দৃষ্টিহীন শওকত স্যার বিলিয়ে চলেছেন শিক্ষার আলো

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০৫ পিএম

শওকত আলী। গণিতের গৃহশিক্ষক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে চোখের আলো নেই প্রায় ২০ বছর, তবুও বিলিয়ে যাচ্ছেন জ্ঞানের আলো। বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন কয়েকশ শিক্ষার্থীকে পথের দিশা দেওয়া এই মানুষ গড়ার কারিগর।

বলছিলাম ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌর সদরের ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রাইভেট শিক্ষক মো. শওকত আলীর কথা। এলাকায় যাকে সবাই 'লোকাল শওকত স্যার' হিসেবে চেনে।

২০০৫ সালে হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি হরিয়ে ফেলেন তিনি। চোখের রোটিনার নার্ভ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়ায় অন্ধত্ব বরণ করেন। বাংলাদেশ ও ভারতে চিকিৎসার পরও ফিরে পাননি স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি। উপরন্তু প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের যা সঞ্চয় ছিল তার সবটাই খুইয়েছেন। অর্থের অভাব থাকা সত্ত্বেও আত্মমর্যাদাবোধ প্রগাঢ়ভাবে বাধা দিয়েছে তাকে কারও কাছে হাত পাততে। সুচিকিৎসার অভাবে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছেন।

কিন্তু থেমে নেই তার জ্ঞান ছড়ানোর ব্রত। অন্ধত্ব নিয়ে এখনও পড়ান তিনি। ব্লাকবোর্ডে কষে যান গণিতের জটিল জটিল সমাধান।

গত শতকের আশির দশকে মাগুরা থেকে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে আসেন তিনি। এখানে তার এক আত্মীয়ের স্কুল পড়ুয়া এক দুর্বল শিক্ষার্থীকে পড়ানোর দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। তার তত্ত্বাবধানে ওই শিক্ষার্থী কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। এরপর ১৯৮৬ তে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ান। পরীক্ষায় প্রত্যেকে ভালো ফলাফল করলে ভালো শিক্ষক হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতা। এরপর থেকে প্রতিবছর মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এসএসসিতে অকৃতকার্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের ভিড় জমতে থাকত। দুর্বল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিকটও ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ান শওকত আলী। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নিজ ভাড়া বাসায় গড়ে তোলেন আবাসিক কোচিং সেন্টার।

আবাসিক-অনাবাসিক মিলে কোনো কোনো বছর একশ থেকে দেড়শ শিক্ষার্থীকে ব্যাচে পাড়াতেন তিনি। শিক্ষার্থীদের ভিড়ে একসময় গোসল, খাওয়ার সময়ও পেতেন না। কিন্তু অন্ধত্ব বরণের পর থেকে ধীরে ধীরে কমে আসে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা। বর্তমানে ৮/১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়িয়ে বাসাভাড়া দিয়ে বেশ কষ্টে স্ত্রীকে নিয়ে দিনাতিপাত করছেন। ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে এ শিক্ষকের। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে কয়েকবছর। ছেলেও বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকায় থাকেন।

চোখের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চিত টাকার সবটাই শেষ হয়ে গেছে। ভালো চিকিৎসা করা গেলে হয়তো আবার চোখের আলো ফিরে আসত। কিন্তু অর্থাভাবে সেটি সম্ভব হয়নি। ধীরে ধীরে চোখের রেটিনার নার্ভ শুকিয়ে এখন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তিহীন তিনি।

শওকত আলী বলেন, 'শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিজের বা সংসারের কথা চিন্তা করিনি। কয়েকশ গরিব ছেলে-মেয়েকে বিনা বেতনে পড়িয়েছি। এসএসসিতে ফর্ম ফিলআপ করতে অপারগ ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের টাকা দিয়ে ফর্ম ফিলআপ করতে সহযোগিতা করেছি। এখন নিজেই চলতে পারি না। সত্যি বলতে কী ভীষণ কষ্টে আছি।'

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত