ডেঙ্গুতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেধাবী ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভাসছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের কাটাশকোল গ্রামের দিন মজুর আব্দুস সাত্তার মৃধা। মাত্র ১০ দিনের জ্বর তার সব স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। খেয়ে না খেয়ে যে ছেলেকে লেখাপড়া শেখাচ্ছিলেন, সেই ছেলের এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। গত সোমবার সন্ধ্যায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী মুরাদ হোসেন মৃধা মারা যান।
জানা যায়, গত ২৬ জানুয়ারি মুরাদ বাড়ি এসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে পাঁচ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও সুস্থ না হওয়ায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ডেঙ্গুর পাশাপাশি লিভার ও কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে তার। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে সহপাঠিরা তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেন।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে টিনের ছাপড়া এবং পাটকাঠি ও বনের বেড়ার তিনটি ঘর। উঠানে খাটিয়ায় শোয়ানো মুরাদের লাশ। খবর পেয়ে স্বজনসহ এলাকার লোকজন লাশটি দেখার জন্য ওই বাড়িতে আসছেন। ছেলে হারা বাবা—মায়ের বুক ফাটা কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। স্বজনরা তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন।
মুরাদের খালাতো ভাই আলমগীর কবিরাজ জানান, বাড়ির ভিটাসহ মাত্র বিঘা খানেক জমি আছে মুরাদের বাবার। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মুরাদের বাবা পেশায় দিনমজুর। তবে শীতকালে খেজুর গাছ লাগিয়ে গুড় তৈরি করে বিক্রি করে ছেলের লেখাপড়াসহ কোনো রকমে সংসার চলত।
মুরাদের বাবা আব্দুস সাত্তার মৃধা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমারতো সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো। ছাওয়ালও বইলতো, আব্বা আর কয়ডা দিন কষ্ট করো, আমি চাকরি পাইলে তোমারে আর এইসব কাজ করতে দিব না। তখন আর এতো কষ্ট করা লাইগবি না। কিন্তু আমার কষ্ট আর দূর হইলো না।’
মুরাদের প্রতিবেশী ফারুক হোসেন জানান, মাত্র এক মাস আগে গণিত বিভাগ থেকে অনার্স পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাশ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। সে খবর মোবাইলে বাড়িতে জানালে আনন্দে অভাবের মাঝেও তার বাবা মিষ্টি কিনে সবাইকে খাইয়েছিলেন। মুরাদের স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা বিসিএস দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হবার। বিসিএস দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেও শুরু করেছিলেন মুরাদ।
জোয়াড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আলী আকবর জানান, মঙ্গলবার সকাল ১১টায় নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় জানাযা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়েছে। দরিদ্র বাবার মেধাবী সন্তানের এমন করুণ মৃত্যু সত্যিই খুব কষ্টকর।
