যেখানে স্কুল থেকে বিদায় নিতে হয় শিক্ষার্থীদের, সেখানে উল্টো স্কুলকেই দিতে হচ্ছে বিদায়। এমনই এক চিত্র দেখা গেছে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে। চার বছর আগে ওই ইউনিয়নের স্লুইসের খালে জলেভাসা মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য প্রথমবারের মত চালু হয়েছিল প্রাক-প্রাথমিক ‘ভাসমান বোট স্কুল’। বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে শুরু হওয়া প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত শুক্রবার সকাল ১১টায় একতলা লঞ্চ আকৃতির সেই স্কুলটি সংস্থার হেফাজতে বরগুনায় নিয়ে যাওয়া হয়। চোখের সামনে থেকে স্কুলটি নিয়ে যাওয়ায় আবেগ ধরে রাখতে পারেনি মান্তা শিশুরা।
সেই স্কুলটি নিয়ে যাওয়ার সময় বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরে এসে অঝোরে কাঁদছিল শিশু শাহিদা, দ্বীন ইসলাম, রহমান, খুকুমণি, মর্জিনা, রাজিয়া, মিম, ছখিনা, সায়েম, শেফালী, আমেনাসহ স্কুলটির প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী। তাদেরই কয়েকজন অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘আমরা কলম ধরতে শিখেছি এই স্কুলে। আমাদের আর এই স্কুলে যাওয়া হবে না।’
আর অভিভাবকরা জানান, এখানে ডাঙা ও ভাসমান মিলিয়ে প্রায় ৩০০ শিশু রয়েছে। ভাসমান স্কুলের কারণে ধীরে ধীরে তারা স্কুলগামী হচ্ছিল। কিন্তু স্কুলটি বন্ধ হওয়ায় মান্তা শিশুদের শিক্ষা জীবন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যুগের পর যুগ ধরে মান্তা সম্প্রদায় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। চরমোন্তাজ ইউনিয়নের স্লুইস গেটের খালে ১১০টি পরিবার নৌকায় করে নদ-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের কাছে শিক্ষা ছিলো বিলাসিতা। কিন্তু তাদের শিশুদের জীবনে লাগে শিক্ষার ছোঁয়া, হৈ-হুল্লোড় করে স্কুলে যাওয়ার আনন্দ। ২০১৯ সালের জুন মাসে বেসরকারি সংস্থা জাগোনারীর উদ্যোগে মুসলিম চ্যারিটির অর্থায়নে মান্তা শিশুদের জন্য চরমোন্তাজ ইউনিয়নের স্লুইস গেটের খালে ভাসমান বোট স্কুল স্থাপন করা হয়েছিল। যেখানে ছিল প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়ার সুযোগ। আর এই সুযোগ পেয়ে প্রাকের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক শিশু প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়েও লেখাপড়া করছে। এরফলে তাদের জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। দূর হতে থাকে ডাঙার মানুষের সঙ্গে বৈষম্য।
ভাসমান বোট স্কুলের শিক্ষক আইয়ুব খান বলেন, ‘নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এসব মানুষ পেতে শুরু করে সরকারি সুবিধাও। ৫৯টি পরিবারকে দেওয়া হয় মুজিববর্ষের ঘর। ফলে ডাঙায় বসবাসের সুযোগ পান তারা। কিন্তু এখনও প্রায় অর্ধশত পরিবার নৌকায় বাস করছে। তাদের শিশুদের জন্য ভাসমান স্কুলটি ছিল কার্যকরী। কারণ, নদীর সঙ্গেই ওদের মিতালি। কিন্তু স্কুলটি বন্ধ হওয়ায় এখন শিক্ষা জীবন থেকে অনেক শিশু ঝরে পড়তে পারে।’
কর্তৃপক্ষ জানান, মান্তা সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন ডাঙায় উঠেছে। তাদের মধ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে শিশুদের স্কুলগামী করার অভ্যাস করা হয়েছে। তাই প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়িয়ে মান্তা শিশুদের হাতেখড়ির সেই স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী সংস্থা জাগোনারীর পরিচালক (যোগাযোগ) ডিউক ইবনে আমিন বলেন, ‘ভাসমান বোট স্কুল প্রকল্পের কার্যক্রম ওখানে শেষ। তবে নদী পাড়েই জাগোনারীর নির্মিত মসজিদ কাম কমিউনিটি সেন্টারের ভবনের দ্বিতীয় তলায় শিশুদের লেখাপড়ার কার্যক্রম চলবে। দুশ্চিন্তার কারণ নেই। খুব শিগগরই সেখানে আমরা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করবো।’
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ ইসলাম বলেন, ‘মান্তা শিশুদের শিক্ষার জন্য ভাসমান স্কুলটি সহায়ক ভূমিকা পালন করছিল। ওইসব শিশুদের জন্য সরকারি স্কুল নির্মাণের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। মান্তা সম্প্রদায়কে দেওয়া মুজিববর্ষের ঘর সংলগ্ন এলাকায়ই স্কুলটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে।’
