উপভোগের বিপরীতে দুর্ভোগ!

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:০৮ পিএম

ডলারের উচ্চমূল্য ব্যাংকগুলো যখন উপভোগ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন ওঠে। এই উচ্চমূল্যের কারণে দুর্ভোগ হয় কাদের? আমরা দেখছি, ডলারের সরবরাহজনিত ঘাটতির কারণে দেশের প্রায় সব খাতই সংকটে রয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। মূল্য বেড়ে গেছে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের। উৎপাদনমুখী খাতের অসংখ্য কোম্পানি লোকসানে পড়েছে। ব্যাপক হারে সংকুচিত হয়েছে মুনাফা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারা? আবার সংকটকালে ডলারের ব্যবসা করেই ব্যাংকগুলো ভালো ব্যবসা করছে। ২০২২-২৩ হিসাববছরে ডলার ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলো ডলারের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও সংকটের এ সময়টা ভালোভাবে উপভোগ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খুলতে বড় ব্যবসায়ীরাও এখন ব্যাংকগুলোতে ধরনা দিচ্ছেন। সুযোগ পেয়ে ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছে ডলার। দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ডলারে সংকট ডলারেই মুনাফা’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি জানা গেল।

যে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করেছে, ঠিক সেই সময় অনেক প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা লোকসান করেছে। কিন্তু যেভাবেই হোক, বাজার থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লোকসানকৃত অর্থ ঠিকই তুলে নেবে। এর মানে হচ্ছে, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে পকেট কাটবে সাধারণ মানুষের। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারে লাভ করেছে। এটি পার্ট অব দ্য স্টোরি। কিন্তু বাংলাদেশে ডলারের সংকট এবং ক্রমান্বয়ে যে অবনমন হচ্ছে, তা একটা জায়গায় স্থির করে রাখা হচ্ছে, এটি আরেকটি স্টোরি। বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব ডলার বিক্রি করেছে, অবনমনের কারণে বেশি টাকায় বিক্রি করতে পারছে। কিন্তু বড় বিষয় হলো, বিদেশি মুদ্রা খাতকে আমরা কতটুকু স্বস্তির মধ্যে আনতে পেরেছি, সেটি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় কতটুকু অবদান রাখছে, সেটি এখানে বিবেচ্য বিষয়।’ এরই মধ্যে আইএমএফের পুরনো ঋণের সুদ বাবদ ৫ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ইউএস ট্রেজারি নোটসে বিনিয়োগ ও বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ডে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা লোকসান বহন করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলার সংকট ও দরবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। জিনিসপত্রের বাড়তি ব্যয় মেটাতে মানুষের কষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি অর্থনীতিকে বিপদে ফেলছে। আমদানিতে বিভিন্ন নীতিগত শর্ত দেওয়ার কারণে দেশে বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি কিছুটা কমছে। চলতি হিসাবের পরিস্থিতির ও উন্নতি হয়েছে। তবে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে আর্থিক হিসাবে। এর মূল কারণ, যে হারে দেশে বিদেশি ঋণ আসছে, এর চেয়ে বেশি আগের নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক লেনদেনেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

আর্থিক খাতের মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষ তেমন বোঝে না। ইতিমধ্যে ডলার সংকটের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে বিভিন্ন ব্যাংক। একদিকে ডলারের সংকটকালে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা ভেবে দেখা উচিত। ডলার সংকটে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কথা জানা গেছে। একেক ব্যাংক ডলারের দাম রেখেছে একেক রকম। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। অবধারিতভাবে পণ্যমূল্যও বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। মুদ্রানীতি বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ কী হবে, তা সাধারণের ধর্তব্য নয়। তারা চায়, আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা। সে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তাদের যাতে কোনোরকম দুর্ভোগ না হয়, সে বিষয়টি সর্বাগ্রে ভাবা দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত