বর্তমানে আত্মহত্যা নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। দিন যত যাচ্ছে, মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম কিংবা আশপাশের মানুষের কাছ থেকে আমরা এমন অনেক ঘটনার কথা শুনি, যেখানে কেউ জীবনের কাছে হার মেনে নিজেকেই শেষ করে দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, আত্মহত্যার পর কি সত্যিই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? নাকি তখনই শুরু হয় আরও ভয়াবহ এক বাস্তবতা? বিষয়টি ইসলামের আলোকে ব্যাখ্যা করা যাক।
বর্তমানে অনেক মানুষের মনে একটি ভুল ধারণা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। তারা মনে করে, ‘জীবন শেষ হয়ে গেলেই বুঝি সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে। আমি না থাকলে সমস্যাগুলোও আর থাকবে না। পৃথিবী, মানুষ, ব্যর্থতা, অপমান, হতাশা-সবকিছু থেকে মুক্তি মিলবে।’
কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এত সহজ? কেউ যদি একটি বইয়ের মাঝখানে এসে শেষ পাতাটি ছিঁড়ে ফেলে, তাহলে কি গল্প শেষ হয়ে যায়? নাকি গল্পের স্বাভাবিক সমাপ্তির আগেই সে নিজেকে সত্য জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে? ঠিক তেমনই, মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়। বিশেষ করে আত্মহত্যা কখনোই সমস্যার সমাধান নয়।
প্রথমত, মহান আল্লাহ আত্মহত্যাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু। আর যে ওই কাজ করবে সীমালঙ্ঘন ও অন্যায়ভাবে, আমি অচিরেই তাকে আগুনে প্রবেশ করাব। আর সেটি হবে আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ (সুরা নিসা ২৯-৩০)
আয়াতটির দিকে গভীরভাবে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, মহান আল্লাহ প্রথমে তার দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তারপর আত্মহত্যার শাস্তির কথা বলে সতর্ক করেছেন। অর্থাৎ যে মানুষটি মনে করছে তার আর কোনো আশ্রয় নেই, সে হয়তো ভুলে যাচ্ছে, তার রব এখনো তার প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।
আত্মহত্যা এমন এক কাজ, যাকে ইসলাম গুরুতর কবিরা গুনাহ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মহত্যার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে একইভাবে ওপর থেকে নিচে পড়তে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সেই বিষ তার হাতেই থাকবে এবং সে তা পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সেই অস্ত্র তার হাতেই থাকবে এবং সে তা দিয়ে নিজেকে আঘাত করতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি ৫৭৭৮)
তাহলে যে মানুষ পৃথিবীর সাময়িক কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য নিজের জীবন শেষ করে দিল, সে কি সত্যিই মুক্তি পেল? নাকি সে আরও কঠিন এক জবাবদিহির দিকে এগিয়ে গেল?
এবার আসি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। অনেকেই মনে করেন, মৃত্যু মানেই সব অনুভূতির সমাপ্তি। মৃত্যু মানেই নিস্তব্ধতা। মৃত্যু মানেই আর কিছু না থাকা। কিন্তু ইসলাম আমাদের ভিন্ন একটি বাস্তবতার কথা জানায়। যখন মানুষের জান কবজ করা হয়, তখন তার রুহ বরজখের জগতে (ইহকাল ও পরকালের মধ্যবর্তী একটি অন্তর্বর্তী পর্যায়) অবস্থান করে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও মানুষের যাত্রা থেমে যায় না।
একজন পাপী মানুষও তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি সেই সুযোগটুকু নিজের হাতেই শেষ করে দেয়। সে পাপের কাজ করতে করতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।
প্রশ্ন হয়, তাহলে আত্মহত্যা করে আসলে কী লাভ হলো? কষ্ট কি কমল? নাকি কষ্টের নতুন একটি অধ্যায় শুরু হলো? অনুভূতিগুলো কি শেষ হয়ে গেল? নাকি আরও গভীর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো? তাহলে মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? কেন সাময়িক কষ্টকে চিরস্থায়ী বাস্তবতার চেয়েও বড় মনে করে? কেন মানুষ সিজদায় মাথা রেখে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরিবর্তে মৃত্যুকেই মুক্তির পথ মনে করে?
লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়