দুর্বল শেয়ারের সুবিধায় নতুন নির্দেশনা

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৫১ এএম

অনেক দিন ধরেই পুঁজিবাজারে লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির নেতৃত্বে রয়েছে উৎপাদন বন্ধ, লোকসানি কোম্পানির শেয়ার। এসব শেয়ারের কারসাজির ওপর নির্ভর করেই সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজার চাঙ্গা করা হয়েছে। প্রচলিত বিধিবিধান যাতে এসব শেয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য দুর্বল কোম্পানির শ্রেণি ‘জেড’-এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে টানা দুই বছর লভ্যাংশ ঘোষণায় ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পাঠাতে পারবে স্টক এক্সচেঞ্জ, যেটি আগে এক বছর ছিল। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ দিয়েই কোনো কোম্পানি জেড ক্যাটাগরি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

এ-সংক্রান্ত আগের আদেশটি কিছুটা সংশোধন করে গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন আদেশ জারি করে ফিরিয়ে এনেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। যদিও যে আদেশটি ফিরিয়ে আনা হলো, তা গত বছরের ৩০ নভেম্বর বাতিল করেছিল এ সংস্থাটি। আদেশটি জারি না হলে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি তালিকাভুক্ত ৭০টির বেশি কোম্পানির শেয়ার এক দিনেই ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত বা মন্দ শেয়ার হিসেবে বিবেচিত হতো।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি আছে ৩৫৭টি। এর মধ্যে জেড ক্যাটাগরিভুক্ত শেয়ার আছে ২৭টি। গত ৩০ নভেম্বরের আদেশটি আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি কার্যক্রম হলে তখনই এ সংখ্যা প্রায় ১০০টিতে উন্নীত হতো। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তড়িঘড়ি করে গতকাল নতুন আদেশ জারি করেছে এসইসি। তবে এ ক্ষেত্রেও আইনের ব্যত্যয় হয়েছে। নতুন আদেশে দেখানো হয়েছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের আদেশটি কার্যকর আছে। আদতে তা নেই (গত ৩০ নভেম্বর বাতিল করা হয়)। এসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন আদেশ জারি করা না হলে ৬০-৭০টি শেয়ার নতুন করে জেড ক্যাটাগরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতো। তবে এটাও ঠিক, ৩০ নভেম্বরের আদেশটিতে কিছু ভুল ছিল। এই ভুল সংশোধনে নতুন আদেশ জারি করতে হয়েছে।

স্টক এক্সচেঞ্জের ‘জেড ক্যাটাগরি’ মানে হচ্ছে, যেখানে শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তিতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। এই শেয়ারগুলো নন-মার্জিন এবং এই ক্যাটাগরির কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো টানা দুই বছর লভ্যাংশ না দিলে জেড ক্যাটাগরিতে স্থান পাবে। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ ও উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিকে জেড ক্যাটাগরিতে পাঠানো হবে। গতকাল পুঁজিবাজারের দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোকে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এমন নির্দেশনা জারি করেছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

গতকাল এসইসির চেয়ারম্যান ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি পরপর দুই বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হলে ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হলে সেসব কোম্পানিকে জেড ক্যাটাগরিতে পাঠানো হবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো রিট পিটিশন বা আইনি প্রক্রিয়ার ফলে এজিএম অনুষ্ঠিত না হলে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর বিবেচনা করা যেতে পারে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, টানা দুই বছর পরিচালন লোকসান কিংবা ঋণাত্মক নগদ প্রবাহ থাকা কোম্পানিও জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হবে। এ ছাড়া যদি কোনো কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন বা পুনর্বাসন (বিএমআরই) ব্যতীত টানা ছয় মাস উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকে, তাহলে সেই কোম্পানির শেয়ারও এই শ্রেণিভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া টানা দুই বছর কোনো কোম্পানি নিট পরিচালন লোকসান অথবা নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক থাকে এবং পুঞ্জীভূত (রিটেইন্ড) লোকসান কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে বেশি হলেও সেই কোম্পানি জেড ক্যাটাগরিতে যাবে। তবে রেভিনিউ রিজার্ভ সমন্বয়ের পর পুঞ্জীভূত লোকসান কিংবা পুঞ্জীভূত আয়ে ঋণাত্মক ব্যালান্স থাকা কোম্পানিগুলো সর্বশেষ হিসাব বছরের মুনাফা থেকে লভ্যাংশ ঘোষণার (অন্তর্বর্তী লভ্যাংশসহ) পাশাপাশি পুঞ্জীভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধন ছাড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পূর্ববর্তী বছরগুলোর এজিএম সম্পন্ন করেছে, সেসব কোম্পানির ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।

ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত যেকোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি প্রান্তিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অর্জিত মুনাফা থেকে সময়ে সময়ে শেয়ারহোল্ডারকে কোনো অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ (স্টক/বোনাস শেয়ার ব্যতীত) দিতে পারে, যা পরিচালনা পর্ষদের কাছে মুনাফা দ্বারা ন্যায়সংগত বলে মনে হয়। এ ধরনের অন্তর্বর্র্তী লভ্যাংশ কোম্পানির শ্রেণীকরণের সমন্বয়ের জন্য বিবেচনা করা হবে।

এসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩০ নভেম্বরের আদেশটি কার্যকর হলে শেয়ারের ক্যাটাগরি নির্ধারণে ডিএসইর সেটেলমেন্ট অব ট্রানজেকশনস রেগুলেশনসটি কার্যকর হতো, যেখানে কিছু ভুল আছে। ওই রেগুলেশনসে বলা হয়েছে, এজিএম না করলে বা লভ্যাংশ ঘোষণা না দিলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার জেড ক্যাটাগরিভুক্ত হবে। তবে কত বছর লভ্যাংশ না দিলে বা এজিএম না করলে, তা বলা নেই।

অবশ্য ডিএসইর কর্মকর্তাদের দাবি এখানে কোনো ভুল নেই। তারা বলেন, সেটেলমেন্ট রেগুলেশনটি এসইসি অনুমোদিত এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এসইসি কখনো বলেনি, এতে এতে ভুল আছে।

ডিএসইর ২০১৩ সালের ওই রেগুলেশনসের ২ (জেড) উপধারায় বলা আছে, কোনো কোম্পানি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এজিএম করতে ব্যর্থ হলে বা লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ হলে বা ছয় মাস ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বা পুঞ্জীভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধনকে ছাড়িয়ে গেলে ওই কোম্পানির শেয়ারকে জেড ক্যাটাগরিভুক্ত হবে।

এখানে নির্ধারিত সময় বলতে প্রতিবছর কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরিচালনা পর্ষদে গ্রহণ এবং তার ভিত্তিতে লভ্যাংশ ঘোষণা করতে হবে, তা আইন ধারা নির্ধারিত সময়কে বলা হয়েছে। আগের সব বছর লভ্যাংশ দিলে এবং এজিএম করার পরও সর্বশেষ বছরে ব্যর্থ হলেই স্টক এক্সচেঞ্জ ক্যাটাগরি পরিবর্তন করত। ডিএসইর কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালে কমপক্ষে দুই বছর লভ্যাংশ না দিলে ক্যাটাগরি নির্ধারণে আদেশ দেয় এসইসি। কিন্তু ওই আদেশটিও কার্যকর করতে দেয়নি। ফলে বছরের পর বছর লভ্যাংশ না দিয়ে, এমনকি বন্ধ থাকার পরও কিছু কোম্পানি ভালো ক্যাটাগরির (এ বা বি) হিসেবে লেনদেন হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত