শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনই বড় আশার জায়গা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:২৪ এএম

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের বিশ্লেষক বদরুদ্দীন উমর। তার লেখনী ও বিশ্লেষণে ফুটে উঠেছে দেশের রাজনীতির গতিধারা ও প্রকৃতি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে অধ্যয়ন করা উমরের লেখালেখিতে একাডেমিক নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে গভীরতা ও মানুষের প্রতি মমত্বের যে মিশ্রণ, তা আমাদের অঞ্চলে বিরল। এই কারণে নব্বই বছর অতিক্রম করার পরেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে উমরের আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে সাইদ জুবেরী ও সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ ‘আন্দোলন’ বিশেষ সংখ্যা উপলক্ষে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেখানে তিনি আলাপ করেছেন বহু বিষয়। উনার সেই অকপট ও স্পষ্ট আলাপের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা : উমর বলেন যে, খবরের কাগজের ভাষা নির্বাচনের পর পালটে গেছে। নির্বাচনের আগে সমালোচনা করলেও এখন আর কেউ সরকারের বিরুদ্ধে লিখছে না। ক্ষমতাসীনরা হয়তো মনে করছে যে তারা স্টেট মেশিন নিয়ন্ত্রণ করে চালিয়ে যাবে। এই করতে গিয়ে নিজেদের সংগঠনেই ধস নামিয়েছে। নিয়ম হচ্ছে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাকে দল থেকে বের করে দেওয়া। অথচ আমরা দেখি তারা বিদ্রোহী প্রার্থীদের আলিঙ্গন করেছে। অর্গানাইজেশন ভেতর থেকে ভেঙে গেছে। এই সংকটে কদ্দিন থাকতে পারবে কে জানে, তবে এর ফলাফল ভালো হবে না।

বাংলাদেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ি নয় : বাংলাদেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। চীন এবং ভারত উভয়েই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নিয়ে খেলা করছে। বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝোঁকায় ভারত খেপে যাচ্ছে। তবে, ভারতই এখানে হরেদরে নিয়ন্ত্রণ করে। মুখে বন্ধুরাষ্ট্র বললেও ইন্ডিয়া বাংলাদেশকে কিছুই দেয়নি। তিস্তার পানি, ট্রানজিট, সীমান্ত, বিনিয়োগে সুবিধা নিয়েছে। তাদের কাছে বাংলাদেশ ক্ষমতাহীন। অন্যদিকে চীনের বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। সব মিলিয়ে একটা ভজঘট অবস্থা।

তবে, চীনের সাম্রাজ্যবাদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যরকম। এর পেনিট্রেশন মূলত ইকোনমিক। বিজনেস দিয়ে এরা এখানে ঢুকবে। ইকোনমি দিয়ে এরা নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে এমনকি কোনো চীনা পার্টিও হবে না। চীনের কৌশল পুরোই আলাদা। তারা তাইওয়ান ছাড়া অন্য কোথাও শক্তি প্রয়োগ বা দখলে যাবে না। বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) দিয়ে তারা বিপুল এলাকায় প্রভাব রাখবে। বাংলাদেশে নতুন নতুন বন্দর হবে। প্রত্যেক দেশই চেষ্টা করবে একটা করে বন্দর স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণ করতে। ক্ষমতাসীনরা এখনো জোড়াতালি দিয়ে চালাচ্ছেন তবে জনগণ আসলে কী করবে সেটাই বিবেচ্য।

জণগণই সব ক্ষমতার উৎস : তবে উমর মনে করেন, বাইরের কোনো শক্তি ক্ষমতাসীনদের পতন ঘটাতে পারবে না। পারলে পারবে জনগণ। সরকারও টের পাচ্ছে। কিন্তু কেউ আটকাতে পারবে না। এখানে ক্ষমতাসীনদের লোভের হাত থেকে নদী, বন, পাহাড় কিচ্ছু ছাড় পাচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো এত চুরি আর কোথাও হয় না। এই রোগ দেশকে মুমূর্ষু করে তুলছে। যত প্রকল্প নেওয়া হয় তার মূল উদ্দেশ্য চুরি। এগুলো নেওয়াই হচ্ছে যাতে চুরির ভাগ করা যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে উন্নতি তা খেয়ে দিচ্ছে চুরি। এই চুরি শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে না, একেবারে গভীর পর্যন্ত ছড়াচ্ছে। সবাইকে ভাগ দেওয়ার একটা ব্যবস্থা হচ্ছে এই চুরিতে।

নদীর জায়গায় হয়তো বিল্ডিং হচ্ছে। সরকার ভেঙে দিচ্ছে। কিন্তু আবার গড়ে তুলছে। নিয়ম হওয়া উচিত, সরকারের টাকায় না ভেঙে অপরাধীর টাকায় অবৈধ স্থাপনা ভাঙার। কিন্তু যারা ভাঙে আর অবৈধভাবে যারা গড়ে- এদের মধ্যেও যোগসাজশ রয়েছে। এই নালা থেকে সরকারের জন্যও বের হওয়া কঠিন। 

কিন্তু আমাদের একটা জরুরি ব্যাপার মনে রাখতে হবে। তা হচ্ছে গ্রামের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। সাধারণ পুলিশ, সেনাবাহিনীর লোকেরা গ্রাম থেকে এসেছে। এমনকি আমাদের আমলাদের অনেকেরই গ্রামের সঙ্গে দৃঢ় যোগাযোগ। এই নাড়ির টান কেবল আবেগি নয়, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক। বাংলাদেশের মতো লাখ লাখ লোক ছুটিতে গ্রামে যায় না। ইন্ডিয়ায় এমন হয় না। সেখানকার লোকেরা টুরিস্ট স্পটে যায়, বিদেশ যায়। গ্রামে যায় না। কিন্তু, আমাদের এই যোগাযোগ এখনো খুব শক্ত। এই যোগাযোগ শাসক গোষ্ঠী উপেক্ষা করতে পারবে না। ভবিষ্যতে এই যোগাযোগ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে আন্দোলন জমাতে।

ইসলামপন্থিরা রাজনীতির মূলধারা হতে পারবে না : উমর মনে করেন এই দেশে কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। মুসলিম লীগের মতো হিন্দুবিদ্বেষ নেই। এই দেশে যারা ইসলামপন্থি তারা মূলত মৌলবাদী। তারা ইসলামি আইন কায়েম করতে চায়। কিন্তু এদের নিজেদেরই ইসলাম নিয়ে জ্ঞান নেই। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে বেশিদূর যাওয়া যাবে না। জামায়াতে ইসলামীর অবস্থা দেখেই বোঝা যায়। এদের হয়তো কিছু ভোট আছে। এই ভোটের জন্য বড় দলেরা এদের তৈলমর্দন করে। কিন্তু এর বেশি কিছু না।

বাংলাদেশে বামপন্থিদের নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, উমর কেবল এক লাইনে বলেন, এদের নিয়ে আলোচনার কিছু নেই।

সংসদীয় রাজনীতি দিয়ে কতদূর যাওয়া যাবে : মার্কসের দর্শনে বিশ্বাসী উমরের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা আছে। তিনি মনে করেন, শাসকদের নানা অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে নিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় বিশ্বাসী বিরোধী দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিপ্লবী পার্টি না হলেও এদের বিপুল জনপ্রিয়তা আছে এবং এরা দেশের জনগণকে নিয়ে আন্দোলন গড়তে পারে। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে উমর বলেন, সেখানে মানুষ সরকার পতনের আন্দোলনে সফল হলেও, শেষতক নিজেরা ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তিনি আরও মনে করেন আমাদের অবস্থা শ্রীলঙ্কার থেকে খারাপ হলেও কাঠামোগত রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বের প্রশ্নে শ্রীলঙ্কার ঘটনা আমাদে জন্য বড় শিক্ষা। পাশাপাশি তিনি এটা মনে করেন যে, বাংলাদেশের সরকার শ্রীলঙ্কার সরকারের চেয়ে শক্তিশালী, ফলে পরিস্থিতি তেমন হবে না।

সংসদের প্রায় সবাই অসৎ : উমর মনে করেন বাংলাদেশে এখন চলছে লুটেরা শাসন। এই ব্যবস্থায় যারা সংসদে নির্বাচিত হয় তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে অসৎ। নানাভাবে লুটপাট করে সম্পদের পাহাড় বানিয়ে এবং সেই সম্পদ রক্ষা ও বৃদ্ধিতে তারা রাজনীতিতে সক্রিয় হয় এবং পরিশেষে সংসদে জায়গা করে নেয়। সেই ক্ষমতার জোরে, প্রশাসন আর পুলিশসহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে তারা অবাধে লুট করছে। তবে তিনি মনে করেন, এমন অবস্থা সারা জীবন থাকবে না। এখন হয়তো আন্দোলন হবে না, কিন্তু লোকের মধ্যে ব্যাপক বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। যার প্রকাশ ঘটবে এবং তখন সরকার তার মেশিনারি নিয়েও কিছু করতে পারবে না।

এই ব্যাপারে তিনি মুসলিম লীগের উদাহরণ টানেন। প্রবল ক্ষমতাশালী মুসলিম লীগ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারা নানাভাবে জোর করে ক্ষমতায় থাকলেও গণঅভ্যুত্থানে দলটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় আশা : উমর মনে করেন শ্রম আন্দোলনে বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ যাদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। আমরা গার্মেন্ট শ্রমিকদের দিকে যদি দেখি তবে দেখব এদের রোজগার অন্য দেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের তুলনায় খুবই কম। পাকিস্তান বলি, ভিয়েতনাম বলি, সেসব দেশের পোশাক শ্রমিকরা অনেকগুণ মজুরি পায়। আমাদের এই শ্রমিকরা তাও পায় না। ফলে উনাদের ক্ষোভ আছে। এদের চেয়েও খারাপ অবস্থা চা বাগানের শ্রমিকদের। এদের দৈনিক মজুরি একেবারেই কম। কিন্তু এরা না মুসলিম না বাঙালি। এই কারণে উনাদের দিকে কেউ তাকায় না। তাদের নিয়ে আন্দোলন হয় না।

শ্রমিকরা এসব ক্ষোভ থেকে মাঝে মাঝেই বিক্ষোভ করে। গাড়ি-ঘোড়া ভাঙে, রাস্তায় নেমে আসে। এরা এছাড়া আর কী করবে? এদের তো যথাযথভাবে কথা বলার সুযোগই নেই। ট্রেড ইউনিয়ন নেই। শ্রমিক নেতা নামে যারা আছে বেশিরভাগই মালিকপক্ষের দালাল। কিন্তু, এই অবস্থা চিরকাল চলবে না। একটা পর্যায়ে এই মানুষগুলো আরও খেপবে।

তখন সেই আন্দোলন সশস্ত্র হবে না অন্যরকম কিছু হবে তা এখনই বলা যায় না। তবে শ্রমিকরা এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের সুযোগ আছে সামনের দিনে বড়সড় আন্দোলন করার। তারা আন্দোলন জমাতে পারলে তখন অন্য রাজনৈতিক শক্তিরাও যুক্ত হবে। যারা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করতে চান তারা মাঠে নামবেন।

সাম্রাজ্যবাদ আমাদের মতো গরিব দেশ থেকে লুট করে সেসব দেশের শ্রমিকদের কিছুটা ভাগ দেয়। তাদের চুপ রাখে। ফলে এখন আন্তর্জাতিক আন্দোলনের কোনো সুযোগ নেই। নিজের দেশে আগে আন্দোলন করতে হবে।

উমর মনে করেন, এই দেশে সামরিক সরকারের আমলে যেভাবে অত্যাচার হয়েছে তার চেয়েও বেশি হচ্ছে বেসামরিক আমলে। এরশাদ আমলে অনেক চুরি দুর্নীতি হয়েছে কিন্তু ৯১ সালের পর থেকে যে অবস্থা চলছে তা সামরিক শাসনের চেয়েও খারাপ। হয়তো শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন আবার পারে এই দেশের মানুষকে সত্যিকারের মুক্তির স্বাদ দিতে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত