মৌলা বকস ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বরগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা। বয়স তার ৮১ বছর। এবার হজে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পাসপোর্ট রিনিউ করতে গিয়ে তিনি একবারে থ। তার বিস্ময়ের কারণ সার্ভারে এনআইডি নাম্বার দেওয়া হলে তাকে মৃত দেখানো হয়।
এরপর শুরু হয় তার দৌড়ঝাঁপ, ছুটে যান জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে। সেখানে তাকে মৃত ব্যক্তির ভোটার তালিকা থেকে জীবিত ব্যক্তির ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে বলা হয়। তিনি যে জীবিত সে ব্যাপারে তার এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সনদপত্র নিয়ে আসতেও বলা হয়।
মৌলা বকস বলেন, ‘পাসপোর্ট রিনিউয়ের জন্য ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়েছিল। যখন এনআইডি নাম্বারে ক্লিক করা হয় তখন আমাকে মৃত দেখানো হচ্ছিল। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছে, প্রতিবারই আমি যে মৃত সে কথাই বলা হচ্ছিল। পরে আমরা জেলা নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে যাই। সেখানে কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল। আমরা সবকিছুই ঠিকঠাক দিয়েছি। তারপরও কাগজপত্র ঠিক করতে ছয় মাসের বেশি সময় লেগেছে। জেলা নির্বাচন কার্যালয় সব কাগজপত্র ঠিক করে ঢাকায় পাঠিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এ সমস্যার জন্য আমাকে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে। এবার ওমরাহ করব বলে নিয়ত করেছিলাম। কিন্তু এনআইডিতে মৃত দেখানোর কারণে তা আর হয়নি। এ ছাড়া নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে আমাকে। আমি যে জীবিত তা প্রমাণ করতে এখন সনদ নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। আজকে নির্বাচন কমিশনে এসেছি। এখনই সমাধান হবে বলে মনে হয় না। কতদিন ঘুরতে হবে তাও জানি না।’
নির্বাচন কমিশনসংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিরা বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের কারণে জীবিত ব্যক্তির নাম মৃত ব্যক্তির তালিকায় চলে আসে। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন অফিসে এসে আবেদন করলেই আমরা তথ্য যাচাই করে সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিই।
শুধু মৌলা বকস নন, এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে অনেককে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগ নতুন এনআইডি তৈরি ও তথ্যগত ভুল সংশোধন করে। সংশোধনের জন্য কর্মকর্তারা নানারকম কাগজ চেয়ে থাকেন। সঠিক কাগজপত্র দাখিল করেও সংশোধন করতে হয়রান হতে হয় নাগরিকদের।
গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন অফিসের ইলেকটোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনের নিচে তথ্য কেন্দ্রে ভুক্তভোগীদের লম্বা লাইন দেখা গেছে। কেউ এসেছেন নামের বানান ঠিক করতে, কেউ এসেছেন বয়স ঠিক করতে। অনেকে আবার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে বিপত্তিতে রয়েছেন।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাসিন্দা অনিক দাস বলেন, ‘২০১৯ সালে আমি ভোটার হই। কিন্তু আমার ফিঙ্গার দেখানো হচ্ছে দুটি। এ সমস্যা নিয়ে চার বছর ধরে ঘুরছি। কোনো সমাধান হয়নি। জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে গেলে তারা বলে আপনার ফিঙ্গারের সঙ্গে অন্য কারোর ফিঙ্গারের মিল রয়েছে, আবার বলে দ্বিতীয়বার ভোটার হয়েছি। কিন্তু আমি তো একবারই ভোটার হয়েছি।’
তিনি জানান, এ সমস্যার জন্য চাকরিও হয় না। চাকরির ইন্টারভিউয়ে এনআইডি কার্ডের জন্য বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। নিরুপায় হয়ে নির্বাচন কমিশনে আসা।
এনআইডিতে বয়স জটিলতা নিয়ে আট বছর ধরে ঘুরছেন খুলনার বেবি আক্তার। তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালে আমি ভোটার হই। আমার বয়স দেখানো হয়েছে ৫০ বছর আর আমার মায়ের বয়স ৬০ বছর। এ সমস্যা সমাধানের জন্য কয়েকবার জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে গেলেও সমাধান হয়নি। বাধ্য হয়ে ঢাকায় এসেছি। তারা বলেছে আবেদন করতে। আবেদন করলেই যে সমাধান হয়ে যাবে তাও তো নয়। আমাদের মতো গরিব লোকের প্রতিদিন ঢাকায় আসা সম্ভব নয়। নির্বাচন অফিসের ভুলে আমার মতো হাজারো মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্যনুযায়ী দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি। প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার আবেদন পড়ে এনআইডি সংশোধনের জন্য। জাতীয় পরিচয়পত্র ও সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্ত (সংশোধন, যাচাই ও সরবরাহ) প্রবিধানমালা ২০১৪-এর প্রবিধি ২(৫) অনুযায়ী, এনআইডি সংশোধনের আবেদনের ক্ষেত্রে চারটি শ্রেণি (ক্যাটাগরি) করা হয়েছে। ‘ক’ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা-থানা নির্বাচন কর্মকর্তা, ‘খ’ ক্যাটাগরির আবেদনের জন্য জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, ‘গ’ ক্যাটাগরির আবেদনের জন্য আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির জন্য এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ ক্যাটাগরিতে প্রায়ই হয়রান হতে হয় এবং সবচেয়ে বেশি হয়রানি হয় ‘গ’ ও ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে। মাসের পর মাস আবেদন জমা পড়ে থাকে। আবেদনপ্রক্রিয়া ডিজিটাল হলেও নাগরিকরা এর সুফল পান না।
