ক্ষমতার আশ্রয়ে ধর্ষণতন্ত্র

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:০২ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা ও তার সহযোগী ক্যাম্পাসে এক বহিরাগত স্বামীকে আটকে রেখে জঙ্গলে গৃহবধূকে গণধর্ষণ করেছে। ধর্ষক ছাত্রলীগ নেতাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে ছাত্রলীগের অপর চার নেতা কর্মী। ধর্ষকরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্যাম্পাসের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি ও অছাত্ররে হল ছাড়া করার দাবিতে উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান যেখান থেকে আমরা শিখেছি কীভাবে বাকি জীবনটা যাপন করব। রাষ্ট্র কৃষক, শ্রমিক মেহনতির মানুষের ট্যাক্সের টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়। সবাই প্রত্যাশা করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতিকে পদ দেখাবে। যে রাষ্ট্রের ট্যাক্সের টাকায় আমরা পড়ালেখা করেছি, সেখানে আমাদের দায় আছে। কিন্তু সে দায় শোধে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মিলছে না বহুদিন। 

একটি সন্তানকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাশ করিয়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠাতে একটি পরিবারকে কী পরিমাণ আত্মত্যাগ করতে হয় তা শুধু ভুক্তভোগী পরিবার জানে। সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বাবা- মা স্বপ্ন বুনে ছেলে মেয়ে একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে, পরিবারের হাল ধরবে, দেশ ও জাতির কাছে বংশের নাম উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সে ছেলেরা নষ্ট রাজনীতির গহ্বরে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে উঠছে, ছিনতাইকারী হচ্ছে, ধর্ষক হচ্ছে। পরিবারের সারা জীবন পরিশ্রম, আশা ভরসা ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। এই দা কার! এই দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, এই দায় আমাদের শিক্ষকদের, এই দায় আমাদের। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর রাত জাগিয়ে র‌্যাগ দেওয়া হয়, যারা র‌্যাগ দেয় তাদের গালির আওয়াজে বিল্ডিং কেঁপে উঠে কিন্তু হল প্রশাসনের কানে কখনো যায় না। গালি শুরু হয় ‘মা’ দিয়ে। যেন গর্ভধারিণী মা জন্ম দিয়ে আজন্ম পাপ করেছেন। পরের বছর র‌্যাগিংয়ে ভুক্তভোগীরাই পরবর্তী ব্যাচকে র‌্যাগ দেয়। এ যেন কৃষকের ছেলে পুলিশ হয়ে কৃষকের বুকে গুলি করার মতো। 

হলগুলোতে একটি সিটের জন্য ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অনুগত হতে হয়। সে অনুসারে এখন ছাত্রলীগ করতে হয় অথবা ছাত্রলীগের অনুগত হতে হয়। হল প্রশাসন সব বিষয়ে অবগতের পরেও এই সিট দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় না। হল দখলের পর তারা নজর দেয় চাঁদাবাজির দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত প্রায় সব চাঁদাবাজির সঙ্গেই তারা জড়িত। এমনকি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগও আছে। অপরাধক্রমে বেপরোয়া এই ছেলেরা জড়িয়ে পড়ে ধর্ষণে, গণধর্ষণে।  ক্ষমতার কাঠামো ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগসাজশ তাদের এতটাই বেপরোয়া করেছে যে, তারা কাউকে পরোয়া করে না। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে আঙুল তোলার সাহস কারও নেই।

জাহাঙ্গীরনগরে একটি ছাত্র ধর্ষক, বাকি চার ছাত্র তারে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। যারা পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে তারা সবাই ধর্ষক ছাত্রলীগ নেতার জুনিয়র ও হলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। একটি ছেলে যখন ধর্ষণ করেছে তখন তাকে আইনের কাছে  সোপর্দ না করে কেন তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করল! কারণ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। দেশে একটি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সংগঠনের ছাত্ররা নির্ভয়ে রাজনীতি করতে পারে না। আমারে শিক্ষার্থীদের এই মুহূর্তে চায়ের আলাপে শুধু অমুক ভাই, তমুক ভাই, ওর ম্যান, এর ম্যান, কমিটি দেবে, কমিটি নিবে এসব গল্প। যেকোনো উপায়ে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের যেকোনো একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের পদ-পদবির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে একটা প্রজন্ম। একটি পদ প্রাপ্তির জন্য সে তার সমস্ত মেধা, মনন ও চিন্তাকে বন্ধক রাখতে রাজি আছে। যে ছেলেগুলো আজকে ধর্ষককে পালাতে সাহায্য করেছে, তারা জুতাপেটা খেয়ে এখন রিমান্ডে আছে। তারা যখন ধর্ষককে পালাতে সাহায্য করেছে তখন তাদের চিন্তায় এটা কাজ করেনি যে তারা একটি অন্যায় করছে। কারণ যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন তৈরি করা হয়েছে সেখানে চিন্তার কোন জায়গা নেই। বড় ভাই বললে যেকোনো কিছু করতে তারা রাজি। 

ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ও অঙ্গ সংগঠনের পদ পাওয়ার জন্য কেন তারে এমন অন্ধত্ব! কারণ যে ছেলে একবার ছাত্রলীগের পদ পেয়েছে তার যেকোনো অন্যায়কে ডিফেন্স করার জন্য খোদ প্রক্টর ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাঁড়িয়ে যায়। প্রশাসনের এমন এক পাক্ষিক অন্যায় অবস্থান তাদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে। ক্ষমতার রাজনীতির এই নিরঙ্কুশ চর্চা পুরো একটি প্রজন্মকে বিপদগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। 

যৌনতা, কামনা, বাসনা খুবই স্বাভাবিক ও সাধারণ বিষয়। ধর্ষণের সঙ্গে যৌন প্রবৃত্তির কোন সম্পর্ক নেই। ধর্ষণের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষমতার। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধর্ষণকে নেওয়া হয়েছে ‘বেটাগিরি’ দেখানোর উপায় হিসাবে।  সমাজের মনস্তত্ত্বে এটা বিশ্বাস যে একজন মেয়ে ধর্ষণ করে তার জীবনকে থামিয়ে দেওয়া যায়, তার এবং তার পরিবারের মুখে চুলকানি মাখানো যায়। 

অতীতের ধর্ষণের ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ তাই বলে। ২০১৮ সালে নির্বাচনের পরে শুধুমাত্র ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় নোয়াখালীতে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় নিম্ন আদালত গতকাল ১৬ আসামির ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এ ঘটনার বিচার পেতে মাইলস টু গো, মানে আসামিরা নিশ্চই আপিল করবে, উচ্চ আদালতেরও নানান পর্যায় আছে...। ২০২০ সালে সিলেটে এমসি কলেজে ধর্ষণের সঙ্গেও ওই দলের নেতা-কর্মীই জড়িত। ক্ষমতার রাজনীতির আশীর্বাদ ছাড়া কোন ঘটনা ঘটানোর সাহস ধর্ষকেরা পেত না। সিলেটে এমসি কলেজে ধর্ষণকারীরা ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের কর্মী ও স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার কাঠামোতে ব্যাপক প্রভাবশালী। নোয়াখালীর ঘটনায় জড়িতরা সবাই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

২০২০ সালে করোনার মধ্যেই  নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ধর্ষণ চেষ্টার ভিডিও পুরো জাতি জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। নারীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও করার পর তাকে নানা কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়, তাতে রাজি না হওয়ায় ফেসবুকে ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ৩২ দিন পর ফেসবুকের মাধ্যমে তা জানা গেছে। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, ফেসবুকে ভিডিওটি প্রকাশ না হলে হয়তো কেউই জানতে পারত না- এই বর্বরোচিত ঘটনার কথা। হয়তো এভাবে আরও শত শত ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। 

দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার যে সংস্কৃতি দাঁড়িয়েছে তার চর্চা পরোক্ষভাবে ধর্ষণতন্ত্রকে লালন করছে। সিলেট ও নোয়াখালীর দুই ঘটনায় স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে কেড়ে নিয়ে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। জাহাঙ্গীরনগরেও স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়।  তাদের এই আগ্রাসনের খুঁটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও ক্ষমতার রাজনীতির আশীর্বাদ।

ধর্ষক ধর্ষক-ই। সে যেই হোক তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। কিন্ত তা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর দুর্নীতির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বব্যিালয় (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবিতে চলমান আন্দোলনে হামলা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে নারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হন। ওইদিন ছাত্রলীগের এমন কাজকে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে ঘোষণা করেন উপাচার্য। ছাত্রলীগের নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলাকে যখন উপাচার্য প্রশংসা করেন, সেখানে আজ ছাত্রলীগ গণধর্ষণ করতে কেন ভয় পাবে! 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জনির বিরুদ্ধে আসা যৌন হয়রানির তদন্ত নিয়ে লুকোচুরি করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জনি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। জনির যেদিন শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ হয় সেদিন রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের বাইরে ছাত্রলীগের আগ্রাসী শোডাউন ছিল। যে জনি এভাবে শিক্ষক হয়েছে, যে জনি নিজে একজন যৌন নিপীড়ক, তার ছাত্ররা কীভাবে সদগুণে বেড়ে উঠবে! 

ফলে আজকে যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার  বিচারের দাবিতে সোচ্চার হলেই হবে না। ধর্ষণ থামাতে চাইলে এর সঙ্গে যে ক্ষমতার কাঠামো জড়িত তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। ক্ষমতাসীন হলেই, ক্ষমতা কাঠামোতে আরোহণ করলেই যে কেউ যেকোন অন্যায় করতে পারবে না, তাকে জবাবদিহিতা ও বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে- তা নিশ্চিত করতে হবে। যে মাস্তান তন্ত্র বিশ্বব্যিালয়ে গড়ে উঠেছে উপাচার্য, প্রক্টর ও প্রভোস্টের প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষা মদতে তাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি রুখে দিতে হবে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধে ভাঙতে নিপীড়কদের ক্ষমতার কাঠামো। তবেই থামানো যাবে ধর্ষণতন্ত্র। 

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত