দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ পরিচালিত এ গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ফুরিয়ে আসতে থাকায় এক ধরনের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার একটি কূপে নতুন করে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে নতুন করে আশার সঞ্চয় হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানান বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত এ গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ বাড়াতে বিবিয়ানা-২৭ নামে একটি নতুন কূপের খননকাজ শুরুর পর এমন আশার সঞ্চার হয়। তবে প্রকৃত মজুদ এবং উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ জানা যাবে খনন শেষ হওয়ার পর। সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও অন্তত তিন থেকে চার মাস।
নসরুল হামিদ বলেছেন, শেভরন পরিচালিত ওই গ্যাসকূপ থেকে ১ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)-এর ওপর গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, ২০২৫-২৬-এর দিকে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমতে পারে। ২০২৭ সালে গ্যাসের উৎপাদন বেড়ে এই গ্যাপ পূরণ হয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে ২৬টি কূপ রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে এ গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। গ্যাসক্ষেত্রটিতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ছিল ৫ হাজার ৭৫৫ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ গ্যাস ইতিমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকার পাশাপাশি এর চাপও কমতে শুরু করেছে।
বিষয়টি নিয়ে পেট্রোবাংলা গত বছরের শেষদিকে বিতরণ কোম্পানি জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমস লিমিটেডকে (জেজিটিডিসিএল) একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বিবিয়ানা থেকে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে এলেও যাতে গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে কাক্সিক্ষত গ্যাস সরবরাহ বজায় থাকে, তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কম খরচে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং ক্লিন জ¦ালানি সরবরাহ করতে কাজ করছে শেভরন বাংলাদেশ। বিবিয়ানা ছাড়াও মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ নামে আরও দুটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে তাদের। বর্তমানে দেশের জ¦ালানি চাহিদার ৫০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস উৎপাদন করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি।
জানতে চাইলে শেভরন বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস ম্যানেজার শেখ জাহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে ড্রিলিংয়ের (খনন) কাজ চলছে। এটা শেষ হলে তখন গ্যাসের প্রকৃত মজুদ ও উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ জানা যাবে। ড্রিলিং শেষ না হলে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ নেই। ড্রিলিং শেষ হলে তখন আমরা একটা ঘোষণা দিতে পারব।’
সূত্রমতে, অনেক গভীরে গিয়ে কূপটি খনন করতে হচ্ছে। এটা কিছুটা ক্রিটিক্যাল হওয়ায় ভিন্ন পদ্ধতিতে খনন করা হচ্ছে। দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ¦ালানি নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর ফলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
আগামী বছরের মধ্যে ৪৬টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের (সংস্কার) মাধ্যমে প্রতিদিন ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার।
গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে দেশীয় কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২০৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আমদানিকৃত উচ্চমূল্যের এলএনজি থেকে আরও প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস রয়েছে, যদিও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এরপরও ঘাটতি রয়েছে প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সংকটের কারণে এক যুগ ধরে বাসাবাড়িতে নতুন সংযোগ বন্ধ রেখেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনুসন্ধান করা হচ্ছে না। দেশীয় গ্যাসের চেয়ে আমদানিতেই ঝোঁক বেশি। সম্প্রতি নতুন করে কাতার এবং ওমান থেকে আরও এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি খোলা বাজার থেকে চড়া দামে কেনা হচ্ছে এলএনজি।
