বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সংস্কার শেষ হবে কবে

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:২০ এএম

সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা?- বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম পরিদর্শনে গিয়ে একটা পর্যায়ে নাজমুল হাসানকে দেখে এই প্রবাদ বাক্যটা মনে হলো। ৭০ বছরের প্রাচীন স্টেডিয়ামের যেখানেই তাকান নয়া ক্রীড়ামন্ত্রী, সেখানেই সমস্যা। নাহ, স্টেডিয়ামটি বয়স হয়েছে বলে সমস্যা-জর্জর হয়ে ওঠেনি। বারবার সংস্কারের নামে এর সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে সহসা এসব সমস্যা দূর করা খোদ মন্ত্রীর পক্ষেও অসম্ভব। ২০২১ সালে সেপ্টেম্বরে শুরু হয় এর সংস্কারকাজ। সরকার প্রথম প্রস্থে বরাদ্দ দিয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সংস্কার শেষে এই স্টেডিয়াম বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনকে। কিন্তু প্রথম প্রস্থের বরাদ্দে কুলিয়ে ওঠা যায়নি। একনেক নতুন করে আরও ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সংস্কার শেষ করার জন্য। সময় বেঁধে দেওয়া হয় এই বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে কাজের যে অগ্রগতি তাতে ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ পাওয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে পারবে বলে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আবার সংস্কারের নামে যে এখানে চরম অব্যবস্থাপনা হয়েছে সেটা মন্ত্রীর সামনেই প্রকাশ পেয়েছে এনএসসি ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদের মুখোমুখি অবস্থানে ও একাধিক বিষয় নিয়ে দোষারোপের খেলায়।

কাজ করার ক্ষেত্রে বাফুফের কাছ থেকে পাওয়া ফিফার নির্দেশনা যে তোয়াক্কা করেনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, সেটা প্রকাশ পায় মন্ত্রীর পরিদর্শনের সময়। এ নিয়ে সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ না করলেও বেশ কিছু বিষয় যে তার পছন্দ হয়নি সেটা বোঝা গেছে। বিশেষ করে মাঠ ভেজাতে সনাতনী ব্যবস্থা নিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বেঁধে দেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেটা সরেজমিনে দেখে বিস্মিত হয়েছেন খোদ মন্ত্রী। ফুটবল মাঠ ভেজাতে এনএসসি ব্যবহার করেছে হকির টার্ফের স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম। এটা কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক মানের শর্ত মেনে করা হয়নি। বাফুফে এই ভুলটা আগের মন্ত্রী থাকাকালে ধরিয়ে দিলেও এখনো এর পরিবর্তন করেনি ক্রীড়া পরিষদ।

মন্ত্রীর সঙ্গী হয়ে আসা ক্রীড়া সচিব ড. মহিউদ্দীন আহমেদ এই সমন্বয়হীনতার দায় বেশিরভাগ চাপিয়েছেন বাফুফের ওপর। তবে সেখানে উপস্থিত বাফুফের কর্তারা দায় অস্বীকার করে বারবার মাঠে সংস্কারের ক্ষেত্রে ফিফার নির্দেশনা না মানার বিষয়টি জাতীয় পরিষদকে অবহিত করার প্রমাণ স্বরূপ দিস্তায় দিস্তায় চিঠি মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বসতি আর্কিটেক্টের এক শীর্ষ কর্তা মাসুদুর রহমান নিজের পিঠ বাঁচাতে গা জোয়ারি ফিরিস্তি দিতে শুরু করেন। এই কর্মকর্তা দাবি করেন, পানি ছিটানোর যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা নাকি বিশ্বের বিভিন্ন ফুটবল মাঠে ব্যবহার করা হয়। আবার স্প্রিঙ্কলারের বর্ধিত অংশ রেখেই খেলা চালানো সম্ভব এমন দাবিও করেন তিনি। এ নিয়ে বাফুফের কর্তারা সরাসরি প্রতিবাদ জানান। মাঠে পানি ছিটানোর যন্ত্র নিয়ে বাফুফে আর এনএসসির তর্ক অনেকটা সময় চুপ করেই শুনেছেন মন্ত্রী। এ সময় সচিবও সরকারের হয়ে বাফুফের কর্তাদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন এবং তাদের দোষারোপ করতে থাকেন।

বর্তমান যুগে যেখানে মাঠ ফুঁড়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি দেওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সেখানে এনএসসি ব্যবহার করেছে সনাতনী প্রযুক্তি। আধুনিক পপ-আপ পদ্ধতি ব্যবহার না করে ক্রীড়া পরিষদ বসিয়েছে জল কামান। অথচ এমএ আজিজ স্টেডিয়াম, বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় বসানো হয়েছে পানি ছিটানোর আধুনিক প্রযুক্তি। মন্ত্রী দুপক্ষের বাগ্বিত-া শোনার পর একটা কথাই বলেছেন, ‘মাঠ দেখে যেটা বোঝা গেল স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম একটা সমস্যা। তবে আমার মনে হয়েছে এটা সহজেই সমাধান করা সম্ভব। আমি যদ্দুর জানি, এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করে স্টেডিয়াম বুঝিয়ে দেওয়ার একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা চাইব এই সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে। এর বেশি সময় যাতে না লাগে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।’

সনাতনী নকশায় বারবার প্রেসবক্স নির্মাণ করায় বসতি আর্কিটেক্টের প্রতিনিধি তোপের মুখে পড়েন সংবাদকর্মীদেরও। প্রেসবক্স নির্মাণের ক্ষেত্রে কখনো এনএসসি সংবাদ কর্মীদের মতামত নেয়নি। পিলার বসিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই স্তম্ভের কারণে সাংবাদিকদের মাঠের খেলা দেখা নিয়ে সমস্যার কথা জানানো হয় মন্ত্রীকে। প্রেসবক্সের সামনে স্তম্ভ দেখে নিজেও বিস্মিত পাপন।

মন্ত্রীর কাছে মিডিয়া বক্সের নানা অসংগতি তুলে ধরেন উপস্থিত সংবাদকর্মীরা। এক্ষেত্রে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও বাফুফে যে সবসময়ই উদাসীন সেটা তাকে জানানো হয়। বারবার ভেঙে মান্ধাতা আমলের নকশায় প্রেসবক্স তৈরি করা হয়েছে এবারও। মন্ত্রীও এতে বিস্মিত, ‘এই যে প্রেসবক্স নিয়ে এত কথা হচ্ছে, এই কথাটা আগেই মাথায়  আসা উচিত ছিল। আমারও মনে হয়েছে, এই ধরনের পিলার প্রেসবক্সের সামনে আমি সাধারণত কখনো দেখিনি। এই বিষয়গুলো কেন এলো না, সেটা আগে দেখতে হবে। এখন যদি পরিবর্তন করা সম্ভব হয় দেখব, সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে যেন এমনটা না হয় সেটা চেষ্টা করব। তবে পরিবর্তনের কথা বলে আরও এক-দুই বছর সময় বাড়ানো সম্ভব না।’

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে যে অনেক বাধা পেরুতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন মন্ত্রী। তাই যতটুকু কাজ বাকি সেটাই সময়ের মধ্যে করে দেওয়ার দিকে ঝোঁক দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বাফুফে ও অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের তুলে ধরা যে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানযোগ্য সেগুলো করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন পাপন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত