লিফলেটসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কারণেই মানুষ ভোটবিমুখ

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩৫ এএম

সরকারের পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছে। তারা এ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে বোঝাতে চেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। জনগণ বিষয়টি অনুধাবন করেছে। এ কারণে জনসাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে যায়নি। এমনটাই মনে করছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির কর্মসূচি সফল হয়নি। তাদের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা ছিল না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আন্দোলন সংগ্রাম শুরুর আগে বারবার ঘোষণা দিয়েছি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায় করব। দলের কোনো কোনো নেতা হরতাল, অবরোধে জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো কর্মসূচিতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু আমরা সে পথে যাইনি। যদিও আমাদের কর্মসূচি চলাকালে ট্রেন, বাসে অগ্নিকান্ড, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আমরা সে বিষয়ে আমাদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছি আমরা এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই। পাশাপাশি গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরে বলেছি সরকারের হয়ে অতীতের মতো কেউ কেউ এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। আমরা অগ্নিকান্ডের ঘটনাকে ন্যক্কারজনক আখ্যা দিয়ে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছি। তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছি। জনগণ এখন আমাদের কথা বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে তার প্রমাণ আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করে তারা আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ভোট বর্জন করেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি চলতে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের দমন-পীড়ন, নিপীড়ন-নির্যাতন, খুন, গুম, মামলা, হামলায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা বিপর্যস্ত। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির মূল্যবৃদ্ধি, ভোটাধিকার, মানবাধিকার হারা দেশের জনগণের পিঠ এমনিতেই দেয়ালে ঠেকে গেছে। জনগণকে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে আমরা আন্দোলন করছি। তাদের ভোগান্তি বাড়ানোর জন্য নয়, বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে আমরা বিরতি দিয়েছি, যা অতীতে কেউ এমন বিরতি দেয়নি।’

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগের ও পরদিন আমাদের ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি ছিল। গতানুগতিক হরতাল, অবরোধে গাড়ি ভাঙচুর, রাজপথে পিকেটিং করার চিত্র দেশের মানুষ দেখেছে। কিন্তু আমরা হরতালের কর্মসূচি থাকলেও আমরা রাজপথে পিকেটিং কিংবা গাড়ি ভাঙচুর করিনি। তারপরও দুদিনের হরতাল কর্মসূচি জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করেছে। জনগণের অংশগ্রহণের কারণেই সফল হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সংগ্রামের কারণে সাধারণ মানুষ আস্থায় নিয়ে আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভোট বর্জন করেছে।’

বিএনপির সঙ্গে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে কর্মসূচি পালন করছি। আমাদের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। জনগণ সচেতন হয়েছে, দেশের ভালোমন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। যুবসমাজ এতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমরা একতরফা ডামি নির্বাচন বর্জনের জন্য জনগণের প্রতি যে আহ্বান রেখেছিলাম, তাতে সাড়া দিয়েছেন তারা। চলমান আন্দোলন সংগ্রামে আমরা ৯৫ শতাংশ সফল হয়েছি। আশা করছি অচিরেই এ সরকারকে বিদায় নিতে হবে, সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ তিনি বলেন, ‘শুধু দেশের জনগণই নয়, গণতান্ত্রিক বিশ্ব ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে মেনে নেবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেকেই নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তাছাড়া সরকারের হয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যারা এসেছেন, তাদের কেউ কেউ নির্বাচনকে উত্তর কোরিয়ার মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকে বলে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করতে পারি না। আসলে আমরা আওয়ামী লীগের মতো লগি, লাঠি, বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা করতে পারি না। আমরা সে আন্দোলন করতে চাই না। আমরা শুরু থেকেই জনগণের কাছে ওয়াদা করেছি শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করব। গত ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত আমরা সভা-সমাবেশ, হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন, লিফলেট বিতরণসহ যত কর্মসূচি পালন করেছি তা শান্তিপূর্ণ ছিল। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আমাদের বিজয় এনে দিয়েছে। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসেনি। সাধারণ মানুষ ভোট বর্জন করেছে।’

জনগণ ভোট বর্জন করায় বিএনপি আন্দোলন সফল হয়েছে বলে দলটির নেতারা যে দাবি করছেন তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলনে সফলতা অর্জন করতে পারেনি। কারণ তারা তাদের আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। কর্মসূচি ঘোষণা করে তাদের দলের নেতারা নিজেরাই রাজপথে নামেননি। বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে নামলে জনগণ নামত। জনগণ সম্পৃক্ত হলে আন্দোলন সফল হতো। যেহেতু সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করে ফেলেছে সেহেতু তাদের আন্দোলন সফল হয়েছে বলা যাবে না।’

গত রবিবার সারা দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৪১ দশমকি ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন। যদিও জনসাধারণের মধ্যে এ দাবি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বিএনপির আন্দোলনের কারণে নয়, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী স্বতন্ত্রের মধ্যে ভোটের মূল প্রতিযোগিতা হওয়ায় অনেকে ভোটকেন্দ্রে যায়নি।

গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ প- হওয়ার পর ২৯ অক্টোবর থেকে দলটি চার দফা হরতাল ও ১৩ দফা অবরোধ-কর্মসূচি পালন করে। এরপর গত ২০ ডিসেম্বর অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে জনগণের মধ্যে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করেছে দলটি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ৬ ও ৭ জানুয়ারি ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি পালন করে। এখন নির্বাচনের পরদিন গতকাল ভোট বর্জনে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুদিনের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত