জিআই নিয়ে গবেষণা অস্তিত্বের জন্য জরুরি

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:০৬ এএম

সম্প্রতি সংবাদ এবং সামাজিক মাধ্যমে টাঙ্গাইল শাড়ির ‘জিআই’ বা ‘জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেশন’ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নু। রসমালাই, জামদানি শাড়ির জিআই পাওয়ার ব্যাপারে তিনি গবেষণার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ

দেশ রূপান্তর : আমরা প্রথমেই সহজ ভাষায় জানতে চাইব, ‘জিআই’ বলতে কী বোঝায়? এর ধারণা কীভাবে আসে?

মাসউদ ইমরান মান্নু : জিআই বা জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেশনের বাংলা হচ্ছে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য। অর্থাৎ একটি পণ্যকে ভৌগোলিকভাবে চিহ্নিত হতে হবে। অর্থাৎ, সেটি কোন অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য। সেই পণ্যর সঙ্গে এলাকাটি জুড়ে দেওয়া। গত শতাব্দীর বিশের দশকে ইউরোপে প্রথম এর ভাবনা আসে কোনো একটি পণ্য বা সংস্কৃতির অথেনটিক বা বিশুদ্ধ অবস্থার সন্ধানে। কোনো একটি পণ্য বা সংস্কৃতি আসলে কোথা থেকে শুরু হয়েছিল এই উৎসমূলটা খুঁজে বের করতে পারলে, তাদের বিশুদ্ধ অবস্থা এবং পরবর্তী ক্রমবিকাশটা ধরা সহজ হয়। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তবে দেখতে পাব, প্রথম এটি নিয়ে একটা বৈশ্বিক বোঝাপড়া হয় ১৮৮৩ সালে। সে বছর প্যারিস কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোপার্টি বা প্যারিস কনভেনশন গ্রহণ করা হয়।

একেকটি পণ্য অনেক স্থানে উৎপাদিত হলেও, সংস্কৃতি অনেক জায়গায় উদযাপিত হলেও, মানুষ বোঝার চেষ্টা করে এদের আসল রূপ কোনটি? পণ্যের ব্যাপারে কপিরাইট বা স্বত্বের প্রশ্ন চলে আসে। কে এই অধিকার ভোগ করবে? আবিষ্কার বা ঐতিহ্যর অধিকার কার হবে? কীভাবে অন্যায্য প্রতিযোগিতা বন্ধ করা যাবে সেই কনভেনশন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে এই ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করে ডব্লিউআইপিও বা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন। এই প্রতিষ্ঠান যে কোনো পণ্যর জন্য কোনো দেশকে একক বা যৌথভাবে জিআই প্রদান করে।

দেশ রূপান্তর : জিআই কোনো পণ্যের ওপর একটি দেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। তার মানে কি এই যে, অন্য কোনো দেশ সেই পণ্য উৎপাদন করতে পারবে না? যেমন আমরা ইতিমধ্যেই রসগোল্লা ও নকশিকাঁথার মতো পণ্যের জিআই হারিয়েছি। আবার জামদানির জিআই পেয়েছি। তাহলে, আমরা কি রসগোল্লা বানাতে পারব না? বা অন্য দেশ জামদানি উৎপাদন করতে পারবে না?

মাসউদ ইমরান মান্নু : পারব, কিন্তু এর জন্য আমাদের কপিরাইট নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জিআই নেই মানে আমরা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস হারাচ্ছি। ইন্টেকলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটসের মধ্যে তিনটি ব্যাপার আমাদের দেশে জনপ্রিয়- ট্রেডমার্ক, কপিরাইটস আর পেটেন্ট। এর বাইরে আছে জিআই এবং ট্রেড সিক্রেট। ডব্লিউআইপিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০২৫ সাল থেকে এইসব ব্যাপার কড়াকড়িভাবে আরোপ করা হবে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে তা পিছিয়ে ২০৩০ সালে নেওয়া হয়েছে। আবার এই আইন মধ্য আয়ের দেশের জন্য যতটা কড়াকড়ি ততটা স্বল্প আয়ের দেশের জন্য নয়। যেহেতু আমরা নিজেদের ‘মধ্য আয়ের দেশ’ দাবি করছি, জিআইসহ অন্যান্য কপিরাইটের ব্যাপারে আমাদের কড়াকড়িভাবে আইন মানতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশের একজন সাধারণ ময়রা কীভাবে ২০৩০ সালের পর রসগোল্লা বানিয়ে বিক্রি করবেন? এরজন্য তাকে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনকে রাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যম। আবার রাষ্ট্রকে জিআইপ্রাপ্ত দেশ তথা ভারতের অনুমতি নিতে হবে। ভারতকে নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ প্রদান করে বা কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ রসগোল্লা বানাতে পারবে। আমরা ইদানীং বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় জাপানি খাবার ‘সুশি’ খেয়ে থাকি। ২০৩০ সালের পর থেকে এগুলো উৎপাদন ও বিক্রির জন্য জিআই পাওয়া দেশের অনুমতি লাগবে। তাদের অনুমোদিত রাঁধুনি থাকতে হবে। কপিরাইট থাকা সব পণ্যের জন্যই ব্যাপারটি কার্যকর হবে।

আমরা মধ্য আয়ের দেশ হওয়ায়, ২০৩০ সালের পর ওষুধ শিল্পে একটা বড়সড় ঝামেলায় পড়ব। এখন আমরা অন্য দেশের জিআই পণ্য উৎপাদন করে ওষুধ উৎপাদন করতে পারছি। তখন আর পারব না। এখানে আরও একটি ব্যাপার আছে। আমাদের দেশে ২০১৩ সালে যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে তা অসম্পূর্ণ আইন। এটিকে আমি অসম্পূর্ণ কেন বলছি? এটি টিআরআইপিএস এগ্রিমেন্ট ধরে হয়েছে। যখন প্রথম বৈশ্বিক আইন হয়, ১৮৮৩ সালে, তখন বাংলাদেশ বলে তো কোনো দেশ ছিল না। বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। ফলে বাংলাদেশ সেই আইনে যেতে পারবে না। মাদ্রিদ প্রটোকলের অংশ হবে না। বাংলাদেশের জন্মের পর এই সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন হচ্ছে, টিআরআইপিএস। টিআরআইপিসে একটা ব্যাপার হচ্ছে, জিআই। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, রিলেটেড রাইটস। এখানে কো-কালচারাল হেরিটেজ বলে একটা ব্যাপার আছে। মানে, দেখা গেল দুইটা দেশেরই একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতির ওপর অধিকার আছে। তখন, দেশের সরকারকে এই অধিকারের জন্য ডব্লিউ আইপিওর কাছে আবেদন করতে হবে। রসগোল্লার ব্যাপারটাই ধরা যাক। এর কো-কালচারাল হেরিটেজ তুলে ধরে রিলেটেড রাইটসের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ডব্লিউআইপিওর কাছে আবেদন করতে হবে। ব্যাপারটা পর্যালোচনা করবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। তারা যদি রায় দেয় যে, রসগোল্লার যে ঐতিহ্য তা কেবল ভারত বা ওপার বাংলার তাই নয়, বাংলাদেশের মানুষেরও, তবে আমরা রিলেটেড রাইটস অর্জন করব।

মুশকিল হচ্ছে, আমাদের নিজেদের আইনে রিলেটেড রাইটসের ব্যাপারটিই নেই। আমরা টিআরআইপিএসের এগ্রিমেন্টে সই করেছি ১৯৯৫ সালে। ঠিক একই বছর ভারতও এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। অথচ দুই দেশ এই নিয়ে পুরো উলটো আচরণ করল। ভারত পরের বছরই নিজেদের দেশে জিআই আইন প্রণয়ন করল, এই নিয়ে বিপুল গবেষণা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পণ্যে জিআই দাবি করতে লাগল। অন্যদিকে আমরা যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। আমাদের সরকার ব্যাপারটি বেমালুম ভুলে গেল। অবশেষে আমরা ২০১৩ সালে আইন প্রণয়ন করি আর এর প্রথম বাস্তবায়ন হয় ২০১৭ সালে। ততদিনে ভারত অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ভারত সেই সময়ের মধ্যে ১০৮টা পণ্যের ওপর জিআই অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলে।

দেশ রূপান্তর : তার মানে আমরা ইতিমধ্যেই অনেক পিছিয়ে পড়েছি। এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে বিপুল কর্মোদ্যোগ এবং গবেষণা না করলে ২০৩০-এর পর আমাদের অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক দিয়ে বড়সড় ঝামেলায় পড়তে হবে?

মাসউদ ইমরান মান্নু : হ্যাঁ। ঠিক তাই। শুধু রাষ্ট্র নয়, এখনো আমাদের বিজনেস স্কুলগুলো এই সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে না। আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এটি নিয়ে তেমন উদ্যাগ নিচ্ছে না। এরা কেউ ভাবছে না, ব্যাপারটা বড় বিজনেস হাব হতে পারে। আপনি হয়তো জানেন যে, অর্থনীতিতে একটা ধারণা আছে- রিভার্স ইকোনমি বলে। এই অনুসারে, গ্রামীণ এলাকা থেকে কাঁচামাল শহরে না এসে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি চলে আসছে আর গ্রামীণ এলাকায় পুঁজি চলে যাচ্ছে। এতে স্থানিক বিকাশ হচ্ছে। এই বাণিজ্যের একটা বড়সড় ব্যাপার হচ্ছে স্থানীয় ঐতিহ্য। কোনো পণ্যের সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্য যুক্ত হয়ে এর ভ্যালু বা মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগেই যেটা বলেছি, এই ধরনের পণ্যগুলো বাণিজ্যিকভাবেও বাড়তি সুবিধা পায় এই হেরিটেজ ভ্যালুর কারণে।

দেশ রূপান্তর : আমরা আধুনিক যুগে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে স্থানিক সুবিধার কথা বলি, অর্থাৎ কোনো একটা দেশে একটি নির্দিষ্ট পণ্য বানাতে পুরনো অবকাঠামো এবং দক্ষতা থাকায় সেই দেশটি বেশি বেশি করে সেই পণ্যটি বানায় এবং অন্য আরেকটি পণ্য অন্য যে দেশে উৎপাদিত হয় তাদের সঙ্গে লেনদেন করে। এই কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ তো হেরিটেজ বা স্থানিক পণ্যের বেলায় আরও জরুরি, তাই না?

মাসউদ ইমরান মান্নু : একদম। ধরেন টাঙ্গাইলের চমচম। আমরা জানি যে, প্রতিটি এলাকার পানিতে খনিজের মিশ্রণ ভিন্ন রকম হয়। টাঙ্গাইলের পানিতে খনিজের মিশ্রণ এবং ঢাকার পানিতে খনিজের মিশ্রণ এক হবে না। এর ফলে, আপনি যদি ঢাকার পানি দিয়ে চমচম বানান, তার স্বাদ টাঙ্গাইলের চমচমের মতো হবে না। ব্যাপারটি প্রায় প্রতিটি মিষ্টি বা খাদ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এসব কারণেই একেক এলাকায় একেক ধরনের খাবার বা পণ্য বিশেষায়িত হয়েছে। এই বিশেষায়ন পণ্যটিকে বাড়তি মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয় যা বাণিজ্যিকভাবে সুবিধা দেয়। এর বাইরে সাংস্কৃতিকভাবে একটি পণ্য বা অভ্যাসকে গ্রহণের চর্চার বিষয়টি আছে। যেমন ধরেন, নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের বাড়িতে ‘খোলাযায়ী পিঠা’ একটি ঐতিহ্য। যাদের বাবা-মা দুজনেরই বাড়ি নোয়াখালী, তাদের বাড়িতে এই খোলা থাকবেই। এই ঐতিহ্য তারা লালন করেন। অনুরূপভাবে বিক্রমপুরের মানুষ ‘বিবিখানা পিঠা’ বানান। এই সাংস্কৃতিক চর্চা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিআই অধিকার নিয়ে আমাদের সরকারি নীতি বেশ অদ্ভুত। পেটেন্ট এবং ট্রেডমার্ক এই দুটি ব্যাপার দেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অন্যদিকে কপিরাইটের বাকি জিনিসগুলো দেখভাল করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কীভাবে সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলোর মূল্য নির্ধারণ করতে পারবে?

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কুমিল্লার শিমুদ্দি গ্রামের কথা। এই গ্রামের মূল অর্থনৈতিক কাজ হচ্ছে, বাঁশের বাঁশি তৈরি করা। প্রায় পুরো গ্রাম এই কাজটি করে। ঢাকাসহ সারা দেশে যে বাঁশের বাঁশি পাওয়া যায় এর বড় অংশই ওই গ্রাম থেকে আসে। যোগাযোগ ও প্রযুক্তির উন্নয়নের এই সময়ে আমরা এই ঐতিহ্যটিকে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি? শুধু বাঁশির বিপণনই নয়, পর্যটকরা সেই গ্রামে যেতে পারেন। সেখানে গিয়ে নিজ চোখে বাঁশি তৈরির কার্যকলাপ দেখতে পারেন। এই বাঁশিগুলো তৈরির পেছনে ঐতিহাস ও দর্শন সম্বন্ধে জানতে পারেন। আমাদের দেশে এরকম অসংখ্যা সংস্কৃতি ছড়ানো আছে। আমরা সেগুলোর কতটা গুরুত্ব ও সংরক্ষণ করতে পারছি? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কি এর গুরুত্ব বুঝবে? এমনকি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েও তো এই নিয়ে কাজ করার মতো যথেষ্ট লোকবল বা উদ্যাগ নেই। এ ব্যাপারে যে গবেষণা প্রয়োজন তার উপলব্ধি নেই।

আরেকটা উদাহরণ দিই। নদী ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীকে দেখবে কেবলই পানির উৎস হিসেবে। কিন্তু, আমি নদীকে দেখি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আধার হিসেবে। এর উজানে এক রকম গান হয় আর ভাটিতে আরেক রকম। ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া গানের মধ্য দিয়ে মানুষের সম্পর্কের ব্যাপারগুলোও আলাদা হয়। আমাদের মহামান্য হাইকোর্ট কিন্তু রায় দিয়েছে, নদী একটি লিভিং এনটিটি বা জীবন্ত ব্যাপার। ব্যাপারটি তো এমনি এমনি হয়নি। নদীকে কেন্দ্র করে যে সাংস্কৃতিক আর পরিবেশগত বৈচিত্র্য, তা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই ভীষণ দরকারি। এই ব্যাপারগুলো বুঝতে আমাদের প্রচুর অ্যাকাডেমিক গবেষণা দরকার। মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য স্থানে এসব বোঝার মতো লোক থাকতে হবে। আমি একটা কোর্স পড়াই, যেখানে ছাত্রদের শুধু তাত্ত্বিকভাবে নয়, বরং এই জীবনযাপনের বাস্তবিক জায়গাগুলোর সঙ্গেও পরিচিত করিয়ে দেওয়া হয়।

দেশ রূপান্তর : আমরা আবার জিআইতে ফিরে আসি। আপনার কাছে শুনছিলাম, কীভাবে আমরা জামদানি শাড়ির জিআই লড়াইয়ে জিতেছিলাম। আপনি বলছিলেন এই উদাহরণ সামনের দিনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে থাকবে।

মাসউদ ইমরান মান্নু : ভারত জামদানি শাড়ির জিআই লাভ করে। কিন্তু এরপর আমাদের দেশের সংস্থা সিপিডি নিজের উদ্যোগ এই নিয়ে মামলা ঠুকে দেয়। আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হই যে, আমাদের ঢাকাইয়া জামদানি আর টাঙ্গাইলের জামদানির সঙ্গে ভারতীয় জামদানির তফাৎ আছে। জামদানি শাড়ি উলটো করে ফেললে সিংগেল সুতার কাজ দেখা যায়, কোথায় ছিঁড়ে না, গিঁট হয় না। এই বৈশিষ্ট্য কেবল ঢাকাইয়া জামদানিতেই আছে। এর জন্য দরকার হয় বিশেষ ধরনের তুলা। এর বুননের জন্যও দরকার বিশেষ পরিবেশ। এই ব্যাপারগুলো বিশদে প্রমাণ দেওয়ার পর আমরা জামদানির কপিরাইট ফেরত পাই। বাংলাদেশ পুরোপুরিভাবে জামদানির অধিকার পায় অন্যদিকে ভারতের থাকে কেবল ফুলিয়া জামদানি নামে বিশেষ পণ্যের।

নকশিকাঁথা নিয়েও আমরা একই ধরনের লড়াই করতে পারি। আলোচ্য টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি নিয়েও করতে হবে। আরেকটা বিপরীত উদাহরণ দিই বেনারসি শাড়ি। এর উৎসস্থল বেনারস হলেও, এর উৎকর্ষ হয়েছে আমাদের অঞ্চলে। বিপুল পরিমাণ বেনারসি শাড়ির তাঁতি এদেশে চলে এসে বিশেষ রকমের শাড়ির উন্নয়ন ঘটিয়েছেন যা আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গাঙ্গি অংশ হয়ে গেছে। এখানে যেটা বুঝতে হবে, তা হচ্ছে মোটিফ। আমাদের বেনারসির মোটিফ আলাদা। সামনের দিনে আমরা যদি জিআই এবং কপিরাইট নিয়ে লড়াই করতে চাই তবে আমাদের এইসব বিষয়ে বিশদে গবেষণা করতে হবে। প্রচুর গবেষক তৈরি করতে হবে। এসবের গুরুত্ব সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বুঝতে হবে। আমাদের দরকার সমন্বয়। স্থানীয় থেকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত।

দেশ রূপান্তর : এই গবেষণা তো আমাদের অন্য ক্ষেত্রেও সাহায্য করবে?

মাসউদ ইমরান মান্নু :  অবশ্যই। যেমন ধরেন, পুঁথি। আমাদের দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁথি একসময় ব্রিটিশরা নিয়ে গিয়ে তাদের জাদুঘরে রেখে দিয়েছে। সেগুলোর চর্চা হচ্ছে না। ব্যক্তি গবেষকের পক্ষে সেখানে গিয়ে কাজ করা সম্ভব না। আমরা এর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে ফেরত আনতে পারি।

আমাদের দেশে একসময় সাড়ে ৮ হাজার ধরনের চাল ছিল, কিন্তু এখন আমাদের আছে মাত্র চারটি চালের অধিকার। বাকিগুলো বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গেছে। তারা করেছে কি, এই চালগুলো নিয়ে কিছুটা মডিফাই করেছে। এরপর সেগুলো নিজেদের বলে দাবি করেছে। আমাদের গবেষকরাও এই কাজে সাহায্য করেছেন। আমাদের এখনো প্রচুর পণ্য নিজেদের বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।

এই কারণে আমাদের জন্য খুব জরুরি মহাফেজখানা তৈরি করা। ইউরোপ শত শত বছর ধরে এর সুবিধা পাচ্ছে। ওয়াইন নিয়ে, ভেড়ার মাংস নিয়ে, পনির নিয়ে ইউরোপের অঞ্চলে অঞ্চলে রেষারেষি আছে। এগুলোর অধিকার প্রতিষ্ঠা আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে এই নিয়ে প্রচুর কাজ করা বাকি। শুধু যে জেলায় জেলায় নানাপদের পণ্য নয়। আপনি দেখুন, আমাদের ঢাকাতেই কত রকমের ঐতিহ্য রয়েছে। বাখরখানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারপুত্র আগা বাখর আর বাইজি খানি বেগমের রোমান্টিক ট্র্যাজেডি। খানির থেকে দূরে রাখতে বাখরের পিতা তাকে পাঠিয়ে দেন সুদূর বরিশালে, যেখানে তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল দুরূহ। সেই দুর্ভাগা প্রেমিকের নামে নাম হয় বাকেরগঞ্জের। পুরান ঢাকার লোক বিকেল বেলা চায়ের সঙ্গে স্মৃতিমেদুরতা নিয়ে বাখরখানি খায়। এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ঢাকার বিউটি লাচ্ছি, শতবর্ষী আরও কিছু খাবার ঐতিহ্যের জরুরি অংশ। পশ্চিমারা এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে লালন করে। জার্মানরা ১৬ হাজারের বেশি পণ্য জিআই করে নিতে পেরেছে। ইউরোপের প্রতিটা শহরের পর্যটকরা বেড়াতে গিয়ে সেসব জায়গার চিহ্নবাহী পণ্য নিয়ে আসেন। শুধু কি তাই? আমরা এখনকার দিনে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের কথা বলি। স্থানিক জ্ঞান, যাতে কেবল ইতিহাসই নেই, আছে বিজ্ঞানও। কেন একটা এলাকার মানুষ শয়ে শয়ে বছর ধরে নির্দিষ্ট একটা পণ্য বানাত, সংস্কৃতির চর্চা করত। তাতে পানির ব্যবহার, মাটির ব্যবহার, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারত। এই প্রজ্ঞা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। জিআইকে কেন্দ্র করে আমরা যদি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বড়সড় গবেষণা শুরু করি, তবে শুধু অর্থনীতি ও ইতিহাস চর্চার জন্যই তা লাভজনক হবে না অস্তিত্বের জন্যও দরকার।

দেশ রূপান্তর : এই গবেষণায় দেশের মানুষ কীভাবে অংশ নিতে পারে?

মাসউদ ইমরান মান্নু : আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটা ফর্ম আছে। সেই ফর্মটি ডাউনলোড করে আপনারা আপনাদের নিজের এলাকার ঐতিহ্য নিয়ে বিশদে লিখতে পারেন। সরকারের পক্ষে দেশের কোনায় কোনায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। জনগণ যদি এই তথ্যগুলো দিতে পারে, তবে গবেষকরা সেই তথ্যভা-ার ব্যবহার করে এই বিপুল কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নিতে পারেন। যেমন, আমি বলতে পারি ঝালকাঠির দুর্গম অঞ্চলে, যেখানে ঘণ্টাতিনেকের নদীপথে যেতে হয় সেখানে শীতলপাটির একটি গ্রাম আছে। সেই গ্রামটির ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে সংরক্ষণের অভাবে। আমরা সবাই এইরকম বিভিন্ন এলাকার তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছে দিতে পারি।

দেশ রূপান্তর : শেষে কিছু বলবেন?

মাসউদ ইমরান মান্নু : শুধু জিআই নিলেই হবে না, একে সুরক্ষাও করতে হবে। যেমন ধরেন পদ্মার ইলিশ। এই ইলিশের স্বাদ অনন্য কেন? কারণ ইলিশ যেখানে পাওয়া যায় পদ্মার সেইসব স্থানে বিশেষ ধরনের শৈবালও পাওয়া যায়। কিন্তু, সম্প্রতি আমরা দেখছি পরিবেশ দূষণে বুড়িগঙ্গায় সাকার ফিশ বেড়ে গেছে। এগুলো অচিরেই পদ্মায় হানা দিয়ে শৈবাল ধংস করে ফেলবে। তখন আমাদের শুধু জিআইই থাকবে, ইলিশ আর থাকবে না।

পরিশেষে একটা কথা বলি। সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি সরকারের একার পক্ষে বিপুল গবেষণা করা সম্ভব না। অন্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সামনের দিনে আমাদের গভীর ও বিশদভাবে গবেষণা করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

মাসউদ ইমরান মান্নু : দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত