চারদিকের ঝলমলে আকাশ দেখে কে বলবে যে বৃষ্টি হবে, তবুও কখনো হয়। নরেন্দ্র মোদির নির্মেঘ আকাশ আপাতত ঝলমলে হলেও, খুব ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে- ঈষাণ কোণে এক চিলতে মেঘ কিন্তু জমছে। আগামীতে কী হবে, এখনই বলা মূর্খের কাজ। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অশ্বমেধ ঘোড়ার হোঁচট খাওয়ার দুটি সম্ভাবনা খেয়াল করলে আপনিও বুঝতে পারবেন। অনেক খবর, করপোরেট শাসিত মিডিয়ার দৌলতে আমি আপনি জানতে পারি না। কিন্তু পারি না বলেই যে তা ঘটছে না, তা তো নয়।
দিল্লিতে কয়েক হাজার আইনজীবী ইভিএম কারচুপির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই পথে নেমেছেন। বিহারে নীতিশ কুমার সরকারের বিপক্ষে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন হাজার হাজার সরকারি স্কুল শিক্ষক। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের সমীক্ষায় সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিক স্বাধীনতায় ১৮০টি দেশের মধ্যে ‘বৃহত্তর গণতন্ত্রের’ দেশ ভারতের স্থান গত বছর ছিল ১৬১তম। যা আগে কখনো ছিল না। এ বছর ছবিটা যে পাল্টাবে না তা নিশ্চিন্তে বলে দেওয়া যায়। ফলে, এক চিলতে মেঘ যে জমছে তা চট করে, মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার শাসকভজনার চিৎকারে সেভাবে নজর পড়ছে না। অথচ খোদ শাসকদের ইতিমধ্যেই কপালে ভাঁজ ফেলেছে, দিল্লির অদূরে নতুন উদ্যমে কৃষক সংগঠনের জমায়েত দেখে। এই কৃষকদের আন্দোলন দুবছর আগে মোদি সরকারকে বাধ্য করেছিল কিষান জনতার দাবির কাছে নতিস্বীকার করতে। যথারীতি সেই মেনে নেওয়া যে নিতান্তই প্রতিশ্রুতি তা পরিষ্কার হয়ে যেতেই কৃষকরা ফের যুদ্ধংদেহী মেজাজে লংমার্চের পথে। সরকার যে তাদের ভয় পাচ্ছে তা তাদের কার্যকলাপ দেখেই স্পষ্ট। আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে দিল্লির প্রবেশপথের চতুর্দিকে। ড্রোনের সাহায্য আকাশ থেকে আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে ভারতের নিরস্ত্র অন্নদাতাদের ওপর। জলকামান, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ কিছুই আর বাদ নেই কৃষকদের ঠেকাতে। গত বছরের কৃষক আন্দোলন খুব কাছ থেকে দেখেছি বলে জানি, এ রকম দমন-পীড়ন করে মূলত জাঠ, গুজ্জর, শিখ, হরিয়ানভি কৃষকদের দমন করা সরকারের পক্ষে সহজ কাজ নয়।
কৃষক বিদ্রোহ শুধু বিজেপির ভোট ব্যাংকের অনেক হিসেবনিকেশ বদলে দিতে পারে বলে সরকার উদ্বিগ্ন হচ্ছে তা নয়। আসলে ঐক্যবদ্ধ এই কৃষক চেতনা সংঘ পরিবারের ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিরোধ। হরিয়ানা, রাজস্থান সীমান্তে মেওয়াদ বলে এক গ্রাম আছে। মেওয়াদ মুসলিমপ্রধান। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর তীব্র আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েছিল মেওয়াদের জনজীবন। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। জীবনের শেষ প্রকাশ্য জনসভায় গান্ধীজি ডাক দিয়েছিলেন শান্তির। ঘৃণার বদলে ভালোবাসার। বলেছিলেন, মেওয়াদের মাটিতে ফের দাঙ্গা শুরু হলে আমি বুক দিয়ে তা প্রতিহত করব। ঘটনাচক্রে ওই সভার কিছুদিন বাদেই মহাত্মা গান্ধী খুন হয়েছিলেন চরম হিন্দুত্ববাদী নাথুরাম গডসের হাতে। অনেকেরই ধারণা যে, মেওয়াদের সংখ্যালঘুদের পাশে থাকার কারণেই জীবন দিতে হয়েছে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মেওয়াদের জনগণ কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। শত শত শহীদ হয়েছিলেন মেওয়াদবাসীরা। তবুও গডসের ভক্তদের হাতে ক্রমেই অন্ধকার নামছিল গুড়গাঁওয়ের জনপদে। গরু ব্যবসায়ী পহলু খান খুন হয়েছিলেন। রাতবিরেতে হিন্দুত্ববাদীদের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল মেওয়াদে। জনজীবন হয়ে পড়ছিল দুর্বিষহ। এমন অবস্থায় কৃষক আন্দোলন। কেন এত বিস্তারিত বললাম মেওয়াদের কথা? কারণ, কৃষক বিদ্রোহের সময় সেখানে গিয়ে বুঝেছিলাম যে শিখ-জাঠ, গুজ্জর, মুসলিম ঐক্যে ভীতসন্ত্রস্ত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি পালাতে বাধ্য হয়েছিল। স্বাভাবিক জনজীবন ফিরে এসেছিল মেওয়াদের গ্রামে। ঠিক সে কারণেই লোকসভা ভোটের আগে সংগঠিত কৃষক জাগরণকে ভয় পেতে শুরু করেছে মোদি সরকার। বিজেপির হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান স্লোগান বদলে দিতে জানে এ দেশের কৃষকরা। ঠিক সেই আশঙ্কাতেই সামনে না হলেও গোপনে কপালে ভাঁজ পড়েছে বিজেপি নেতাদের।
তবে তারচেয়েও বেশি বিপদ আসতে পারে ভারতের নাগরিক আইনের বিবিধ জটিলতার কারণে। ভারত সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে কোনো নাগরিকই একশো শতাংশ নিশ্চিত নন, তিনি নাগরিক কি না। নিজভূমিতে পরবাসী হওয়ার নজির অন্য কোথাও রয়েছে বলে আমি অন্তত জানি না। ১৯৫৫-এর যে স্বাভাবিক নাগরিকত্ব আইন ছিল, তাতে লেখা ছিল এদেশে জন্মগ্রহণ করা অথবা বাবা বা মার জন্মস্থান হলেই সে ভারতের নাগরিক। ২০০৩ সাল থেকে নানা সময় স্বাভাবিক নাগরিকত্ব আইন সংশোধিত হতে হতে ইদানীং তা এক জটিল প্রক্রিয়া ও জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
সহজ করে বললে, সাধারণ নাগরিক আইন থাকলে দেশের সীমানার মধ্যে শিশু জন্মালেই সে নাগরিক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই নিয়ম অনুযায়ী নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদেও এই অধিকার স্বীকৃত। ভারতের মূল নাগরিকত্ব আইনেও এই অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ১৯৮৬ সালে সংশোধিত ধারায় বলা হলো যে, ১. ০৭ .১৯৮৭ বা তার পরে যাদের জন্ম, তাদের বাবা অথবা মা একজন ভারতীয় নাগরিক হলেই শিশু নাগরিক অধিকার পাবে। ২০০৩-এ আবার আইনে সংশোধন আনা হলো। এরকম ভাবে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, কয়েক বছর ধরে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা শাসক বিজেপির আর এক রাজনৈতিক কৌশল। এনআরসি বা নাগরিক তালিকাপঞ্জির প্রাথমিক প্রয়োগ হয় আসামে। সেখানে ১৯ লাখ ভোটার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাদের কাগজপত্র ঠিক নেই, এই অজুহাতে। ভোট এলেই এই নাগরিকত্ব আইন নিয়ে একধরনের ব্ল্যাকমেইলিং পলিটিকস করতে থাকে সরকারি দল। লক্ষ্য হচ্ছে, নাগরিক করে দেওয়ার কথা বলে মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু ভোট নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা। আইন এনে ঘোষণাও হয়েছে যে পড়শি দেশ থেকে ধর্মীয় কারণে চলে এলে আবেদন করলে তারা নাগরিক হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
এভাবে বিভিন্ন কৌশলে ধর্মীয় বিভাজনকে অবলম্বন করে ভোটের ময়দানে নামতে সক্রিয় বিজেপি। কিন্তু মজা হচ্ছে, আসামের যে এগারো লাখ লোক বে-নাগরিক হয়ে গেছেন তাদের অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ফলে এই বিভাজনের রাজনীতি বুমেরাং হয়ে আগামীতে শাসকদের ভয়ংকর বিপদে ফেলতে পারে, এ সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
