ভূরাজনীতি বাণিজ্য

বিশ্বায়ন ধারণায় বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৩৯ এএম

বর্তমান পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিশ্বায়নের ধারণাটি আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার। রাজনীতি ও অর্থনীতির বাস্তবতায় আমাদের প্রথমে মনে রাখতে হবে ক্যাপিটালিজম বা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার আন্তর্জাতিকীকরণ হয়েছে বেশ কয়েকটি ধাপে। আগে উৎপাদন ছিল সবসময় জাতীয়। জাতীয় ও ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে উৎপাদন হতো এবং তারপরে বিদেশে রপ্তানি করা হতো। এটাই ছিল ক্যাপিটালিজমের চরিত্র। কিন্তু ৮০-এর দশকে এসে বিশাল পরিবর্তন দেখতে পাই। ওই পরিবর্তনের ফলে আমরা দেখলাম যে উৎপাদন আন্তর্জাতিকীকরণ হলো। ক্যাপিটালিজম নিয়ে কার্ল মার্কস বা লেনিনের প্রচুর লেখালেখি থাকলেও, তারাও এটা কখনো চিন্তা করতে পারেননি যে, প্রোডাকশন ইন্টারন্যাশনাল হয়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন হয়েছে? দুটো কারণে হয়েছে, প্রথমত, পশ্চিমা দেশে বা ডেভেলপ ইকোনমিতে মুনাফা কমতে শুরু করল। ক্যাপিটালিজমের মধ্যে ইনবিল্ড যে একটা উৎপাদন শুরু হয় একটা পর্যায়ে এসে সেখানে ডিপ্ল্যাইনিং টেনডেন্সি দেখা দেয় অর্থাৎ মুনাফা কমতে থাকে। কথা হচ্ছে, প্রফিটটা আমি কীভাবে বাড়াব? দেখা গেল যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে উৎপাদন করতে গেলে শ্রমমূল্য বেড়ে উৎপাদন খরচ অনেক হয়ে যায় এবং মুনাফা কমে আসে। কিন্তু একই পণ্য বিদেশে উৎপাদন করলে মুনাফা বেড়ে যায়। কারণ সেখানে লেবার কস্ট কম। এই হিসাব থেকেই বিশ্বায়নের আবির্ভাব।

এখানে চীনের একটা বড় ভূমিকা আছে। সে এই জিনিসটা খুব সহজে বুঝতে পারল যে, এই ইনভেস্টটা যদি একবার চীনে আসা শুরু করে তখন তার যে শ্রমিক বা তার জনগণও সেই টেকনোলজি শিখে ফেলবে এবং আস্তে আস্তে উৎপাদন বাড়াতে শুরু করবে। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশেও যে রেডিমেড গার্মেন্টস আসলো এর পেছনেও ওই বিশ্বায়নের লাভ-ক্ষতির কারণ। বাংলাদেশের শ্রমিক যেই দামে পোশাক উৎপাদন করবে আমেরিকা বা ইউরোপের শ্রমিক সেই দামে করবে না। ফলে বাংলাদেশে পোশাক কারখানা হলে তাতে প্রফিটের বিশাল মার্জিন পশ্চিমারা ভোগ করতে পারবে এ হিসাব থেকেই রেডিমেড গার্মেন্টস আমাদের এখানে আসলো। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের যে বিশাল জনগোষ্ঠী উৎপাদনের বাইরে ছিল, তারা কাজ পেল। এখানকার শ্রমিক ওখানের চেয়ে কম মূল্য পাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে সে উৎপাদনের অংশ হওয়ার সুযোগ পেল, ফলে  এদিক থেকে শ্রমিকেরও লাভ হলো। দ্বিতীয়ত হলো টেকনোলজি। বিশেষ করে শিপিং ইন্ডাস্ট্রি; বিশাল বিশাল জাহাজ তৈরি হলো। স্টেডিয়ামের মতো বড় বড় জাহাজে প্রচুর পণ্য পরিবহনের সুযোগ এই বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করল। কথা হচ্ছে যে, এই বিশ্বায়নই যে সব জায়গায় সমানভাবে গিয়েছে, তা নয়। কিন্তু এই বিশ্বায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে উৎপাদনের কাঠামোটা ছড়িয়ে গেছে। এই কাঠামোতে যারা যারা আগে ঢুকতে পেরেছে এবং এটার সুফল নিয়েছে তাদের অর্থনীতি তারা ডেভেলপ করতে পেরেছে। বিশ্বায়নের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট ডেভেলপমেন্ট থেকেই পৃথিবী একটা বহুরৈখিক বা মাল্টিপোলার কাঠামোর মধ্যে পড়েছে। এই মাল্টিপোলার কাঠামো পৃথিবীতে কখনই ছিল না। অঞ্চলভিত্তিক কিছু থাকলেও পুরো বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া বহুরৈখিকতা কখনো ছিল না।

বিশ্বের এই বহুমুখীন হয়ে ওঠার মধ্যেই দেখছি চীনের পুনরুত্থান। কারণ অষ্টম শতাব্দীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন ছিল প্রথম এবং অভিভক্ত ভারত ছিল দ্বিতীয়। কিন্তু এর পরের হাজার বছর ধরে তারা পারেনি, এই গোটা সময় জুড়ে পশ্চিমা দেশের উন্নতি বেশি হয়েছে। কিন্তু এখন এই শতাব্দীতে এসে চীন, ভারত, তুর্কি এমনকি সাউথ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলের মতো দেশ ও অঞ্চল শক্তিশালী অর্থনীতি নিয়ে হাজির হয়েছে। এই হিসেবে আমরা একটা মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করা শুরু করলাম।

এখানেই রাজনীতির খেলা শুরু হয়েছে। ব্রিটেনকে ঘিরে বিশ্বে পথম পোলারিটি বা মেরুকরণ তৈরি হয়, যেটাকে বলে প্যাক্স ব্রিটেনিকা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবী হয়ে গেল বাই পোলার বা দুই মেরুর। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু গর্বাচেভের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ব আবার ইউনিপোলার হয়ে গেল এবং আমেরিকার একক রাজত্ব শুরু হলো। সেটা ভাঙতে শুরু করল এই বিশ্বায়নের কারণে। কারণ একেকটা দেশ স্বীয়ভাবে ডেভেলপ করতে শুরু করল। এখন এই মাল্টি পোলারিটি থামাবার কোনো উপায় নেই। কারণ এখানে ভারতের যেমন উত্থান হচ্ছে, চীনেরও উত্থান হয়েছে। এমনকি ছোট ছোট দেশগুলোরও যে উত্থান হলো, তার ফলে তারা আর ছোট রইল না। এখানে বাংলাদেশেরও পুনরুত্থান হয়েছে, যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় একদমই অন্যরকম ছিল।

এখন কথা হচ্ছে, বিশ্বায়নের হাত ধরে বহুরৈখিক যে বিশ্বব্যবস্থায় পৃথিবী প্রবেশ করেছে সেখানে বাংলাদেশ কীভাবে এবং কী ভূমিকা রাখবে, যার মাধ্যমে সে তার অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে? মনে রাখতে হবে বিশ্বায়নে আসার আগে বাংলাদেশ কিন্তু মূলত এইড ডিপেন্ডেড বা সহায়তা নির্ভর দেশ ছিল। আর বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো বড় হয়েছে, যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা একটা বাণিজ্য নির্ভরতা বা ট্রেড ডিপেন্ডডেন্সির মধ্যে পড়ে গেছি। দেখা গেল, আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের বাজার ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে বড় আকারে সীমিত হয়ে পড়েছে। এখন ওই  দেশগুলো যেহেতু জানে যে বাংলাদেশ ট্রেড ডিপেন্ডেন্ট, তাই তারা নিজেদের জাতীয় ও বাণিজ্য স্বার্থের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে খেলা শুরু করল। এর ফলে মাল্টিপোলার বিশ্বেও বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবে তাদের স্বার্থই রক্ষা করে চলছে। যেহেতু আমাদের সারপ্লাস আছে আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে। কিন্তু এই সারপ্লাসটা যদি আমরা সেখানেই খরচ করি তাহলে তা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। কারণ ইউরোপ-আমেরিকায় দাম বেশি। সেখান থেকে যদি আমরা টেকনোলজি কিনতে চাই, দামও তেমনই দিতে হবে। বাংলাদেশ এখনো ওদের থেকে বেশি কিনলেও ধীরে হলেও অন্য জিনিসগুলো চীন, রাশিয়া, ভারতসহ অন্য দেশের থেকেও কিনছে। সামরিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে পরমাণু প্রযুক্তি, বিমান ইত্যাদি বাংলাদেশ বিভিন্ন সোর্স থেকে কেনা শুরু করেছে। এখানেই পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে আমেরিকার একটা আপত্তি। 

এখন আমেরিকা যে এটা শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে করে তা না। জার্মানির সঙ্গেও সে একই আচরণ করছে। জার্মানি যেহেতু মনে করে রাশিয়া থেকে কম দামে গ্যাস পেলে তার লাভ, কিন্তু আমেরিকা এখানে বাঁধা দিল। ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে কিন্তু এই জিনিসটাও একটা বড় বিষয়, যেটা অনেকেই হয়তো খেয়াল করছে না। সে কারণেই অনেকেই মনে করে রাশিয়া থেকে যেন গ্যাস আসতে না পারে সে কারণে আমেরিকা গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করেছে বা ধ্বংসের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশও প্রায় একই সমস্যায় পড়েছে।

আমরা সহায়তা বা এইড নির্ভরতা থেকে ট্রেড বা বাণিজ্যনির্ভর হয়ে পড়েছি। এখানে দুটো জিনিস খুবই দরকার। একটা হলো যে আমাদের বাজার বৈচিত্র্য আনতে হবে। ইউরোপ এবং আমেরিকার বাইরে আমাদের নতুন মার্কেট তৈরি করতে হবে। কারণ পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমাদের চাপ দেয়। তারা সেটা করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদির নামে। কিন্তু সেটা কতটা ওসবের জন্য তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ অনেক দেশের ব্যাপারে তারা এসবের প্রশ্নে চুপ থাকে, আবার কিছু দেশের বিষয়ে এসব নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। আবার তাদের নিজেদেরই ডেমোক্রেসি এবং হিউম্যান রাইটসের সমস্যা আছে। কিন্তু তারা এমন দ্বিমুখী আচরণ করে আসছে, কারণ তাদের ওপর আমাদের বাণিজ্য নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। অন্যটি হলো পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ। আমরা শুরু থেকেই আরএমজির ওপর নির্ভর করে বাণিজ্য করছি। এখানে বৈচিত্র্য আনতে হবে। সমস্যা হলো ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিতে চায় না। কারণ সে ভাবছে যে, এখানেই তো বড় লাভ পাচ্ছি কেন আমি ঝুঁকি নেব? কিন্তু এই একটি পণ্যের ওপর নির্ভরতা তাকে বিশাল সমস্যায় ফেলতে পারে। সে বিকল্প পণ্য না রাখলে সমস্যা হলে মুখ থুবড়ে পড়বে।

তবে এই মাল্টিপোলার বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশকে আশীর্বাদপুষ্ট বলা যায়। আমাদের নীতি হচ্ছে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়’। এটা খুব কাজে দিয়েছে। আমি মনে করি বিশ্বায়নের বিভিন্ন রকম নীতির মধ্যে আমাদের এই নীতিই সব থেকে উল্লেখযোগ্য। কারণ বিশ্বায়নের মাধ্যমে যেহেতু ইতিমধ্যেই মাল্টিপোলার বা বহুরৈখিক হয়ে পড়েছে, আমাকে সম্পর্কের জায়গাতেও বৈচিত্র্যময় হতে হবে। সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। এটা বলা সহজ, কিন্তু কাজটা কঠিন। এ ক্ষেত্রে আমার কেবল একটা ভাষার ওপর নির্ভর করলে হবে না। অনেকেই হয়তো ইংরেজি ভালো জানেন, কিন্তু আফ্রিকা থেকে শুরু করে চায়নিজ, জাপানিজ, অ্যারাবিক, পর্তুগিজ, ফ্রেঞ্চ ভাষায়ও দখল থাকতে হবে। এতে পেশাদারত্ব বাড়বে, কষাকষিতে দৃঢ়তা থাকবে। এখানে বড় একটা সমস্যা রয়ে গেছে, কারণ আমাদের যারা এলিট তারা যেহেতু পশ্চিমমুখী এবং তাদের ছেলেমেয়েরাও বড় আকারে আমেরিকার, ইউরোপে থাকে। সেখানে বড় রকমের একটা মানি লন্ডারিংও হয়।  আমার মনে হয় এই জিনিসটা বড় আকারে চিন্তা করা দরকার। কেননা তারা একসময় বাড়িঘর বিক্রি করে পুরো টাকাটাই পশ্চিমে নিয়ে যায়। এই যে দুর্নীতি হয় বাংলাদেশে, এই দুর্নীতির টাকাটাও কিন্তু পশ্চিমা দেশে চলে যায়। বহুরৈখিক বিশ্বে পুঁজির এই একমুখীনতায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। দেশের পুঁজি বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত