অর্থনীতিতে বড় সংকট দেখছে না ডিসিসিআই

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪১ এএম

কভিড মহামারীর পর দেশের অর্থনীতি কিছুটা সামলে উঠলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর খুব বেশি চাপের মধ্যে পড়েছে। সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির চাপ, রিজার্ভ সংকটসহ চারটি প্রধান সংকটকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে চলতি অর্থবছরের শেষার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মনে করে, দেশের অর্থনীতিতে বড় কোনো সংকট নেই। মূল্যস্ফীতি আন্তর্জাতিক বাজারেও বেশি, দেশের খেলাপি ঋণ ব্যাংকের সম্পদের তুলনায় বেশি নয় বলে মত দিয়েছে এ সংগঠন।

গতকাল শনিবার ‘সমসাময়িক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালে ডিসিসিআইয়ের বর্ষব্যাপী কর্মপরিকল্পনা’ বিষয়ে ঢাকা চেম্বার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নতুন সভাপতি আশরাফ আহমেদ প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি খুব বেশি থাকলেও বেশিরভাগ দেশেই তা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তা ছাড়া এ উপমহাদেশের ভারত, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এসেছে।

তবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় খুব বেশি নয় উল্লেখ করে আশরাফ আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি সবাইকে পীড়া দেয়। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিশে^ই সমস্যা। বিশে^র সঙ্গে তুলনা করলে খুব বেশি না। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ আছে।

দেশের অর্থনীতিতে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। বিতরণ করা ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই খেলাপি এবং তা প্রতিবছরই বাড়ছে। ডিসিসিআই সভাপতি খেলাপি ঋণকে কোনো বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিংয়ের সমস্যা আছে। তবে এনপিএল নিয়ে খুব বেশি কথা হচ্ছে। কিন্তু খেলাপি ঋণ যেমন বেড়েছে, দেশের ব্যাংকগুলোর এসেটও বেড়েছে তার তুলনায় পাঁচ গুণ। সে হিসেবে দেশের খেলাপি ঋণ খুব বেশি না। খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২টি ব্যাংকের সমস্যা।

আশরাফ আহমেদ মনে করেন, ব্যাংকের অনেক দুর্বলতা রয়েছে কারণ, পদ্ধতিটা স্বাস্থ্যকর না।

এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভে অস্থিতিশীলতা, এলসি খোলার জন্য ডলারের অপর্যাপ্ততা, গ্যাসসংকটসহ কিছু সমস্যা আছে। তবে এগুলো সবই সমাধান সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘আমরা সব ওভারকাম করতে পারব। সে সক্ষমতাও আমাদের আছে। কোনো কাজে চ্যালেঞ্জ থাকবে না, এমন দুনিয়া হয় না। বারবার বাংলাদেশ এসব সমস্যার সমাধান করেছে, এটা প্রমাণিত সত্য।’

আশরাফ আহমেদ বলেন, ‘আগামী এক দশকে আমরা বিশ্বের ২০টি বড় অর্থনৈতিক দেশে পৌঁছাতে যাচ্ছি। আমাদের গ্রোথের সব ফান্ডামেন্টাল ভালো আছে, কিছু ক্ষুন্ন হয়নি। প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত।

বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, পুরো অর্থবছরের চার প্রান্তিকেই জিডিপির প্রবৃদ্ধির প্রধান অন্তরায় ছিল আর্থিক ও বীমা খাতের শূন্য প্রবৃদ্ধি। শুধু আর্থিক খাতের সংকটের কারণেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি নেমে আসে। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও জিডিপির পূর্বাভাস ৭ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘বিবিএসের প্রান্তিক জিডিপির তথ্য আমার জানা নেই। সুতরাং আমি এ নিয়ে কিছু বলতে পারব না।’

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোকে খুব বড় বিষয় মনে করেন না এই ব্যবসায়ী নেতা। তিনি মনে করেন, ‘আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে। তবে সেটা বড় বিষয় নয়। আমাদের অর্থনৈতিক গ্রোথ পরিবর্তন করার মতো কোনো ফান্ডামেন্টালের পরিবর্তন হয়নি।

সব ঠিক আছে।’

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ সমস্যা আমাদের আগেও হয়েছে। সেটা আমরা ওভারকাম করেছি। আর বিবিএস (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) যে মূল্যস্ফীতির তথ্য দিচ্ছে সেটা নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিবেচনায়। পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয়।’

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি সবাইকে পীড়া দেয় সত্য। তবে এটা বিশ্বে প্রভাব ফেলেছে। আমাদের মূল্যস্ফীতি ৬ থেকে ১০ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু বাকি দুনিয়ার তুলনায় সেটা অনেক ভালো অবস্থা।’

রিজার্ভ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের আড়াই মাসের মজুদ রিজার্ভ প্রয়োজন। সেখানে সাড়ে তিন মাসের রিজার্ভ মজুদ রয়েছে।’

সিএমএসএমইদের সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে উদ্যোক্তারা উঠতে পারেন না ব্যাংকের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। ছোট ঋণ ম্যানেজ করা ব্যাংকের জন্য ইকোনমিক হয় না। এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়াটা সহজ করতে হবে। এ ছাড়া এসব খাতে দক্ষ মানুষের অভাব। শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এনে তা পূরণ করতে হবে।’

আশরাফ আহমেদ বলেন, ‘প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়াতে অনেক আইনের পরিবর্তন ও সংযোজন প্রয়োজন। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজার থেকে আমাদের যে পরিমাণ ব্যবসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, আমরা তার সামান্যও নিতে পারছি না। সেটা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে সহায়ক নীতি প্রয়োজন। আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আরও বেশি মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। পুঁজিবাজারে বন্ডের সেকেন্ডারি ট্রেড বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনে গ্যাস আমদানি করতে হবে।’

ডিসিসিআই সভাপতি আরও বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপ-আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে চীন ভারত ও আফ্রিকার মতো জনবহুল দেশে যেতে হবে। কারণ এসব দেশে কনজিউমার বেশি। সেজন্য প্রয়োজনীয় ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি করতে হবে।’

এ সময় অন্যদের মধ্যে ডিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী এবং সহসভাপতি জুনায়েদ ইবনে আলী উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত