সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। একুশ শতাব্দীতে না ত্রেতা বা দ্বাপর যুগে বসে আছি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। দিল্লির লালকেল্লায় চমৎকার এক প্রোগ্রাম চলে বহু বছর ধরে। সেখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মধ্য দিয়ে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চোখ বন্ধ করে শুনতে থাকি, ঘোড়ার খুরের শব্দ, লালকেল্লা বা আগ্রা ফোর্টের ভেতরের মীনা বাজারে বেগম সাহেবাদের পায়ের মৃদু ছন্দে হেঁটে যাওয়া কিংবা সিপাহি বিদ্রোহের রণদামামা। আজ এই শীতের সকালে মনে হচ্ছে বৃহৎ এক আলো শব্দের যুগলবন্দিতে আমরা পৌঁছে গেছি রামায়ণের কালে।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় পুরো ভারত যেন অযোধ্যা নগরী। দশরথ, চার ছেলে নিয়ে সুখে রাজত্ব করছেন। তপোবনে সন্ন্যাসীরা ধ্যানে মগ্ন। কৌশল্যা, কৈকেয়ী মহিষীরা সখী পরিবেষ্টিত হয়ে দ্যুত ক্রীড়ায় ব্যস্ত। ধীরে ধীরে রামচন্দ্র বড় হচ্ছেন, অস্ত্র শিক্ষা করছেন। রত্নাকর বাল্মীকি হয়ে রাম কথা লিখে চলেছেন। চোখ বুজে রামচন্দ্র দেখতে দেখতে সুপার ইম্পোজ হয়ে কখন যেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখ দৃশ্যমান হচ্ছে। কখনো রাম কখনো নরেন্দ্র, কখনো নরেন্দ্র কখনো ভগবান রাম, চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে। এই তো ভগবানের লীলা। কলিকালে আমাদের মতো গ-মূর্খদের এমন সব ঈশ্বর লীলা বোঝার সাধ্য কতটুকু। কোথায় থেকে যেন দৈববাণী শোনা যাচ্ছে ওরে নরাধম, যিনি নরেন্দ্র তিনিই ভগবান রামচন্দ্র। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করতে ভগবান আবির্ভূত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরূপে।
আপনি প্রশ্ন তুললে, আমি মনে করিয়ে দেব বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। মহাকাব্য নিয়ে এই যে রমরমা তাও তো বিশ্বাসই। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই তো বাবরি মসজিদ ভেঙে দিলেও মহামান্য আদালত জানিয়ে দিতে পারেন ঠিক কোন জায়গায় মহাপুরুষ রামচন্দ্র আবির্ভূত হয়েছিলেন ধরাধামে। বিশ্বাসের দৌলতেই তো পুরাণ গাঁথা ইতিহাসের জায়গা নিচ্ছে। ধর্ম রাজনীতির মিশেল অখণ্ড ভারতে নতুন নয়। তার সঙ্গে অধুনা ধর্ম সামনে রেখে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। রামচন্দ্রকে সামনে রেখে করপোরেট পুঁজির লগ্নি নিঃসন্দেহে আধুনিক ভারতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মন্দিরের উদ্বোধন ও অযোধ্যা উন্নয়নের নামে ঠিক কত হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে তা কোনো দিনই সঠিক জানা যাবে না। আবেগের এই ঢক্কা নিনাদে ভুলেও প্রশ্ন তোলা যাবে না, যে দেশে ষাট শতাংশ সম্পত্তি মাত্র পাঁচ শতাংশের হাতে, ১০০ জন ধনীর হাতে ৫৫ লাখ কোটি টাকার সম্পদ কেন্দ্রীভূত অথবা যে দেশে আজও ৯২ শতাংশ নারী ও ৮২ শতাংশ পুরুষের মাসে রোজগার দশ হাজার টাকার কম, সেখানে রাষ্ট্র সর্বশক্তি দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছে কোন উদ্দেশ্য সাধনে!
এসব কথা বললেই আপনি দেশদ্রোহী। আপনি হয় নিগৃহীত হবেন অথবা জেলে যাবেন। সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে শাস্ত্রীয় বচন মানার কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে রামচন্দ্রকে সামনে রেখে আগামী নির্বাচনে জিততে বিজেপি ও সংঘ পরিবার চূড়ান্ত হাইপ তুলতে এমন সক্রিয়, সেই সনাতন ধর্মের একাধিক ধর্মগুরু ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন শাস্ত্রসম্মতভাবে রামমন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না বলে।
হিন্দু ধর্মে তীর্থ ও ধামের পার্থক্য আছে। পবিত্র চার ধামের দুই শঙ্করাচার্য ইতিমধ্যেই রামমন্দির প্রতিষ্ঠার দিনে অযোধ্যা না যাওয়ার কথা খোলাখুলি বলে দিয়েছেন। এই দুজন, যোশীমঠ ও পুরীর প্রভাবশালী দুই ধর্মগুরু। অন্যজন দুজন শঙ্করাচার্য আপাতত নীরবতা অবলম্বন করলেও তারা যে ধর্ম নিয়ে এমন বাড়াবাড়ি পছন্দ করছেন না তা স্পষ্ট। স্বয়ং রামমন্দিরের প্রধান পুরোহিত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রাণ প্রতিষ্ঠার আগেই রাম লালার বিগ্রহ মিডিয়া মারফত সারা দেশের সামনে চলে আসাতে।
ভারতের জনগণের কাছে রাম নাম নতুন কিছু নয়। আমরা, সব ধর্মের লোকজনের কাছেই রাম আখ্যান পরিচিত। বছরের পর বছর কল্প কাহিনি, নাটকে, যাত্রাপালা ও কথকতায় রাম কথনে এ দেশ অভ্যস্ত। কলকাতা ময়দানে রবিবার এখনো বসে রাম কথকতা। কলেজ স্ট্রিট ও হেদুয়ার চত্বরে কলেজজীবনে আমরাও শুনেছি রামচন্দ্র আখ্যান। সে রাম কথনে কোলাহল ছিল না। বড় নিরুচ্চারে আমরা শুনতাম রামায়ণের আলেখ্য। ছোটবেলায় মা-দিদিমা-ঠাকুমার মুখে শুনতাম মারীচের কথা, রামকে অন্যায় করে রাজত্ব না দেওয়ায় যেমন কষ্ট পেতাম, তেমনি দুঃখ পেতাম হনুমানকে দলে নিতে অন্যায়ভাবে বালি বধের ঘটনায় বা পরবর্তী সময় সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলায়। কষ্ট পেতাম লক্ষ্মণ পত্নি উর্মিলার জন্য। বিভীষণকে বিশ্বাসঘাতক বলে ভালো লাগত না। দশাননকে অদ্ভুত লাগত দশটা মাথা থাকায়। তবে সবমিলিয়ে এই রামচন্দ্র তো ঘরের লোক। আপনজন। তিনি ধীরে ধীরে কেমন করপোরেট হয়ে গেলেন। একটি দলের নিজস্ব হয়ে গেলেন টের পাইনি। একদমই পাইনি তাও নয়। আদভানির রামরথ, বাবরি মসজিদ ভাঙা, গুজরাট গণহত্যা, স্বঘোষিত হিন্দু হৃদয় সম্রাটের আবির্ভাব সবই তো এক সুতায় বাঁধা। আজ চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স। রাম জন্মভূমি পুনরুদ্ধারের নামে গোটা দেশে স্তব্ধ হয়ে যাবে। সরকারি ছুটি থাকবে অনেক জায়গায়। এইমসের মতো হসপিটালে আউটডোর বন্ধ থাকবে। সারা দেশে হসপিটালে নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তাররা কর্মবিরতি করবেন। কত কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, কত রোগী বিনা চিকিৎসায় কাল মারা যাবেন এসব কথা না তোলাই ভালো। কে আর সাধ করে রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে জেলে যেতে চাইবেন!
শাস্ত্রজ্ঞ জন বিধান দিয়েছেন রাম লালার আনুষ্ঠানিকভাবে যিনি প্রথম পূজারী, তিনি এগারো দিন ধরে সাত্ত্বিক জীবনযাপন করবেন, মাটিতে শয়ন করবেন ও নিরামিষ ভোজন করবেন এবং কদাপি একটি শব্দ মিথ্যা বলতে পারবেন না। আমরা গর্বিত এ কাজটি করতে চলেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজি। তিনি নিশ্চিত ব্রত পালন করবেন নিষ্ঠা সহকারে। বলাই বাহুল্য, তিনি কদাচ অসত্য বলেন না। মাটিতে শয়ন ও নিরামিষ ভোজন তার মতো রামভক্তের কাছে কোনো কঠিন কাজই নয়।
ছাব্বিশে জানুয়ারি এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান তৈরি হয়েছিল। তেইশে জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন। দেশের রাজধানীসহ সব বড় শহরে কয়েক দিন ধরেই এ সময় জাতীয় পতাকা বিক্রির ধুম লাগে। এ বছর দিল্লি থেকে হরিয়ানা, ইউপি, গুজরাট সর্বত্রই অনেক পেছনে চলে গেছে জাতীয় পতাকা। সারা ভারতে এখন সগর্বে উড়ছে গৈরিক ঝান্ডা। এও তো এক নতুন ভারত। বহুত্ববাদী দেশ এখন দ্রুত একদলীয় শাসনের দিকে ধাবমান। আরএসএসের ক্যালেন্ডারে ১৫ আগস্টের কোনো স্বীকৃতি নেই। জাতীয় পতাকার জায়গায় গেরুয়া পতাকা উড়ছে দেখে অবাক হবেন না। এ তো সংঘ পরিবারের দীর্ঘদিনের এজেন্ডা। ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী ভারতের শোকগাথা লেখার দিনও আজ- বাইশে জানুয়ারি। সোমবার। দুহাজার চব্বিশ সাল।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
