ভার্মি কম্পোস্টে স্বপ্ন বুনছেন মহিউদ্দিন 

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:২৩ পিএম

চাকরি ছেড়ে শুরু করেছিলেন নার্সারি। এখন স্বপ্ন বুনছেন ভার্মি কম্পোস্ট সারে। গড়ে তুলেছেন কম্পোস্ট তৈরির কারখানা। ভার্মি কম্পোস্ট ও নার্সারি গড়ে এখন হয়ে উঠেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা। পরিশ্রমী এই উদ্যোক্তার নাম বি এম মহিউদ্দিন। তার বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের মজলিশপুর গ্রামে। এক সময় কোরিয়ান শিপিং লাইনে জাহাজের নাবিক হিসেবে চাকরি করতেন। 

তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসে শুরু করেন নার্সারি ব্যবসা। বাড়ির পাশেই প্রায় ৩ একর জমির উপর গড়ে তোলেন নার্সারি। নার্সারির পাশাপাশি এখন গড়ে তুলেছেন একটি ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কারখানা। নার্সারি আর সার তৈরির কারখানায় নিয়মিত কাজ করেন ৭ জন শ্রমিক। কোনো কোনো সময় বেড়ে ১৫ জনও হয়। 

মহিউদ্দিন বলেন, একটা শিপিং কোম্পানিতে মেইনার মাস্টার হিসেবে কাজ করতাম। প্রায় ১২ বছর সেখানে চাকরি করেছি। দেশে এসে মনে হলো কিছু একটা করা দরকার। নার্সারি ব্যবসা আমার ভালো লাগে। সেখান থেকেই শুরু। নার্সারিতে সারের প্রয়োজন হতো। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে জৈব সার সংগ্রহ করতাম। চাহিদা অনুযায়ী তারা আমাকে দিতে পারতো না। এরপর থেকে নার্সারিতে ব্যবহারের জন্য সার উৎপাদন শুরু করি। এখন এটা বাণিজ্যিক আকারে রূপ নিয়েছে। এছাড়া বিষমুক্ত খাবার উৎপাদন করতে জৈব সারের বিকল্প নেই। কৃষিকাজে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো দরকার। জৈব সারের ব্যাবহার বাড়াতে পারলে মানুষের রোগবালাই কমে যাবে। আমার এখানে সাধারণত দুই ধরনের সার উৎপাদন করা হয়। একটা ভার্মি কম্পোস্ট। আর একটা ট্রাইকো কম্পোস্ট। প্রতিদিন গড়ে খামারে ১০ মণ সার উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতিকেজি সার  ১৫টাকা দরে বিক্রি করে থাকি। উৎপাদিত বেশির ভাগ সার এলাকার সবজি চাষি ও মাছের খামারীরা নিয়ে যায়। বাকি সার উপজেলা কৃষি অফিস বিক্রি করতে সহযোগিতা করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বসন্তপুর বাসস্ট্যান্ড হতে একটু পূর্ব দিকে রাস্তার ডানপাশে বিশ্বাস নার্সারি ও জৈব সার কারখানা লেখা কয়েকটি সাইনবোর্ড ঝুলছে। একটি টিনের বড় সেড। সেডের সামনে বিভিন্ন গাছের চারা। সেডের ভেতরে ইট দিয়ে হাউজ তৈরি করা হয়েছে। হাউজের মধ্যে গোবর ও কলাগাছের ছোবরা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ছোট বড় ২৭টি হাউজ রয়েছে তার শেডে। কেউ খালি হাউজে গোবর বোঝাই করছে। কেউ ট্রাইকো সার এনে ভার্মি সেপারেটর (আলাদাকরণ ) মেশিনের কাছে নামাচ্ছে। কেউ সেই সার সেপারেটর মেশিনের মাধ্যমে আলাদা করছে। মহিউদ্দিন তার শ্রমিকদেরকে কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন। ঘরের এক পাশে তৈরি সার স্তুপ দিয়ে রাখা হয়েছে। টিন সেডের সামনে বস্তা ভরা গোবর জমিয়ে রাখা হয়েছে।

খামারে কাজ করছেন শাহানাজ আক্তার নামে একজন নারী শ্রমিক। শাহানাজ বলেন, আমি পাঁচ বছর আগে থেকে এখানে কাজ করি। আগে শুধু নার্সারি ছিল। দেড় বছর আগে এখানে সার উৎপাদন শুরু করেছে। আমার মতো আর চারজন নারী শ্রমিক এখানে কাজ করে। আমার স্বামী ট্রাক চালক। বর্তমান বাজারে জিনিস পত্রের দাম অনেক বেড়েছে। এখানে কাজ করে যে আয় হয় তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু জমা করছি।

কেঁচো খামারে গোবর বিক্রি করেন খামারী মো. তুহিন শেখ। তিনি বলেন, আমার বাড়িতে একটি গরুর খামার আছে। সেখানে অনেক গোবর হয়। এতদিন গোবর দিয়ে জ্বালানি তৈরি করা হতো। এখন এই কম্পোস্ট তৈরির কারখানায় গোবর দিচ্ছি। সিমেন্টের এক বস্তা গোবর ২৫টাকায় বিক্রি করি। গোবর বিক্রিতে খামারে নতুন আয় যুক্ত হয়েছে। আমাদের গ্রামের অনেক খামারিই এই বিশ্বাস জৈব সার কারখানায় গোবর বিক্রি করে থাকেন।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জৈব সার পরিবেশবান্ধব। জৈব সার মাটির উর্বরতা বাড়ায়। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। কয়েক ধরণের জৈবসার আমাদের দেশে উৎপাদন হয়ে তাকে। তার মধ্যে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) একটি। রাজবাড়ীতে কেঁচো সারের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা দেশেই এখন রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানোর চেষ্টা চলছে। এজন্য জেলায় ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি কৃষি প্রদর্শনীর সাথে ভার্মি কম্পোস্ট সারের প্রদর্শনী বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগীতা প্রদান করা হচ্ছে।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত