যারা এক আল্লাহকে রব হিসেবে স্বীকার এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) কে আল্লাহর বান্দা ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন তারাই মুমিন, তারাই মুসলমান। আর ইমানের সঙ্গে সঙ্গে নেক কাজ থাকলে সে প্রকৃত ও সফল মুমিন, সে জান্নাতি। প্রকৃত সফল মুমিনের পরিচয় স্বয়ং আল্লাহ কোরআন মাজিদে দিয়েছেন। সাত ধরনের গুণে গুণান্বিত মুমিনরা সফল। তারা জান্নাতে চিরকাল থাকবে।
১. যারা তাদের নামাজে বিনয়ী ও নম্র হয়। নামাজে বিনয় ও নম্রতা আনার মাধ্যম হলো আল্লাহকে হাজির-নাজির জানা। আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য সামনে রেখে নামাজ পড়া।
২. যারা অনর্থক-অহেতুক কথা, কাজ ও চিন্তা ভাবনা থেকে বিরত থাকে। সাহাবি হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) নবী কারিম (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! নাজাত (মুক্তি) কী? উত্তরে নবীজি (সা.) তিনটি কথা ইরশাদ করলেন
ক. তোমার ওপর তোমার জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কর। অর্থাৎ তোমার জিহ্বাকে অনর্থক ও বেহুদা কাজ থেকে বিরত রাখ। সুরা কাফের ১৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘বান্দা তার মুখ থেকে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছেই রয়েছে অতন্দ্র প্রহরী ফেরেশতা।’
কথাটি নেক হলে ডান কাঁধের ফেরেশতা, আর খারাপ হলে বাম কাঁধের ফেরেশতা লিপিবদ্ধ করে নেয়। বয়ানুল কোরআন
খ. তোমার ঘর যেন কষ্ট করে। আল্লামা তিবি (রহ.) বলেন, তোমার ঘর যেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে মশগুল থাকে, অহংকার মুক্ত থাকে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেছেন, আল্লাহতায়ালা তোমার জন্য যে স্ত্রী-সন্তান, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানসহ দুনিয়ার আসবাবপত্র বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাক এবং দ্বীনের বিষয়ে তোমার চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্নের দিকে তাকাও। আর দুনিয়ার বিষয়ে তোমার চেয়ে নিম্নশ্রেণির দিকে লক্ষ কর। যাতে আল্লাহর নেয়ামত তোমার কাছে তুচ্ছজ্ঞান না হয়।
গ. তোমার কৃত গোনাহের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হও। এ তিনটি কাজ করলে তুমি নাজাত পাবে। জামে তিরমিজি : ২৪০৬
৩. যারা জাকাত আদায় করে। পবিত্র কোরআনে বারবার বলা হয়েছে, তোমরা জাকাত আদায় কর। যারা জাকাত আদায় করে নিজের সম্পদ পবিত্র করে, তারা মুমিনের বিশেষ গুণে গুণান্বিত।
৪. যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে। হজরত সাহাল ইবনে সাআদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থান অপাত্রে ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব। সহিহ বোখারি : ৬৪৭৪
৫. যারা আমানত রক্ষা করে। আমানতে খেয়ানত করে না। সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও। আমানত দুই ধরনের হতে পারে। ক. গচ্ছিত সম্পদ, খ. অর্পিত দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ, অফিস-আদালত ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বও আমানত। সেই দায়িত্ব যথাযথ পালন না করলে খেয়ানত হবে। খেয়ানত পরিমাণ বেতন-ভাতা বৈধ হবে না। নবী মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দ্বীন ও শরিয়ত উম্মতের কাছে রেখে গেছেন তাও আমানত। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তির আমানতদারিতা নেই, তার ইমান পরিপূর্ণ নয়।’ মুসনাদে আহমাদ : ১২৫৬৭
৬. যারা ওয়াদা পূর্ণ করে। ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা মুমিনের অন্যতম গুণ। ওয়াদা রক্ষা না করা মুনাফিকের নিদর্শন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি ক. মুনাফিক যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে, খ. ওয়াদা করলে, তা রক্ষা করে না, ভঙ্গ করে ও গ. আমানত রাখলে, খেয়ানত করে। সহিহ বোখারি : ৬০৯৫
৭. যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হয়। নামাজ হলো ইমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী। ইমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নামাজ। হাশরের মাঠে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। সুতরাং নামাজের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া মুমিনের অন্যতম গুণ। নামাজের ব্যাপারে অলসতা ও শৈথিল্য প্রদর্শন মুনাফিকের কাজ।
হাদিসে নবী কারিম (সা.) অলসতা, অবহেলা করে আসরের নামাজ সূর্য ডুবার আগে আগে পড়াকে মুনাফিকের নামাজ আখ্যা দিয়েছেন। অতএব প্রকৃত মুমিন হতে হলে নামাজে যত্নবান হতে হবে।
উল্লিখিত গুণে যারা গুণান্বিত, তারাই জান্নাতের উত্তরাধিকারী। তারা ফেরদাউস জান্নাতের মালিক হবে। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সফল মুমিনের এ গুণগুলো পবিত্র কোরআনের সুরা মুমিনুনের প্রথম নয় আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অতএব মুমিন জীবনে সফলতা পেতে হলে গুণগুলো অর্জন করতে হবে। এসব গুণ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। যে এসব গুণ অর্জন করবে, তার জীবন বরকতময় হবে। কারণ আল্লাহতায়ালা কোরআন মাজিদের সুরা আরাফের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘এসব জনপদের অধিবাসীরা যদি ইমান আনত, তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, ইমান ও তাকওয়ার দ্বারা নানা প্রকারের বরকত লাভ হয়ে থাকে।