোষণার পূর্বাপর আমেরিকাসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি জাতিসংঘও আলোচনার টেবিলে বসার জন্য একাধিকবার বিএনপিকে অনুরোধ জানায়। সর্বশেষ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগকে শর্তহীন সংলাপে বসার লিখিত আহ্বান জানালে বিএনপি তাতেও বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের এত গভীর পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি বিগত দিনে পরিলক্ষিত হয়নি। কখনো কখনো তাদের হস্তক্ষেপ কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমাও ছাড়িয়ে যায়।
মার্কিন ভিসানীতি সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বিএনপির জন্য বেশ সহায়ক, যা তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে। নির্বাচন কমিশনও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর, যা ইতিমধ্যে প্রশাসনের রদবদলসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বেশকিছু কর্মকা-ে তা প্রতীয়মান হয়েছে। এ ছাড়াও নির্বাচন কমিশন তাদের নির্বাচনে আনার জন্য প্রয়োজনে তফসিলও পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। এমনকি সরকারও তাদের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিল। বিস্মিত জিজ্ঞাসা হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এতগুলো সেফগার্ড থাকার পরও বিএনপি কেন নির্বাচনে বয়কট করল? এখানে কোন রহস্য লুকায়িত? তবে কি সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করে দেশকে অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জে ফেলে পশ্চিমা বেনিয়াদের দাসত্বের কোপানলে ছুড়ে ফেলাই কি তাদের উদ্দেশ্য? সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের সমর্থিত কিছু সুশীলদের (?) বাগাড়ম্বর আলোচনায় এমনই আতঙ্কের পূর্বাভাস বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কোনো কোনো কথিত সুশীল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় দেশ দেউলিয়া ও সরকার তছনছ হয়ে যাবে মর্মে সুনির্দিষ্ট ডেটলাইনও দিয়ে দিত! ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করত। অবশেষে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর সেই আতঙ্ক অনেকটাই এখন কেটে গেছে। অবস্থাদৃষ্টে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, জাতীয় সংবিধানকে পদদলিত করে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের সব অনুরোধ উপেক্ষা করে বিএনপির নির্বাচন বর্জন কেন আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে?
নির্বাচনে তাদের অপকৌশলগত অনুপস্থিতি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে কি? নিরপেক্ষ ও নির্মোহ বিচারে জাতীয় সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টাকারী রাষ্ট্রবিরোধী এমন অপগোষ্ঠীর অনুপস্থিতি কখনোই একটি সাংবিধানিক নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না। আবার নির্বাচনে তাদের উপস্থিতিও ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের সমার্থক হতে পারে না। কেন না, নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও নির্বাচনী ফলাফল আশানুরূপ না হলে নির্বাচনকে তারা প্রত্যাখ্যান করে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশকে পশ্চিমা বেনিয়াদের গ্রাসে পরিণত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করত। কেন না, জনগণ নয়; তাদের রাজনীতি এখন প্রায় পুরোটাই পশ্চিমাদের কূটকৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমা বেনিয়ারাই এখন তাদের নিয়ামক শক্তি। লক্ষণীয় যে, এবারের নির্বাচনে একটি ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। আর তা হলো বিপুলসংখ্যক আওয়ামী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অবাধ অংশগ্রহণ। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি ঘটিয়ে তা অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যেই এমন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ইতিমধ্যে ভোট প্রচারণা বেশ জমে উঠেছে। ভোটাররাও বেশ উৎসবমুখর হয়ে উঠছে। স্বতন্ত্রীদের অবাধ অংশগ্রহণ নির্বাচনকে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে পারে। অনেক আসনে নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও দলীয় ঝুঁকি আসতে পারে। এতে নির্বাচন-পরবর্তী দলীয় গ্রুপিং প্রকট হতে পারে। অন্যদিকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দলে গণতান্ত্রিক চর্চাকে নিঃসন্দেহে উৎসাহিত করবে এবং নেতাকর্মীদের জনবান্ধব হওয়ার প্রতিযোগিতায় ধাবিত করবে।
লেখক : কলামিস্ট
