অভিবাসন

দেশ ছাড়তে চায় প্রায় তরুণ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৫০ এএম

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় এখন ১৫০ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালে এক বছরেই রেকর্ড পরিমাণ ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪৫৩ জন বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করতে গিয়েছেন। এই প্রবাসীরা কিন্তু তাদের আয় পাঠাচ্ছেন বাংলাদেশ। গত বছরও ২২ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংক ও নোমাডের প্রতিবেদন বলছে, প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম। এই যে প্রবাসীরা বছরে যে পরিমাণ ডলার পাঠায়, টাকার অঙ্কে এটি কত বড়? সহজ করে বললে, সারা বিশ্ব মিলে বাংলাদেশকে এখন যে পরিমাণ ঋণ বা অনুদান দেয় কিংবা সরাসরি যে বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসে তার থেকেও ছয় থেকে দশ গুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। আসলে অর্থনৈতিক মন্দা হোক কিংবা করোনা মহামারী! যুদ্ধ হোক কিংবা দুর্যোগ! যে কোনো বৈশ্বিক সংকটে বড় ভরসার নাম প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ যে এখন আর বিদেশি ঋণ নির্ভরশীল নয় তার কারণ এই প্রবাসী আয়।

এই প্রবাসী আয়ের নেপথ্যে আছেন এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি, যার ৭৫ শতাংশই আছেন মধ্যপ্রাচ্যে। একটু পেছনে ফিরি। ৯ মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যখন বিজয় লাভ করে তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি পৃথিবীর দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ। একদিকে প্রায় শূন্য রিজার্ভ, আরেকদিকে ডলারের তীব্র সংকট। কিন্তু পাঁচ দশক পর আজ অন্য এক উচ্চতায় বাংলাদেশ। এর একটা বড় কারণ প্রবাসী আয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আমার নিজের একটা তত্ত্ব আছে। আমি বলি বাংলাদেশের অর্থনীতি হলো ইএফজির অর্থনীতি। ই মানে এক্সপার্টিয়েট ওয়ার্কার বা প্রবাসী শ্রমিক। এফ মানে ফার্মারস বা কৃষক। আর জি মানে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স বা পোশাক শ্রমিক। মূলত এ তিন শ্রেণির মানুষই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এর মধ্যে অভিবাসন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অভিবাসন মানে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষের স্থানান্তর। এই যে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে যাচ্ছে, দেশ থেকে বিদেশে সবই অভিবাসন। দেশের ভেতরে হলে সেটা অভ্যন্তরীণ আর বাইরে হলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন। কখনো এই অভিবাসন হয় স্থায়ীভাবে অন্য দেশে বসবাসের জন্য, কখনো বা কাজের জন্য। এই যেমন কাজের জন্য বিদেশে কর্মী পাঠানোর তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে ষষ্ঠ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই আছেন ২০ থেকে ২৫ লাখ বাংলাদেশি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন ১২ থেকে ১৫ লাখ। এ ছাড়া কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনে গড়ে তিন থেকে চার লাখ করে বাংলাদেশি আছেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াতেও আছেন লাখ দশেক বাংলাদেশি। বিদেশ থাকা কোটিরও বেশি এই বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাঠানো আয় প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে। বদলে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

স্বাধীনতার পর বছরে মাত্র হাজার পাঁচেক মানুষের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো বছরে এক লাখ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান ঘটে। এরপর সেটি দুই লাখ-তিন লাখ হয়ে ২০০৭ সালে এক লাফে আট লাখে চলে যায়। এরপর ২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে আট লাখ ৭৫ হাজার বাংলাদেশির বিদেশে কর্মসংস্থান হয়। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো বছরে দশ লাখ লোকের বিদেশে কর্মসংস্থান ঘটে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে এসে বৈদেশিক সেই কর্মসংস্থান থমকে যায়। মহামারীর কারণে ওই বছর মাত্র ২ লাখ ১৭ হাজার কর্মী বিদেশে যায়। অন্যদিকে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি বিদেশ থেকে ফেরত আসে। সবকিছু মিলে পরিস্থিতি বেশ সংকটাপন্ন ছিল। তবে গত তিন বছরে পরিস্থিতির ইতিবাচকভাবে উত্তরণ ঘটেছে। ২০২২ সালে ১১ লাখ ৩৫ হাজার এবং গত বছর ১৩ লাখ লোকের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়।

বাংলাদেশ থেকে গত কয়েক বছরে রেকর্ড পরিমাণ অভিবাসন হলেও প্রবাসী আয় কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না। অনেকে বরং কাজ না পেয়ে ফেরত আসছেন। এসব বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। আসলে বাংলাদেশে থেকে যারা বিদেশে কাজে যাচ্ছেন যারা মূলত নির্মাণশ্রমিক, প্ল্যান্টেশন, কৃষি, সার্ভিস বা উৎপাদন খাতে কাজ করেন। সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে সবচেয়ে কম আয়ে তারা যান। কাজেই তাদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে। এ ছাড়া প্রবাসী আয় বৈধভাবে আনতে হলে খোলাবাজারের সঙ্গে ব্যাংকের ডলারের দাম নিয়ে যে পার্থক্য সেটি ঠিক করা জরুরি।

আসলে প্রবাসীরা বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটা বিষয়কে গুরুত্ব দেন। তারা বিবেচনায় নেন, কত দ্রুত দেশে অর্থ পাঠানো যাবে; সেই প্রক্রিয়া কতটা সহজ। আর ডলারের দাম। ডলারের বিপরীতে কত টাকা তিনি পাবেন সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজেই ব্যাংকে থেকে বৈধভাবে তারা আরও কী কী সুবিধা পেতে পারেন সেটি দেখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব জায়গায় থাকেন সেখান থেকে ব্যাংকের দূরত্ব অনেক। আবার প্রবাসীদের কাজের সময় ও ব্যাংক খোলা থাকার সময় একই। ফলে ব্যাংকে গেলে ছুটি নিতে হবে, বেতন কাটা যাবে। হুন্ডির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এসব সুযোগ নিয়ে সরাসরি শ্রমিকদের আবাসিক ক্যাম্পে চলে যান। এখন বৈধ সেবাগুলো যদি প্রবাসীদের দোরগোড়ায় না যায় তাহলে হুন্ডি ঠেকানো কঠিন। কাজেই বিষয়গুলোর সমাধান জরুরি।

আর প্রবাসী আয় আনতে শুধু ব্যাংক নয়, এমএফএস বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের দোরগোড়ায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই এমএফএস। এই সেবাকে প্রবাসীদের জন্য আরও কীভাবে বাড়ানো যায় ভাবতে হবে, যাতে একজন প্রবাসী তাৎক্ষণিক রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন।

আরেকটা বিষয়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাজ করতে গ্রামের তরুণরা বিদেশে যাচ্ছে তাই নয়, কখনো কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে অভিবাসী হয়ে কখনো বা উচ্চশিক্ষার জন্যও তরুণরা দেশ ছাড়ছে। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেসকো) ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি-লেভেল স্টুডেন্টস’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮ হাজার ৫২৪ শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। যুক্তরাজ্যে গেছেন ৬ হাজার ৫৮৬ শিক্ষার্থী, কানাডায় ৫ হাজার ৮৩৫, মালয়েশিয়ায় ৫ হাজার ৭১৪, জার্মানিতে ৫ হাজার ৪৬, অস্ট্রেলিয়ায় ৪ হাজার ৯৮৭, জাপানে ২ হাজার ৮০২, ভারতে ২ হাজার ৬০৬ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ২০২ জন, সৌদি আরবে ১ হাজার ১৯০, ফিনল্যান্ডে ৯৫৪, তুরস্কে ৭৫১, সুইডেনে ৬৬০ ও কাতারে ৩০৮ শিক্ষার্থী গেছেন।

এর আগে ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ৪৯ হাজার ১৫১ শিক্ষার্থী। এক দশক আগে ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ১১২ জন। ২০০৮ সালে ছিল ১৬ হাজার ৬০৯। কিন্তু কেন এই তরুণরা দেশ ছাড়ছে?

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, গত ১৫ বছরে বাংলদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার অভাব, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগসহ বেশ কয়েকটি কারণে শিক্ষার্থী ও তরুণদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে। কম শিক্ষিত গ্রামের মানুষেরা কাজ করতে বিদেশে যাচ্ছেন, আরেক দল উচ্চশিক্ষা বা অভিবাসী হতে দেশ ছাড়ছেন। সবসময় শুধু যে অর্থনৈতিক কারণে অভিবাসন হয় তা নয়, অনেক সময় সুশাসনের অভাবেও মানুষ দেশ ছাড়ে। কাজেই দেশে সুশাসন জরুরি। বিশেষ করে মানুষকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে প্রবাসীদের। এই যে ১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি অর্থ ও রসদ সংগ্রহেও প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও আমরা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা সেই প্রবাসীদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, জর্দান, লেবানন, ইতালি এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কমবেশি আছেন বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা। অন্যদিকে অনাবাসী বাংলাদেশিরা অছেন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মান, ফ্রান্সসহ পৃথিবীর নানা দেশে। এই বাংলাদেশিরা যেমন প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন তেমনি বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন তাদের কাজ দিয়ে। কিন্তু এত অবদানের পরও প্রবাসী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দূতাবাস বা নানা সেবা নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

প্রবাসীদের প্রতি এখনো দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দূতাবাস সবখানেই পোহাতে হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। পাসপোর্ট তৈরি থেকেই শুরু। এরপর দালাল, চাকরির বিষয়ে অসত্য তথ্য, উচ্চমূল্যে ভিসা কেনাবেচা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সরকারি ছাড়পত্রসহ সবখানে সীমাহীন যন্ত্রণা। দেশের আকাশ পার হলে শুরু হয় বিরূপ প্রকৃতি, অমানুষিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন, মালিকদের প্রতারণা, নির্যাতনসহ আরও কত কী! আবার বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে গেলে কাক্সিক্ষত সেবা মেলে না, দেশে ফিরলেও ভোগান্তি। এসব সমস্যার সমাধান জরুরি।

যদিও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, তাদের স্বীকৃতি দিতে ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস আর ৩০ জানুয়ারি জাতীয় প্রবাসী দিবস পালিত হচ্ছে, তবে এখনো অনেক পথচলা বাকি। শুধু আনুষ্ঠানিক দিবসে না থেকে অভিবাসী শ্রমিক, প্রবাসী ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকা উচিত। পাশাপাশি কী করে তারা খুব সহজে দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন, কীভাবে তাদের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগানো যায়, সারা বছর জুড়ে কীভাবে প্রবাসীদের দেশের সঙ্গে যুক্ত করা যায় এগুলো ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, এক কোটিরও বেশি প্রবাসী শুধু যে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন তা নয়, অনেক দূর থেকেও বুকের মধ্যে যত্ন করে রেখেছেন লাল-সবুজের জন্য ভালোবাসা।

লেখক : কলামিস্ট এবং অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ব্র্যাক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফরম)

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত