দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন মেরুকরণ ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াবে

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:১৭ পিএম

বাংলাদেশে গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচনে হাজারও প্রার্থী, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অনেক সংগঠন, বিশাল র‌্যালি, বিপুল প্রেস, এমনকি নজরকাড়া নির্বাচনী গান ছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই ভোটে প্রতিযোগিতার চিহ্ন ছিল না। অংশগ্রহণ ছিল না বেশির ভাগ ভোটারের। সম্প্রতি পিয়েরে প্রকাশের লেখা দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবি তোলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো। কিন্তু তা আওয়ামী লীগ সরকার প্রত্যাখ্যান করে। এরপর নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি ও অন্য দলগুলো। গত অক্টোবরে মহাসমাবেশের পর বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন বর্জনের অর্থ হলো ৭ জানুয়ারি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদ নিশ্চিত করবে আওয়ামী লীগ।

এরপর নির্বাচন কমিশন (ইসি) যখন ঘোষণা করে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ অথবা দলটি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মিলে ২৮৩টি আসনে জয়ী হয়েছে, তখন বিস্মিত হওয়ার কিছু ছিল না। অনেক আসনে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থীদের পরিবর্তে তাদেরই মিত্রদের নির্বাচনে দাঁড় করায়।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ যখন আরও পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ নিশ্চিত করল, তখন তা ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। ইসি এবারের নির্বাচনে ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে দাবি করলেও এই পরিসংখ্যান নিয়ে অনেক সন্দেহ আছে। নির্বাচনের দিন অনেক ভোটকেন্দ্রই দিনব্যাপী ফাঁকা ছিল।

নির্বাচনে প্রকৃত বিরোধীদল না থাকায় অনেক ভোটারের ভোট প্রদানে তেমন উৎসাহ ছিল না। ভোটের এ নিম্নমুখী হারে ক্ষমতাসীন সরকারের সাম্প্রতিককালের কর্মকাণ্ডে ভোটারদের অসন্তোষ প্রতিফলিত হয়েছে। সরকারের সমালোচকদের ধরপাকড়, নিপীড়ন, দুর্নীতির উচ্চহার এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার এর অন্যতম কারণ।

বিগত ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেছিল। তারা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দাবি করেছিল এবং তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন। বিএনপির ২৮ অক্টোবর বিশাল সমাবেশ দ্রুত পণ্ড করে দেয় পুলিশ। পরবর্তী সময়ে দলটির প্রথম সারির নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাদের প্রস্তাব দেওয়া হয় তারা নির্বাচনে এলে তাদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

তবে আওয়ামী লীগের এই প্রস্তাব মাত্র একজন গ্রহণ করেছেন। প্রস্তাব লুফে নেওয়া মাত্রই তার জামিন হয়েছে এবং তিনি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। তবে বিএনপি তাদের ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছে। যদিও তাদের অনেক নেতা এখনো জেলে আছে।

এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও তাদের বৈধতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান হারে বিতর্ক হচ্ছে এবং পরপর তিনটি ত্রুটিযুক্ত নির্বাচনের পর ভোটারদের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। বিএনপির সহিংসতা বর্জন দেশে ও বিদেশে তাদের ভাবমূর্তি বাড়ালেও দলটি তাদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

সম্প্রতি শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপির রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। এর মাধ্যমে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। বিএনপিকে নিষিদ্ধ করা ভুল হবে। এমন পদক্ষেপ নেয়া হলে বাংলাদেশে শুধু প্রকৃত রাজনীতির বিলুপ্তি হবে না, এতে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বাংলাদেশকে রাজনীতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি থাকবে। পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ।

বিএনপিকে আন্ডারগ্রাউন্ডে পাঠানো হলে দেশের আরও মেরুকরণ হবে। যদিও ইতোমধ্যে ছোট ছোট দলগুলো এবারের নির্বাচন বয়কট করেছে এবং তারা বিএনপির সঙ্গে একক আন্দোলনে মিশে যাচ্ছে। বিএনপিকে নিষিদ্ধ করলে এই ধারা ত্বরান্বিত হবে। বামপন্থী, ইসলামিক দল এবং মধ্যপন্থি বিএনপি আরও একত্রিত হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত