সামাজিক আন্দোলন

আন্দোলনগুলো স্তিমিত হয়ে এসেছে

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:২৬ এএম

যে কোনো দেশের জাতি গঠন ও তার অগ্রগতিতে সামাজিক ও নাগরিক আন্দোলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি দেশ বা জাতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ, যারা সে দেশের নাগরিক এবং তাদের নিয়েই সে দেশের সমাজ। যদিও প্রচলিত ইতিহাস সাধারণত রাজরাজড়ার গল্পই বলে থাকে, প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসে যা কিছু ঘটে তার পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হচ্ছে মানুষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংঘবদ্ধ মানুষ। আর যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছেন মানুষ কখনোই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয় না যতক্ষণ সে সামাজিক না হয়ে ওঠে। একেকজন সামাজিক মানুষই পারেন সম্মিলিত শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আন্দোলনের বিপরীতে রয়েছে স্থবিরতা। একটি স্থবির সমাজের পরিণতি বন্ধ্যত্ব। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর স্বপক্ষেই সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

শুরু করতে পারি স্বাধীনতাপূর্ব ভাষা আন্দোলনের আলোচনা দিয়ে। ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছি রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে আন্দোলনের মিছিলের ওপর গুলি বর্ষণ হয়েছে এবং তার ফলে কয়েকজন ছাত্র নিহত হয়েছে শুনে আমাকে কোলে করে তৎক্ষণাৎ তিনি ছুটে গেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিলকারীদের খবরাখবর নিতে। আমি তখন দুই বছর বয়সের শিশু। সেই যে মায়ের সঙ্গে একুশের যাত্রার শুরু, সে যাত্রা আজও তীর্থযাত্রার মর্যাদায় মননে গেঁথে রয়েছে। স্মৃতির পথ ধরে যতদূর যেতে পারি, মনে পড়ে শীতের তীব্রতা কমে হালকা ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ নিয়ে ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার ছেলেমেয়েদের দল বেঁধে নগ্নপায়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গাইতে গাইতে আজিমপুর গোরস্তান ঘুরে শহীদ মিনারে এসে ফুল দিয়ে আবার হেঁটে হেঁটে বাড়িতে ফিরে আসার কথা। তখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ফুল পাওয়া যেত না। পাড়া-প্রতিবেশীদের উঠানে সযত্নে লালিত ফুলগাছ থেকে চেয়ে নেওয়া, আবার কখনো চুরি করে জোগাড় করা ফুলের তোড়া নিয়ে প্রভাতফেরি করে সেই ফুল ভাষাশহীদদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শীতকাল বলে অধিকাংশ বাগানে মূলত গাঁদা ফুলেরই প্রাপ্যতা, কিছু শৌখিন ব্যক্তির বাগানে কসমস, ডালিয়া, জিনিয় মৌসুমি ফুল বলে পরিচিত ফুলের হাতছানি। তবে সেই সমস্ত ফুলের পাহারাদারীও ছিল কড়া। বহু কষ্টে সেগুলো জোগাড় করতে হতো। সে জন্য আগের সন্ধ্যা থেকে কত পরিকল্পনা, কত কৌশল নির্ণয়। তখন তো ছিল না কে আগে ফুল দেবে তার হুড়াহুড়ি অথবা মোবাইলে নিজের ফুল দেওয়ার ছবি তুলে রাখার তাগিদ। ফুল যিনি দিচ্ছেন তার চেয়ে যাদের ফুল দেওয়া হচ্ছে তারাই ছিলেন এ যাত্রায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, মুখ্য। মনে আছে একুশের গান গাইতে গাইতে চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠত। বুকের ভেতর অদেখা শহীদদের জন্য স্বজন হারানোর ব্যথা বেজে উঠত। তাদের কাছে যাওয়া যেন ছিল নিজের পানেই ধাওয়া। তাদের মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনে নেওয়ার প্রয়াস।

একুশে ফেব্রুয়ারি তো শুধু বিশেষ দিনে, বিশেষ পোশাকে বিশেষ স্থানে ফুলের তর্পণের অগভীর আচার মাত্র নয়। একুশে আমার কাছে নিজেকে চেনার, নিজেকে জানার বোধন। নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবির  ভেতরেই অন্তর্নিহিত ছিল সেই নিজেকে বুঝে নেওয়ার।  নিজেকে চিনে নিয়ে একের অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এসব কর্মকা-ের একটা আদর্শিক ভিত্তি ছিল। এমনি করেই ধীরে ধীরে একটা জাতিতে পরিণত হওয়ার যাত্রার শুরু। যে যাত্রা আমাদের পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ অবধি। আমরা বলি সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল একটি জাতির, যে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। এমন একটি ঘটনার জন্য জাতিকে হতে হয়েছিল রাজনৈতিকভাবে  ঐক্যবদ্ধ, যা সম্ভব হয়েছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলে। একই সমাজে বাস করতে হলে সেই সমাজের মানুষদের একে অপরের সঙ্গে পথচলার কিছু শর্ত তৈরি করতে হয় যে শর্ত প্রতিটি মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে মূল্যবান মনে করে। যেখানে বিভেদ বা বৈষম্যের অবকাশ থাকে না। সেই শর্তগুলোকেই সেই সমাজের আদর্শ বলে চিহ্নিত করা হয়। সেই শর্তে পরিচয়ের ভিন্নতার কারণে সেখানে কারও অধিকার খর্বিত না হয়ে বিশ্বাস, চিন্তা, নিজেকে প্রকাশ করার ভঙ্গিতে বৈচিত্র্য থাকবে, নানা মত, নানা পথ থাকবে সেটাই একটি পরিশীলিত জাতির সৌন্দর্য। একাত্তর পর্যন্ত  আমাদের জাতির সেই ধাপগুলো তৈরি করে দিয়েছিল ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলো। জাতি, ধর্ম, বর্ণ,  নারী-পুরুষ নির্বিশেষে  কে কোথায় জন্মগ্রহণ করেছে সব প্রশ্ন ছাপিয়ে একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তার যে পরিচয়ের প্রাধান্য, যে কারণে তার যে সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রাপ্য সেই বোধটি ক্রমশ জাতিবোধের সংস্কৃতিতে সঞ্চারণের কৃতিত্ব কিন্তু মূলত সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোকেই দিতে হবে। সেই আন্দোলনগুলো নিজেকে একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ও জোরদার হয়েছে রাজনৈতিক আন্দোলনের হাত ধরে। যখন একটি দেশের মূলধারার প্রগতিশীল রাজনীতি মানুষের মুক্তির প্রক্রিয়াকে ধারণ করে এবং সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত অন্য সব আন্দোলনকে একই লক্ষ্যে ধাবিত করার যোগ্যতা অর্জন করে তার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে তখনই সেই সমাজের কাক্সিক্ষত রূপান্তর ঘটে। প্রায় তিন দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনীতি সচেতনভাবে সেটাই সাধন করেছে।  তাই আটচল্লিশ থেকে একাত্তর আমাদের সামাজিক ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন উত্তরণের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের বিরাট এক মাইলফলক হচ্ছে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন। এ দেশের মানুষের অভিজ্ঞতায়  গণতন্ত্রের জন্য এত বড় আন্দোলন আর ঘটেনি। গণ কথাটার মাঝেই নিহিত ছিল জনগণ অর্থাৎ দেশের জনগোষ্ঠী যারা সে দেশের নাগরিক, যারা এই আন্দোলনকে নিয়ে গেছিল মুক্তিযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। তাই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সত্যিকার অর্থেই ছিল জনগণের যুদ্ধ কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর নয়।

একাত্তরে আমরা এসে দাঁড়ালাম বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির সূর্যতোরণের সামনে। স্বাধীনতা-পরবর্তী কিছু সময় জাতির কেটেছে একাত্তরের গণহত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতি কাটিয়ে স্থিত হওয়ার প্রয়াসে। দেশের  ভেতরে-বাইরে নানা বৈরিতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক ও সামাজিক এবং পরিবেশ আন্দোলন বহমান থেকেছে  আপন গতিতে। দেশ পুনর্গঠন, যুদ্ধাক্রান্ত নারী ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন, একটি সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণে ঠিক মুক্তিযুদ্ধের মতোই যে যেভাবে পেরেছে এগিয়ে এসেছে। একের পর এক তৈরি হয়েছে বেসরকারি সংগঠন, যারা সরকারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। আজকের পরিসরে তাদের বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশ নেই। তবে এ কথা মানতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, অনেক কিছুর সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন, একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া, শিশু ও নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সম্পদ ও ভূমির সুষম বণ্টন, সবার জন্য সমান আইন নিয়ে আলোচনা ও কর্মপরিকল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা করে। সরকার এর সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরযোগ্য সম্পর্কের কারণেই দেশের দিকনির্দেশনায় নাগরিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে।

একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা সেটা মেনে নিতে পারেনি। যুদ্ধোত্তর অস্থিরতার সুযোগে তাই ঘটে যায় পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের মতো নির্মম ঘটনা। বাংলাদেশ প্রবেশ করে সাম্প্রদায়িক সামরিকতন্ত্রী আর ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের আঁতাতের শাসনামলে, যা অন্তত বিশ বছর বাংলাদেশকে সরাসরি মুক্তিরূদ্ধির চেতনার বিপরীতে চালিত করে। এমতাবস্থায় ঘোষণা দিয়েই নাগরিক অধিকার স্থগিত করা হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার বা প্রান্তিকজনের মর্যাদা সেখানে অগ্রাধিকার পায় না। ক্ষমতা দখল করে তা কুক্ষিগত করার কৌশলই হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতির মূল লক্ষ্য। ফলে সমাজ হয়ে পড়ে অচল, নাগরিকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সেই সময়ে নারী নির্যাতন প্রকট রূপ ধারণ করাতে নারীরা মরিয়া হয়ে আন্দোলন শুরু করে এবং নারীর সুরক্ষায় দুটি আইন প্রণয়নে সরকারকে বাধ্য করে। অন্যান্য আন্দোলন প্রায় স্থগিত রূপ ধারণ করে। আশির দশকের মাঝামাঝি মানুষ প্রতিবাদী হতে শুরু করে। মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার ও সামাজিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠতে থাকে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সমাজকর্মী, ছাত্র-জনতা সবাই মিলে গড়ে তোলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এবারও রাজনৈতিক শক্তিগুলো নাগরিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল। পতন ঘটল স্বৈরাচারী শাসকের। জনগণ গণতন্ত্রের অভিযাত্রার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুক্ত নির্বাচন আন্দোলনে নেতৃত্বে দেখা গেল নাগরিক সমাজকেই। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজের প্রচন্ডরকম দলীয় বিভাজন ঘটাতে এরপর থেকে আর সামগ্রিকভাবে কোনো সামাজিক বা নাগরিক অধিকার গড়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ কিছুটা সর্বজনীনতা অর্জন করতে পারলেও বিভাজিত রাজনীতির কারণে তা বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় নেই।

এর পরের প্রতিটি আন্দোলনকেই নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির আন্দোলন বিশাল আকার ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু তার ফসল তুলতে অপেক্ষা করতে হয় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার জন্য। কারণ আন্দোলনের সূচনালগ্নে ক্ষমতাসীন দলের অংশীদার ছিল যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দল ও কতিপয় ব্যক্তি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারে একমত হওয়া  সত্ত্বেও প্রথম শাসনামলে এর বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেনি। এর জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ‘গণজগরণ মঞ্চে’র মতো আর একটি সামাজিক আন্দোলন। এখানে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনটির কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন, কারণ বন-পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বের কোথাও হরতালের মতো কর্মসূচি পালিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। সুষ্ঠু নির্বাচনের শর্ত হিসেবে আওয়ামী লীগ অনুসৃত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রবর্তনের আন্দোলন জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে সফলতা পায় ঠিকই, কিন্তু মূলত সেই আন্দোলনের পক্ষ-বিপক্ষ বিভক্তি স্পষ্টতই প্রতীয়মান ছিল। লক্ষণীয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক গোষ্ঠী এর বিরোধিতা করেছিল তাদেরই আন্দোলনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যা প্রত্যাখ্যাত হয় এই ইস্যুর প্রবক্তাদের দ্বারাই। বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থকে খাটো করে নাগরিক বা সামাজিক আন্দোলনকে দলীয় বা পারিবরিক স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে তার অবমূল্যায়ন প্রণিধানযোগ্য। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের নৈতিক দৃঢ়তা যখন দুর্বল হতে শুরু করে তখন নাগরিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন অবক্ষয়ের শিকার হতে বাধ্য। 

বাংলাদেশের সমাজ যখন থেকে সাধারণভাবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকেই  রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে মেনে নিতে এবং তাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে তখন থেকেই ধীরে ধীরে এ দেশের এত বলিষ্ঠ, এত সোচ্চার পরিবেশ, নাগরিক ও সামাজিক আন্দোলনগুলো স্তিমিত হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো ক্রমশ যে কোনো আন্দোলনকে তাদের স্বার্থের আনুকূলে যাবে না বলে মনে করে তাদের নস্যাৎ করে দিতে যে কোনো উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধা বোধ করে না। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আলোড়ন সৃষ্টিকারী নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, নাগরিক ও সামাজিক আন্দোলন তখনই গতি পায় এবং সফল হয় যখন মানবকল্যাণমুখী রাজনৈতিক শক্তি তার সঙ্গে যুক্ত হয়। বাংলাদেশে এখন তারই প্রকট অনুপস্থিতি। তারপরও মানুষ থেমে থাকে না। নানাভাবে এখনো এ দেশের সমাজ সচেতন নাগরিকরা শত ঝুঁকি মাথায় নিয়েও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গড়ার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী স্বার্থের ঊর্ধে উঠে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাপূর্ণ, অসাম্প্রদায়িক, দুর্নীতিমুক্ত, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমাজ গঠনে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। একুশের ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর এবং তারও পরবর্তী সময়ে যাদের রক্তের ঋণের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তাদের কি আমরা ভুলে যেতে পারি?

লেখক : মানবাধিকারকর্মী, অ্যাডভোকেট, টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত