অব্যাহত থাকুক রপ্তানি রেকর্ড

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৬ এএম

কয়েক বছর ধরে বেশ কয়েকজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞ বলছিলেন বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের রপ্তানি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্ববাজার ও বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছিলেন- নিশ্চিতভাবেই রপ্তানিতে ধাক্কা খেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ইতিহাসের একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ রেকর্ড রপ্তানির দেখা পেয়েছে।  ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ মাসে বাংলাদেশ থেকে ৩ হাজার ৩২৬ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৩ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার। সেই হিসাবে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে সামগ্রিক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। জানা গেল, সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘শঙ্কা উড়িয়ে রেকর্ড রপ্তানি’ প্রতিবেদন থেকে।

এই সাফল্যে আত্মতৃপ্তি নিয়ে বসে থাকলে হবে না। কারণ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মাত্রই স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। তখন বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে এখনই বহুমাত্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের অনেক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে। এর ফলে সেসব দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়লেও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আমদানি। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশ এসেছে  পোশাক রপ্তানি থেকে। কিন্তু রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি বাজারকে শুধু পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বহুমুখীকরণ করেছে। আমাদেরও সেই পথে হাঁটলে কতটুকু সুবিধা আসতে পারে তা বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। এদিকে রপ্তানি পণ্যে নগদ সহায়তা কমানোর মাসেই রেকর্ড রপ্তানি এলেও এ মাসের জন্য নগদ সহায়তা কম পাবেন রপ্তানিকারকরা। গত ৩০ জানুয়ারি প্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আগের নগদ সহায়তার হার ১ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া অপ্রচলিত বাজারের জন্য দেওয়া নগদ সহায়তার হার কমানো হয়েছে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট। ওই প্রজ্ঞাপনে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অপ্রচলিত বাজারগুলোকে প্রচলিত বাজারের ক্যাটাগরিতে আনা হয়েছে।

আমরা জানি, কোনো দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে সেই দেশ রপ্তানি আয় বাড়াতে পারে। কারণ, ক্রেতারা অতীতের তুলনায় কম দামের প্রস্তাব দিলেও উৎপাদনকারীরা অর্ডার নিতে পারেন, যা বিশ্ববাজারকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। আসলে রপ্তানি কতটা হবে, তা নির্ভর করে অন্য দেশগুলোয় পণ্যের কতটা চাহিদা রয়েছে তার ওপরে। রপ্তানি আয় আরও বাড়ানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে বাজার বহুমুখী করা এবং রপ্তানি পণ্য বহুমুখী করে  তোলা। এমন সময়ে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ল, যখন লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সীমিত। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই পোশাকের। আবার পোশাকের ৭০ শতাংশের বেশি যায় পশ্চিমা বিশ্বে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম লোহিত সাগর। হুথিদের হামলার শঙ্কায় ইতিমধ্যে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যও লোহিত সাগর এড়িয়ে চলছে। এতে পোশাক রপ্তানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণের খরচ ক্রেতারা বহন করে, তারপরও রপ্তানিকারকদের ওপর তেমন ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি। তার প্রমাণ রেকর্ড রপ্তানি।

কিন্তু এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে,  পোশাক শিল্পের ওপর অতিমাত্রার নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে নজর দিতে হবে অন্যান্য পণ্যের দিকে। আমাদের একটা বড় ধরনের সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার, কাঁচামাল ও উৎপাদন মূল্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অকল্পনীয় সস্তা। যে কারণে অসংখ্য দেশের নজর রয়েছে আমাদের ওপর। সম্ভবত এই কারণকে মুখ্য ধরে, ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ১০ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। কিন্তু এর জন্য বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার নীতিকৌশল চূড়ান্ত করা দরকার। মনে রাখতে হবে আশপাশেই কিছু দেশ রয়েছে, যারা রপ্তানি বাজার ধরতে উন্মুখ হয়ে রয়েছে। কোনোভাবেই যেন আমাদের রপ্তানি পিছিয়ে না যায়। এই রেকর্ড অব্যাহত থাকুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত