জীবন কত বিচিত্র। কত তার আঁকিবুঁকি, আল্পনার ক্লিশে বা নিখুঁত টান। যাপনের গভীরে হানা দেওয়া জান্তব, আক্রোশের শিকার হওয়া নারীকুল কিংবা বলা যায় নিরীহকুল। পৃথিবী সুস্থ নয়। মানুষ কেবল স্বাভাবিকতার ভান করে। সবাই সবার ছোট্ট গহ্বরে তলিয়ে গেছে, নিঃশেষ হয়ে গেছে আত্মা, পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে নিপতিত মানুষ পণ্য হয়ে বিক্রির জন্য থরে থরে সাজানো। জীবনের কত দিকে উঁকি দিয়ে যাওয়া ‘পেয়ারার সুবাস’ সিনেমাকে কবিতা বলা যায়, সার্থক গল্প বলা যায়, তারে লেগে থাকা বৃষ্টির ফোঁটার মতো স্বচ্ছ-সুন্দর বলা যায়, সঙ্গমের পর আমুদে গোসলের মতো পবিত্র বলা যায়। পেয়ারার সুবাস-এ গন্ধ হলো ট্রিগার পয়েন্ট। এটা শরীরের গন্ধ। সুগন্ধি হতে পারে আবার দুর্গন্ধ হতে পারে। সুগন্ধের সঙ্গে প্রকৃতির একটি অদ্ভুত কারার আছে। বিপরীত লিঙ্গের যাদের প্রাণ আছে, তারা ঘ্রাণ থেকে জোড়া বাঁধে। পেয়ারার সুবাস ঘ্রাণ থেকে বিস্তৃতি লাভ করে। এ কারণে পেয়ারা নামের একটি মেয়ে ও গন্ধের সম্পর্কগুলোর অবস্থান দেখানো হয়েছে এতে। ‘পেয়ারার সুবাস’-এ জয়া আহসান, তারিক আনাম খান, সুষমা সরকার, দিহান, নূর ইমরান মিঠু, মাহমুদ, মশিউল আলম, আঁখি আফরোজ, বুলবুল মহলানবিশ প্রমুখ অভিনয় করেছেন। এদের কেউ কেউ সিনেমায় বারুদ হয়ে উঠেছেন।
লাল মোরগের ঝুঁটির আহমেদ রুবেল যেন ‘পেয়ারার সুবাস’ সিনেমায় আরও পরিণত, দক্ষতার বীজ সারা মননে বপণ করে নয়ন জুড়ানো ফুল ফুটিয়েছেন। চলন্ত ট্রেনের ছাদে বসে প্রকৃতি দেখা, কবুতর উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি চোখের তারায় লেগে আছে। কবুতরের সঙ্গে কথা বলা বা আদর করার দৃশ্যগুলো প্রিয় মানুষের টান অনুভব করায়। জানালার ফাঁক দিয়ে পেয়ারার সঙ্গে তার চোখাচোখি, আহ পরান জুড়ানিয়া! এ সময় ‘সাত পাকে বাঁধা’র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। পেয়ারাকে নির্যাতন করার সময় আহমেদ রুবেলের যে মুখাবয়ব তা ংঁনষরসব হয়ে ওঠে।
যে ছবির জন্য রুবেল এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছিলেন, সেই ছবিটিই দেখা হলো না তার। সিনেমাটির প্রিমিয়ারের দিন যা ঘটল তা কষ্টের, বেদনার ও মর্মান্তিকও। তার উচ্চতা, চোখ, চিবুক, গলার আওয়াজ সত্যিই বিরল।
আমরা কেবল দেখি নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিক, কে কে মেনন, পঙ্কজ ত্রিপাঠিকে; আমরা আমাদের দেখতে পাই না, দেখতে চাই না। একজন আহমেদ রুবেল যে কী জিনিস, আমরা যে কী হারালাম তা এখনো কি বুঝেছি? হায় !
সিনেমায় জয়ার চেহারার যে টান তা কখনো আগুনের হলকার মতো, কখনো কবিতার লাইনের মতো, কখনো তা শিউলি ফুলের চাহনির মতো। জয়া ও তারিক আনাম খানের মিলনের দৃশ্যগুলোর এতটা সাংকেতিক প্রকাশ এখানকার দর্শক নিতে চায় না। কিন্তু আগরবাতির ধোঁয়ার যে ঊর্ধ্বগতি তা যেন স্বাভাবিক, পুড়ে পুড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ায় ভবিতব্য। কিন্তু পেয়ারার বৃষ্টিস্নাত কপাল, মুখ পুতুলনাচের ইতিকথার সেই কুসুমের কথা মনে করিয়ে দেয়। পাশবিক নির্যাতন সহ্য করেও ভালোলাগা পুরুষের জন্য সব মেনে নেওয়া, শরীরে ফুল ফোটানোর চেষ্টা এক কথায় অসাধারণ। তবে পেয়ারা চরিত্রে বোল্ডনেস, তারিক আনাম খানের হিংস্রতার জায়গাগুলো মিসিং। বলাই আছে, ‘পেয়ারার সুবাস’ ছবিটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। এখানে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় উঠে আসবে। অথচ সিনেমাটিকে বোরকা পরানোর চেষ্টা চালানো হয়েছে। ভারতে একজন নাসিরউদ্দিন শাহ আছেন, আর আমাদের তারিক আনাম খান। তার শিক্ষিত অভিনয়ের জৌলুশ সিনেমার পরতে পরতে। পেয়ারার শরীর নিয়ে তার শরীরে জ¦লন, ঝলকানি, লোভাতুর খরগোশকে তুলে আনা যে-সে অভিনেতার কর্ম নয়, কিন্তু তারিক আনাম খানের কাছে তা জলভাত। পুরুষ প্রেম বোঝে না, পুরুষ কেবল কাম বোঝে। কামনায় পর্যবসিত হয়ে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে পুঁজিপতিদের নারীভোগ বা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করার রীতি সর্বত্র সহজলভ্য এখন। প্রাগৈতিহাসিক গল্পের ভিখুকে দেখতে খারাপ লাগলেও মনে মনে সব পুরুষ মূলত ভিখুই হতে চায়। ‘পেয়ারার সুবাস’-এ তারিক আনাম খানরূপী সেই ভিখুকে দেখতে পাবেন। সংলাপ প্রক্ষেপণে একটু উচ্চস্বর আছে। তবে চরিত্রের ডিমান্ড অনুযায়ী তারিক আনাম খানকে কতটা ব্যবহার করা গেছে, সেটা কার খামতি, প্রশ্ন থেকেই যায়। আমার দেখা সুষমা সরকারের এটাই সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স। আবার বিয়ে করা বাবাকে অসহ্য লাগা, কিংবা সেই বাবার আদর শুষে নেওয়ার দৃশ্যগুলো উর্বর। চরিত্রটি বাস্তবতার মিশেলে যথোপযুক্ত, তবে পরিণতি বা তার শাখাগুলোকে আরও পরিষ্কার করা যেত। মাহমুদ আলমের চরিত্রের ভাস্কর্যে তীক্ষèতা আছে। নারীহীন পুরুষের যে সেক্স আপিল, যে শরীরী উৎপীড়ন, তা পরিমিত।
তবে দিহান চরিত্রটি জমজমাট হয়ে উঠেছে। তার শরীরী ভাষা, তার মানস টান দর্শককে উসকে দিয়েছে। খাবারের জন্য, শাড়ির জন্য নারী যে শরীর বিকিয়ে দেয়, একজন নারীর অবস্থান কতটা করুণ হলে এমনটি করে, সেটা এ চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশমান। ঢাকার গুলিস্তান, বনানী, ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী, গাবতলী এলাকায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা নারী, একশ টাকায় সারা রাতের জন্য বিক্রি হওয়া নারী মোটেও অপ্রতুল নয়। তাদের ভরণপোষণের জন্য, দায়িত্ব নেওয়ার জন্য, কোথাও কোনো ওয়াজ হয় না, আলোচনা হয় না, কেমন করে কত কম দিয়ে তাদের ভোগ করা যায়, সেই লালাময় কানাঘুষা শোনা যায় বাতাসে কান পাতলে। সিনেমায় মোবাইলে সেক্স করা কিংবা সেক্সচুয়াল কথা বলার ধরন যথাযথ।
পুরো সিনেমায় পরিমিতিবোধের তীক্ষè ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘদিন আগে শুটিং করা, কিংবা সেন্সর মশাইয়ের আঁখের সামনে পড়ে কাটাছেঁড়া করতে করতে এই অবস্থা যে হয়নি, তা বলা যাবে না। এই অবাধ স্বাধীনতার যুগে আমাদের সেন্সরের এই সেন্স যে নুইসেন্সের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আয়ান রেহালের সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। ‘পথের পাঁচালী’র বৃষ্টির যে দৃশ্য অথবা অপু আর দুর্গা ট্রেন দেখতে দৌড়াচ্ছে কাশবন দিয়ে; সেই দৃশ্যের মতো বন্যাকবলিত রেললাইন, শূন্য খাঁচার পাশ থেকে অপর পাশের রাস্তা দেখানো, কিংবা পোকামাকড়ের দৃশ্যাবলির নিখুঁত বিন্যাস প্রশংসনীয়। সিনেমায় ইমেজ খুব শক্তিশালী। ইমেজের সঙ্গে দর্শকরা খুব সহজেই যোগাযোগ করতে পারছেন।
সিনেমার কাহিনিবিন্যাস কিংবা সম্পাদনায় খামতি আছে, তবে চরিত্র অনুযায়ী সংলাপ মানানসই। অল্প কিছু লোকেশনে শুট করা, সাসপেন্স কম। সিনেমার মাঝখানে সজীব ও সুকন্যার সুন্দর গানটার সংযোজন বেশ অভিনব ও মনোগ্রাহী। সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে আলফা-আই স্টুডিওজ ও সহ-প্রযোজনায় চরকি। আর সিনেমাটি উৎসর্গ করা হয়েছে আহমেদ রুবেলকে। বাংলা সিনেমায় আহমেদ রুবেলের মতো একজন ওমপুরী আবার কবে আসবে, আদৌ আসবে কি না সন্দেহ। সিনেমার ভেতর দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ানো, কিংবা কখনো জীবনকে স্থূল আর সমস্ত অর্থহীনতার সামনে দাঁড় করিয়ে শেষ পর্যন্ত জীবনের কাছেই নিয়ে যাওয়ার কারিগর ছিলেন কিয়ারোস্তামি। নূরুল আলম আতিকের মনোযোগ সেদিক থেকে বেশি দূরে নয়। কিয়ারোস্তামির সিনেমার মতো ‘পেয়ারার সুবাস’কে কাব্যরসোত্তীর্ণ বলা যায় কি না ভেবে দেখতে হবে। কারণ, এ দেশে একজন ছাত্রনেতা যতটা সচ্ছল ও স্বেচ্ছাচারী, একজন মাদ্রাসার শিক্ষক যতটা বেপরোয়া ও নির্ভীক, তার ধারেকাছেও নেই চিত্রপরিচালকরা। নানাবিধ প্রতিকূল পরিবেশ ও সংকটের মধ্যে নূরুল আলম আতিক সিনেমা বানান, তাকে টুপি খোলা অভিবাদন। আপনি আমাদের সফল ও শিল্পোত্তীর্ণ চিত্রপরিচালকদের একজন।
