সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাংলায় বিশ্বসংগীতের গল্প

অ্যাবট ব্রাদার্স নেই তবু জেগে আছে ‘এই প্রেম’

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:০৬ পিএম

প্রয়াত হয়েছেন দুজনই। ছোটজন আগে, বড়জন পরে। অথচ টিকে আছে তাদের গড়ে যাওয়া 'পাওয়ার মেটাল' সুপার গ্রুপ 'প্যানটেরা'। শুধু টিকেই নেই, দিব্যি রাজত্ব করে যাচ্ছে মেটাল দুনিয়ায়।

ড্যারেল ল্যান্স অ্যাবটকে দিয়েই শুরু করা যাক। তাকে সবাই চেনে 'ডিমবাগ ড্যারেল' নামে, এটা তার স্টেজ নাম। অনবদ্য গিটার বাজাতেন তিনি। শীর্ষ প্রায় সব র‌্যাংকিংই তাকে পৃথিবীর শত মেটাল গিটারিস্টের তালিকায় এক-দুই বা তিনে রাখা হয়।

কেউ কেউ মার্টি প্রিডম্যান, স্টিভ ভেই, অ্যাঙ্গাস ইয়ং, কার্ক হ্যামেট, জন পেট্রুচি, ডেভ মাস্টেইন, স্ল্যাশ কিংবা রিচি ব্ল্যাকমোরের চেয়েও বড় মেটাল গিটারিস্ট মনে করেন তাকে। তবে তারা টনি লুমি, স্যার জিমি পেইজ বা এডি ভ্যান হ্যালেনকে অবশ্য তার ওপরেই রেখেছেন।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভাই ভিনি পল (ভিনসেন্ট পল অ্যাবট)-কে নিয়ে 'প্যানটেরা' গঠন করেন তিনি। দুবছর পরই আসে তাদের প্রথম অ্যালবাম 'মেটাল ম্যাজিক', সাড়া ফেলতে ব্যর্থ হয়। শুধু প্রথমটিই নয়- পর পর তিনটি অ্যালবাম (মেটাল ম্যাজিক, প্রজেক্টস ইন দ্য জঙ্গল এবং আই অ্যাম দ্য নাইট) জাস্ট ব্যর্থ হয়। এবার ভোকাল খুঁজতে নামে প্যানটেরা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা মেলে ফিলিপ হ্যানসেন অ্যানসেলমো বা ফিল অ্যানসেলমোর। 'ওয়ান অব দ্য গ্রেটেস্ট ফ্রন্টম্যান অব মেটাল হিস্ট্রি' ফিল অ্যানসেলমোকে নিয়ে শুরু হয় প্যানটেরার নতুন যাত্রা। সাথে থাকলেন 'বেস দানব' রেক্স ব্রাউন আর পৃথিবীর শীর্ষ মেটাল ড্রামারদের একজন- ভিনি পল।

১৯৮৮ সমালে এল প্যানটেরার চতুর্থ স্টুডিও অ্যালবাম 'পাওয়ার মেটাল'। আলোচনার জন্ম দিল। ভক্ত অনুরাগী জুটল অনেক। মানুষ তাদের থ্র্যাশ মেটালের সেকেন্ড ওয়েভের অন্যতম ব্যান্ড হিসেবে ভাবতে শুরু করল (তাদের সঙ্গী ছিল টেস্টামেন্ট, সেপালচুরা এবং মেশিন হেডের মতো ব্যান্ডগুলো)।

নব্বইয়ে ঘটল বিস্ফোরণ। গ্ল্যাম মেটাল জনরা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্যানটেরা নিজেদের বদলে চলে এল গ্রুভে। এবছরই প্রকাশ হলো তাদের জাত চিনিয়ে দেওয়া অ্যালবাম 'কাউবয়েজ ফ্রম হেল'। থ্যাশ মেটাল দানব হিসেব আবির্ভূত হলেন নরকের রাখাল বালকেরা, সাথে তাদের ব্যান্ড প্যানটেরা। ব্যান্ডটির অন্যতম সমাদৃত অ্যালবাম হিসেবে ধরা হয় কাউবয়েজ ফ্রম হেলকে। তবে সংগীতবোদ্ধারা বলেন- এই অ্যালবামটি প্যানটেরার পূর্বাপর সব অ্যালবামের চেয়ে সেরা। 

১৯৯২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্যানটেরা প্রকাশ করে তাদের ষষ্ঠ অ্যালবাম 'ভালগার ডিসপ্লে অব পাওয়ার'। ডাবল প্লাটিনাম পাওয়া এই অ্যালবামটি একই সাথে সমালোচক ও ভক্তদের মন কাড়ে। প্যানটেরার সর্বাধিক বিক্রি হওয়া এই আ্যালবামটি নব্বই দশকের অন্যতম ইনফ্লুয়েন্সিয়াল অ্যালবাম হিসেবে চিহ্নিত। রোলিং স্টোনস বলছে- অ্যালবামটি সর্বকালের সেরা শত মেটাল অ্যালবামের মধ্যে দশ নম্বরে রয়েছে। অ্যালবামের মাইথ অব ওয়ার, আ নিউজ লেভেল, ওয়াক, ফাকিং হস্টাইল, লিভ ইন আ হোল বা দিস লাভ গানগুলো ভীষণ জনপ্রিয়তা পায় ও চার্ট হিট করে।

এর পর শুধু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা। তবে ধীরে ধীরে কমে আসে তাদের ধ্বংসাত্মক সাউন্ড সৃষ্টির চেষ্টা। ১৯৯৪, ১৯৯৬ এবং ২০০০ সালে আরও তিনটি অ্যালবাম আসে তাদের। তবে সমালোচকরা এই তিন অ্যালবামকে শুধু তাদের এর আগের দুটি অ্যালবামের জাবর কাটা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তবে অনেকেই বলে- পরের অ্যালবামগুলোতে আরও অনেক বেশি সমদ্ধ হয়েছে প্যানটেরা।

তবে যে যাই বলুক, প্যানটেরা মূলত তাদের শক্তিসমত্তা আর সামর্থের স্ফূরণ দেখিয়েছে স্টেশ শোগুলোতে। সেখানে তারা একেকজন একেকটি দানবরূপে আবির্ভূত হতেন। অ্যাবট ব্রাদার্স, ফিল বা রেক্স যেন নিজেদের উজাড় করে দিতেন স্টেজে। নব্বই দশকে স্টেজে সর্বাধিক পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ব্যান্ডগুলোর অন্যতম ছিল প্যানটেরা।

ডিমবাগের ড্যামেজপ্ল্যান যাত্রা এবং মৃত্যু
যারা ইতিহাস জানেন তারা অবগত ২০০৩ সালের নভেম্বরে নানা কারণে ডিসব্যান্ডেড হয় প্যানটেরা। ওই বছরই ভাই ভিনি পল, প্যাট্রিক লচম্যান (ভোকাল) ও বব জিলাকে (বেজ) নিয়ে 'ড্যামেজপ্ল্যান' গঠন করেন ডিমবাগ ড্যারেল। ২০০৪ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রথম ও শেষ অ্যালবাম 'নিউ ফাউন্ড পাওয়ার' বাজারে আসে।

০৮ ডিসেম্বর, ২০০৪। যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যের কলম্বাসের অলরোসা ভিলা নাইটক্লাবে শো ছিল ড্যামেজপ্ল্যানের। শো শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর ব্যান্ডটির এক ভক্ত সাবেক মেরিন নাথান গেল উঠে এলেন স্টেজে। তার হাতে ছিল নাইন এমএম বেরেটা অটোমেটিক। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি গিটারিস্ট ডিমবাগ ড্যারেলের মাথায় পর পর পাঁচবার গুলি করেন এবং সেসময়ই ড্যারেলের মৃত্যু হয়। এর পর ওই ব্যক্তি একে একে হত্যা করেন উপস্থিত ভক্ত নাথান ব্রে (২৩), নাইটক্লাবটির কর্মী এরিন হাল্ক (২৯) এবং প্যানটেরার নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেফ থমসনকে (৪০)। এঘটনায় আরও আহত হন প্যানটেরা এবং ড্যামেজপ্ল্যানের ড্রাম টেকনিশিয়ান জন ব্রুকস এবং ড্যামেজপ্ল্যানের ট্যুর ম্যানেজার ক্রিস পালুসকা।

এর পর ওই ব্যক্তি যখন আরেকজনের দিকে অস্ত্র তাক করেন তখন তাকে গুলি করে হত্যা করে কলম্বাস পুলিশ কর্মকর্তা জেমস নিগিমেয়ার। এঘটনায় নিজের জীবন দিয়ে ড্যামেজপ্ল্যানের অন্য সদস্যদের জীবন বাঁচান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেফ।

তবে কী কারণে তিনি ওই বর্বর হত্যাকাণ্ড চালান নাথান গেল তা আজও স্পষ্ট নয়। ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে মেটাল দুনিয়ার। আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল ডিমবাম ড্যারেলের।

ভিনি পলের মৃত্যু
ডিমবাগ ড্যারেলের মৃতুর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে 'ড্যামেজপ্ল্যান' অধ্যায়ের। এর পর প্রায় ১৪ বছর অ্যাকটিভ ছিলেন ভাই ভিনসেন্ট পল অ্যাবট বা ভিনি পল। ২০১৮ সালের ২২ জুন ৫৪ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের এক জটিল রোগে পরপারে যাত্রা করেন ভিনি পল।

প্যানটেরাকে ধরা হয় পৃথিবীর হেভি মেটাল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল এবং প্রভাবশালী ব্যান্ড হিসেবে। পৃথিবীজুড়ে তাদের অ্যালবাম বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২০ মিলিয়ন, যা একটি হেভি মেটাল ব্যান্ডের জন্য প্রায় অবিশ্বাস্য সংখ্যা। সেই সাথে তাদের রয়েছে চারটি গ্র্যামি নমিনেশন। মেটালের সব জনরাই বাজিয়েছে প্যানটেরা। অনেক জনরার জন্ম প্যানটেরার হাত ধরে। তাদের বলা হয় 'পাইওনিয়ার অব দ্য নিউজ ওয়েভ অব অ্যামেরিকান হেভি মেটাল'। প্যানটেরা যাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে তাদের তালিকা ছোট হলেও প্যানটেরা কর্তৃক অনুপ্রাণিত ব্যান্ডের সংখ্যা অগুনতি। তবে তাদের মধ্যে স্লিপনট, মেশিন হেড, বুলেট ফর মাই ভ্যালেন্টাইন, চিলড্রেন অব বডম, ল্যাম্ব অব গড অন্যতম।

এখনও সজাগ প্যানটেরা। অ্যাবট ব্রাদার্স নেই তবুও নিয়মিত শো করে যাচ্ছেন ফিল অ্যানসেলমো, রেক্স ব্রাউনকে নিয়ে। তবে এ ছাড়া আর কোনো নিয়মিত সদস্য নেই তাদের দলে। শো বরার সময় যুক্ত হন জ্যাক উইল্ডি (গিটার) এবং চার্লি বেনান্টে (ড্রামস)।

গানের গল্প
'দিস লাভ' মূলত একটি পাওয়ার ব্যালাড। এটি প্যানটেরার ষষ্ঠ এবং সর্বাধিক বিক্রিত স্টুডিও অ্যালবাম 'ভালগার ডিসপ্লে অব পাওয়ার'-এর একটি গান।

ব্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় এই গানটি সম্পর্কে ড্রামার ভিনি পল বলেছিলেন, এটা আমাদের ভোকাল ফিল-এর প্রেমের গল্প। তিনি একসময় একজনের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন। এবং তিনি সেই সম্পর্কে ভীষণভাবে জড়িয়েছিলেন। এই গান সেই সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।

গানটির একটি অর্থবোধক এবং চমৎকার মিউজিক ভিডিও তৈরি করেন কেভিন কার্সলেক। ৬ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের এই গানটি অনেক আগেই ক্লাসিকের মর্যাদা পায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত