বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অ্যাভয়েড করা যাচ্ছে না ‘অ্যাভয়েডরাফা’কে

  • নতুন জেনারেশনের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা অনেক বেশি অ্যাকটিভ, অথচ মিউজিশিয়ানরা অনেক অলস
  • গান যতই আউট অব জনরা হোক না কেন অর্থহীন উইল টেক ইট ইন
  • চারজন বা পাঁচজনের পাগলামি মিলেই একটা ব্যান্ডের গান বা সাউন্ড
আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪৮ পিএম

অনেক ঘাট ঘুরে অবশেষে অ্যাভয়েডরাফার ঘাটে এসে ভিড়ল রায়েফ আল হাসান রাফার গানের তরী। শেষমেশ থিতু হলেন। গীতিকার, সুরকার, মাল্টি ইনস্ট্রুমেন্টিস্ট এবং গায়ক রাফার ব্যান্ড অ্যাভয়েডরাফা।

এতদিন বিভিন্ন ব্যান্ডে বাজিয়েছেন তিনি। যার মধ্যে রয়েছে অর্থহীন এবং ক্রিপটিক ফেইটের মতো সুপার গ্রুপ। আছে ক্রাল, সিভিয়ার ডিমনেশিয়া বা দ্য জয়েন্ট ফ্যামিলির মতো ব্যান্ডও। এছাড়া সলো ক্যারিয়ারের একটা ব্যাপার তো রয়েছেই।

তবে সবশেষে এবার অ্যাভয়েডরাফাতে ঘাঁটি গাড়লেন এই মাল্টি ট্যালেন্ট। নিজের ব্যান্ড, দেশের সংগীতের বর্তমান অবস্থা এবং সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তর কথা বলে অ্যাভয়েডরাফার ফ্রন্টম্যান্ট ও মুখপাত্র রায়েফ আল হাসান রাফার সঙ্গে। তার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য।

অ্যাভয়েডরাফা কেন? অ্যাভয়েড করা যায় না তাই, নাকি অ্যাভয়েড করা যাবে তাই?
বিষয়টি এভাবে না দেখে একটু অন্যভাবে দেখি। এটা একটা নরম নাম, সাধারণ নাম। আমার নাম তো বন জভির মতো সুন্দর না। আমার নাম রাফা। নিজের নাম সুন্দর করে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টার নামই অ্যাভয়েডরাফা। আমি আমার ব্যান্ডের একটা সুন্দর নাম দিতে চেয়েছি। একটু ভালো, একটু শ্রুতিনন্দন। নাম তো নিশ্চয়ই একটু সুন্দর হওয়া উচিত। তবে এ নাম দেওয়ার কোনো ফিলসফিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। আমি এমন একটা নাম দিতে চেয়েছিলাম যাতে ব্যান্ডও হবে আবার আমার নামটাও থাকবে। অনেকে অনেক নাম সাজেস্ট করেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ নামটিই পছন্দ হলো। এভাবেই জন্ম নিল অ্যাভয়েডরাফা। দুটো কাজ হলো- আমার নামটাও থাকল, আবার ব্যান্ডের নামটাও হয়ে গেল।

যদি রাফা কখনো অ্যাভয়েডরাফায় না থাকে তখনো কী এটা অ্যাভয়েডরাফাই থাকবে?
এটার সম্ভাবনা কম। এই ব্যান্ডের বেশির ভাগ কাজই আমার করা। অ্যাভয়েডরাফা থেকে যদি আমি চলে যাই তাহলে এটা শুধু অ্যাভয়েড থাকবে। রাফা তো আমি আমার সঙ্গেই নিয়ে যাব।

ছোটবেলা থেকে সোলো ক্যারিয়ারের প্রতি আমার খুব একটা টান ছিল না। এইটিজ-নাইনটিজে যেসব ব্যান্ড আমার হিরো তাদের দেখে একটা ব্যাপার বুঝি- ব্যান্ড কখনো একার কোনো প্রজেক্ট না। অ্যাভয়েডরাফার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। আমি ব্যান্ডটিকে নিয়ে এমন একটা জায়গায় যেতে চাই যখন এর প্রতিজন সদস্যকে মানুষ আলাদা আলাদাভাবে চিনবে। সবার কনট্রিবিউশনে একটা পরিপূর্ণ অ্যাভয়েডরাফা তৈরি হবে।

'ভার' অ্যালাবামে এত জনরা নিয়ে একসাথে কাজ করার কারণ কী?
প্রতিটা ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম নিয়ে তাদের মিউজিশিয়ানদের আলাদা কিছু প্ল্যান থাকে। তারা ভাবে এটা একটু স্পেশাল হবে। আমরাও ওরকম একটা প্ল্যান নিয়ে বসেছিলাম। তবে প্ল্যানটা সাকসেসফুল হয়নি, জগাখিচুড়ি হয়ে গেল। তবে আমি মনে করি, প্রথম অ্যালবাম নিয়ে ব্যান্ড মেম্বারদের মাথায় যত প্ল্যান থাকবে সব ঝেড়ে ফেলতে হবে। একারণে সব ঝাড়তে গিয়ে অনেকগুলো জনরা চলে এসেছে।

আপনার টোটাল মিউজিক্যাল ক্যারিয়ারের কতখানি ছাপ রয়েছে অ্যাভয়েডরাফার প্রথম অ্যালবামে?
অনেক ছাপ। যদিও অ্যাভয়েডরাফায় আমার প্ল্যান ছিল একেবারেই নিজের কিছু গান করার। এর গানগুলো একটু ইজি লিসনিং, একটু ডিফরেন্ট। ওই ডিফারেন্সটাই আসলে অ্যাভয়েডরাফা। বড় বড় ব্যান্ডে কাজ করেও ভেতরে ভেতরে আমার একটা আলাদা আইডেন্টিটি ছিল, ওটারই প্রকাশ অ্যাভয়েডরাফা। যদিও আমি সব ব্যান্ডেই খুব স্বাধীনভাবে কাজ করেছি আর স্বাধীনতার পরিপূণ বিকাশ অ্যাভয়েডরাফা।

পূর্বের ব্যান্ডগুলোর মিউজিক তৈরির বিষয়ে আপনি কতটা স্বাধীন ছিলেন?
ভীষণ স্বাধীন ছিলাম। অর্থহীনে যখন ছিলাম তখন সুমন ভাই (বেজবাবা সুমন) আমাকে একটা লিরিক ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, আমি আধেকটা সুর করেছি, বাকিটা তুমি কর। আমি আমার মতো করেছি। ক্রিপটিক ফেইটে তো আমি আরও স্বাধীন ছিলাম। আমি আমার মিউজিক্যাল ম্যাচিউরিটির সময়ে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেছি ক্রিপটিক ফেইটে।

অ্যাভয়েড করা যাচ্ছে না ‘অ্যাভয়েডরাফা’কে

নতুন অ্যালবামের কথা বলুন
আমি একসাথে দুটো অ্যালবামের কাজ করছি। একটা সোলো। ছোটবেলা আমার শখ একটা অ্যাকুয়েস্টিক অ্যালবাম করা। আমি বছর দুয়েক আগে একজন লেখকের কবিতার বই কিনি। আমি ওই বইটা পড়ে ভীষণ ইন্সপায়ার্ড। ওই বইটা থেকে পাঁচটা কবিতা নিয়ে আমি পাঁচটা গান বানিয়েছি। জাস্ট অ্যাকুয়েস্টিক। কাজটা প্রায় শেষ। আশা করছি এবছর রিলিজ করতে পারব। আরেকটা অ্যালবাম অ্যাভয়েডরাফার। আমরা সবাই অ্যাজ আ ব্যান্ড অ্যালবামটিতে পারফরম করব। দুটি গান ইতিমধ্যে হয়েছে। আরকিছু গান তৈরি করতে পারলেই অ্যালবাম আসবে। অনেকে চাইছেন সিঙ্গেল করে রিলিজ করতে, কিন্তু আমি চাইছি অ্যালবাম। এবছরই অ্যালবামটি বাজারে আসবে এবং আশা করছি আমরা এটা করতে পারব।

চাইলেই কেন এখন আর আগের মতো অ্যালবাম করা যায় না?
এই সমস্যাটা প্রকট এবং অনেক গভীরে প্রোথিত। এর সবেচেয়ে বড় কারণ হিসেবে আমি মনে করি আগের মতো রেকর্ড লেবেল না থাকা। আগে রেকর্ড লেবেলের লোকজন রীতিমতো ঘরে এসে বসে থাকত। তাদের চাপে পড়ে দিনে-রাতে কাজ করে অ্যালবাম করতে হতো। কাজ করার একটা অন্যরকম চাপ থাকত। যা এখন আর নেই। এখন করলে করলাম, না করলে না করলাম। এখন সব অনলাইনে। ইচ্ছে হলে কাজ করলাম, ভালো না লাগলে পরে একসময় করলাম। আগের মতো তাড়া নেই তাই চাপও নেই। এবছর পারলাম না, পরের বছর, পরের বছর পারলাম না তার পরের বছর। এভাবেই চলছে। আপনি নিজে নিজে কোনো ডেটলাইন ঠিক করলে সেটা ভাঙা আপনার জন্য কোনো সমস্যা নয়।

এটা অবশ্যই ব্যান্ডদের দোষ, আমাদের সবারই একটা সিস্টেমের মধ্যে থাকা উচিত। ভক্তরা তো সব সময়ই চায় তাদের প্রিয় ব্যান্ডের নতুন নতুন গান আর অ্যালবাম শুনতে। কিন্তু ব্যান্ড যদি তাদের নতুন গান না দেয় তবে দোষ তো ব্যান্ডেরই। 

আপনি আমাদের এ জন্য দোষ দিতে পারেন। আমরা সাত বছর আগে একটা অ্যালবাম করেছি। এর পর আর কিছুই করিনি, বসে আছি। এই সাত বছরে আমদের আরও অন্তত তিনটি অ্যালবাম করার কথা ছিল। তবে এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত কথা বলা উচিত। কারণ আমি বিশ্বাস করি কথা বলা শুরু হলে আমাদের এ অভ্যাসে বদল আসবে, ধীরে ধীরে হলেও।

তেমন হতে পারে অ্যালবামের ভবিষ্যৎ?
এর জন্য ইউটিউব স্ট্রিমিংকে আমার ভালো মনে হয়। যদিও ইউটিউব অনেক টাকা কেটে রাখে। মিউজিশিয়ানরা প্রপারলি পেইড হয় না। তারপরও এন্ড অব টাইম আমরা জানতে পারি আমরা কত টাকা পাচ্ছি। এটার মধ্যে একধরনের স্বচ্ছতা আছে। আগে অন্য মাধ্যমগুলোতে এই স্বচ্ছতা ছিল না।

এসময় মিউজিককে পেশা হিসেবে নেওয়ার কোনো সুযোগ আছে কী?
মিউজিক কাউকে পে-ব্যাক করবে এমন নিশ্চয়তা আমি আমার কাছের কাউকে দিতে পারব না। আমি নিজে একজন পেশাদার মিউজিশিয়ান, আমার হিসেব আলাদা। আমার কাছে কেউ পরামর্শ চাইলে আমি আগে তাকে ঠিকমতো পড়ালেখা করতে বলব ব্যাকআপ হিসেবে। যদি মিউজিশিয়ান হিসেবে ক্লিক করতে না পারে সে যেন অন্য কিছু করে খেতে পারে। আমি সব ছেড়ে মিউজিক করেছি, তবে এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। আমার কপালে লেগে গেছে, সবার কপালে লাগবে এমন কোনো নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। তবে শেষ কথা হলো- মিউজিককে প্রফেশন হিসেবে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো আমাদের দেশে তৈরি হয়নি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত