জ্ঞান মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে, বুদ্ধিকে আলোকিত করে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং সব ধরনের কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। জ্ঞান সমাজকে গড়ে তোলে এবং এর মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষ উপকৃত হয়। একজন মানুষ অন্য মানুষকে সর্বোত্তম যে উপহার দিতে পারে, তা হলো উপকারী জ্ঞান।
প্রত্যেক মানুষই অজ্ঞ অবস্থায় পৃথিবীতে আসে। এরপর মহান আল্লাহ তাকে জ্ঞান শিক্ষা দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা নাহল ৭৮)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক ১-৫)
একটি ছোট শিশু প্রথমে তার বাবা-মা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে। ধীরে ধীরে সে জ্ঞান অর্জন করতে থাকে। একই সঙ্গে সে তার সামনে থাকা আদর্শ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে। সে যা শেখে, তা অনুযায়ী আমল করে এবং তার সামনে যে আদর্শ দেখে, সেই আদর্শ অনুসরণ করে। কারণ ছোট শিশুর মধ্যে ভালো-মন্দের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ বিচার ও গভীরভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা থাকে না।
যেহেতু বিষয়টি এমন, তাই সন্তানদের ব্যাপারে বাবা-মায়ের ওপর রয়েছে বড় একটি আমানত এবং তাদের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দায়িত্ব অত্যন্ত মহান। এরপর আসে শিক্ষকের আমানত এবং বিদ্যালয়ের দায়িত্ব। শিক্ষা ও আদর্শের মাধ্যমে শিক্ষক ও বিদ্যালয় শিশুকে গড়ে তোলে।
এভাবে একজন শিশু উপকারী জ্ঞান অর্জন করে এবং সেই জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ ও সৎকর্মের আদর্শও দেখতে পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (সহিহ বুখারি)
শিশুর জীবনের প্রাথমিক পর্যায়গুলোতে তাকে ইসলামের এমন মৌলিক বিষয়গুলো শিক্ষা দিতে হবে, যেগুলো তার জন্য জানা অপরিহার্য এবং যেগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা কারও জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়। তাকে উত্তম চরিত্র ও মহৎ গুণাবলির ওপর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য তাদের শাসন করো। আর তাদের শয্যা পৃথক করে দাও।’ (সুনান আবু দাউদ)
শৈশব থেকেই যে ব্যক্তি নামাজ ও উত্তম চরিত্রের ওপর অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তার জন্য সঠিক পথে অবিচল থাকা সহজ হয়। পক্ষান্তরে উপকারী ও সৎভাবে সন্তানকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবহেলা করলে পরবর্তী সময়ে যা হারিয়ে গেছে তা পূরণ করা এবং যা ভেঙে গেছে তা মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এভাবে একজন শিশুকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন সে সমাজের নির্মাণে একটি কল্যাণকর ইট হয়ে ওঠে। সে যেন উপকার করে, ক্ষতি না করে। সে যেন সংস্কার করে, বিপর্যয় সৃষ্টি না করে। তার কল্যাণ যেন বৃদ্ধি পায়।
এরপর প্রত্যেক শিশু তার মেধা, প্রতিভা ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চতর শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের পথ বেছে নেবে, যাতে প্রত্যেকে সমাজের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
সমাজের প্রয়োজন রয়েছে শরিয়াহবিষয়ক জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পূর্ণতা ও বিশেষায়নের। একইভাবে আরবি ভাষার বিভিন্ন শাখা ও আরবি ভাষাসংক্রান্ত জ্ঞানেও বিশেষায়নের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ইসলামি শরিয়াহ বোঝার জন্য আরবি ভাষা অপরিহার্য। আর ইসলামি শরিয়াহ হলো মুসলিম উম্মাহর ভিত্তি। শরিয়াহ ছাড়া উম্মাহ পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
একইভাবে উম্মাহর দায়িত্ব হলো, তাদের সন্তান ও তরুণদের এমন সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা, যেগুলোর প্রয়োজন সমাজের রয়েছে। মানুষের পার্থিব জীবনের প্রয়োজন পূরণের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি, শিল্প, প্রকৌশল, নগরায়ণ, অর্থনীতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সমাজবিজ্ঞান, সামরিক বিজ্ঞান এবং মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে থাকা উপকারী জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম সবচেয়ে উঁচু হবে, তার ওপর কেউ উঁচু হতে পারবে না।’ (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি)
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না। তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৯)
রাষ্ট্রের ওপর এমন কিছু দায়িত্ব ও কাজ রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে সংশোধন, সংস্কার ও কল্যাণ সাধিত হয়। সমাজের ওপরও এমন কিছু দায়িত্ব রয়েছে, যা সমাজকেই পালন করতে হয়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং যতটুকু করতে সক্ষম, ততটুকু সমাজের কল্যাণে কাজ করবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)
হে শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা! আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হোন। প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার ওপর অর্পিত আমানতের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
হে বাবা-মায়েরা! আপনারা তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত করুন। তাদের এমনভাবে গড়ে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করুন, যাতে তারা নিজেদের সমাজকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করতে পারে, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, মুসলমানদের দ্বীনের ক্ষেত্রে উপকারে আসে, তাদের পার্থিব জীবনেও উপকার করে এবং তাদের জীবিকা ও জীবনযাপনের প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি ভবনের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহিহ বুখারি)
ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা কাজ করো। আল্লাহ, তার রাসুল এবং মুমিনরা তোমাদের কাজ দেখবেন। এরপর তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সবকিছুর জ্ঞানীর কাছে। তখন তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন, তোমরা কী কাজ করতে।’ (সুরা তওবা ১০৫)
হে আল্লাহর বান্দারা! নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন। তার জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। তিনি আমাদের পিতা আদম (আ.)-এর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন। ফেরেশতাদের শিক্ষা দেওয়ার আগেই তিনি তাকে সবকিছুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ এ সিদ্ধান্ত ও তকদির নির্ধারণ করেছিলেন যে, মানুষের কর্মের আগে জ্ঞান থাকবে, যাতে মানুষ তার দ্বীন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে এবং নিজের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে।
প্রত্যেক জ্ঞানের সূচনা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তার পরিণতিও আল্লাহর দিকেই। উপকারী জ্ঞান ও সৎকর্মের মাধ্যমে মুমিনদের মর্যাদায় পার্থক্য সৃষ্টি হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত।’ (সুরা মুজাদালাহ ১১)
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তাদের জন্য কী কী হালাল করা হয়েছে। বলো, তোমাদের জন্য সব পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে। আর শিকারি প্রাণীদের মধ্যে যেগুলোকে তোমরা প্রশিক্ষিত করো, আল্লাহ তোমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা দিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দাও। তারা তোমাদের জন্য যা ধরে আনে, তা থেকে খাও এবং তার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা মায়েদা ৪)
শরিয়াহভিত্তিক জ্ঞানই সর্বোত্তম জ্ঞান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীরা কোনো দিনার বা দিরহাম উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাননি। বরং তারা জ্ঞানকে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করেছে, সে বিপুল অংশ গ্রহণ করেছে।’ (সুনান আবু দাউদ)
মানুষের পার্থিব জীবনের প্রয়োজন পূরণের জন্য অন্যান্য যেসব জাগতিক জ্ঞান প্রয়োজন, মর্যাদার দিক থেকে সেগুলো শরিয়াহভিত্তিক জ্ঞানের পরবর্তী স্তরে রয়েছে। কারণ পার্থিব জ্ঞানের প্রয়োজন পার্থিব জীবনের প্রয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে শরিয়াহভিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনেই রয়েছে।
মুমিনের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের একটি দিক হলো, কোনো ব্যক্তি যদি পার্থিব জ্ঞান অর্জন করে তা নিজের এবং মানুষের উপকারে ব্যবহার করতে চায় এবং এই জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সওয়াব লাভের নিয়ত করে, তাহলে মহান আল্লাহ তার এই জ্ঞানের জন্যও সওয়াব ও প্রতিদান লিখে দেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।’ (সহিহ বুখারি)
সুতরাং একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, সে যেন তার কাজ সুন্দর ও উত্তমভাবে সম্পাদন করে। কাজকে সুন্দরভাবে সম্পাদনের পাশাপাশি সে যেন আল্লাহ সম্পর্কে উত্তম ধারণা পোষণ করে।
২৮ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন আইনাল হক