অসংখ্য কালজয়ী ভাব-গানের স্রষ্টা লোককবি বিজয় সরকার (১৯০৩-১৯৮৫)। তার জন্ম বাংলাদেশের নড়াইল জেলার ডুমদি গ্রামে। পিতা নবকৃষ্ণ বৈরাগী ও মাতা হিমালয় কুমারী। ডুমদি গ্রাম নড়াইল শহর থেকে প্রায় চার মাইল দূরে অবস্থিত, যেখানে নাগরিক জীবনের কোনো সুবিধা ছিল না। যার কারণে বিজয় সরকারকে নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। এ সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় অহীন্দ্রকুমার বিশ্বাস বলেছেন ‘শুধু নগর সভ্যতা নয়, গ্রামীণ জীবনের সাধারণ চাহিদাটুকু পূরণের কোনো ব্যবস্থা যেখানে নেই, সেই অখ্যাত জলাভূমিতে প্রাণ মাতানো ভাইটালি (ভাটিয়ালি ) সুর ও বাণী নিয়ে যার আবির্ভাব সেই পল্লীমায়ের স্নেহের দুলাল বিজয় সরকার।’ (লোককবি বিজয় সরকার-স্মারকপত্র, ২০০৫)।
বিজয় সরকারের পড়ালেখার প্রতি অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি রাখতেন তার পরিবার। স্কুল জীবনেই তিনি বিয়ের গান ও জাগরণের গান গেয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় কবির পিতৃবিয়োগ ঘটে। কিছুদিনের মধ্যে পিতার কৃষিজমি হাটবাড়ির জমিদাররা নিলামে নিয়ে নেয়। এরপর কবিকে জীবিকার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়। জানা যায়, ডুমদি মধ্যপাড়া এলপি স্কুলে তিন বছরের মতো শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতার সীমাবদ্ধ জীবন কবিকে খুব বেশি আনন্দ দিতে পারেনি। তাই বাংলা ১৩৩২ সনে তিনি গোপালপুর হাটবাড়িয়ার জমিদারের কাছারির নায়েবের চাকরি নেন। কাছারি কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তার সংগীত চর্চা অব্যাহত রাখেন। ১৩৩৩ সনে ২১ বছর বয়সে বিজয় সরকার কবিগান শেখার জন্য কবিয়াল মনোহর সরকারের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার দুর্গাপুরে উপস্থিত হন। এখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন।
তালিম শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে কবিগান শেখার। পরবর্তী সময়ে তিনি বিখ্যাত কবিয়াল রাজেন্দ্রনাথ সরকারের কাছে কবিগানের তালিম নেন। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ১২ অগ্রহায়ণ গুরু মনোহর সরকারের অনুমতি নিয়ে কবিগানের দল গঠন করেন। বিজয় সরকার প্রায় চার হাজারের অধিক আসরে গান গেয়ে শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। ১৩৪২ সালে কলকাতা এলবার্ট হলে কবিগানের আসর বসে। এই আসরে বিজয় সরকার গান গেয়ে শ্রোতাদের মাতিয়ে দেন। কলকাতা শহরে নামডাক ছড়িয়ে পড়ে তার। এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিলেন রাজেন্দ্র সরকার। অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে এগিয়ে এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা ও কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দিন প্রমুখ। কবিগান শুরু হওয়ার আগে কবিগান ও কবিয়ালদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন কবি জসীম উদ্দীন। এরপর তিনি কলকাতার নানা জায়গায় কবিগান করেন। ১৯৩৭ সালের ১ অক্টোবর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ ভবনে কবিগানের আসরে যোগ দেন তিনি। এখানে কবিগানের বিষয় ছিল ‘স্ত্রী ও পুরুষ’। স্ত্রী লোকের পক্ষে ছিলেন বিজয় সরকার। এ আসরে বহু গুণী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, ধীরেন্দ্রনাথ সেন, শিল্পী আব্বাস উদ্দিন প্রমুখ। বিজয় সরকারের গানে সন্তুষ্ট হয়ে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একটি প্রশংসাপত্র দেন। তাতে লেখেন ‘আমরা শ্রীযুক্ত বিজয়কৃষ্ণের কবিত্ব শক্তি, শাস্ত্রজ্ঞান এবং বাগ্মিতা ও তদুপরি সংগীতজ্ঞতা দেখিয়া বিশেষ প্রীত লাভ করিয়াছি।’ এ থেকে ধারণা লাভ করা যায়, বিজয় সরকার কবিগানকে শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের কাছে শ্রুতিযোগ্য করে তুলেছিলেন। বিজয় সরকারের গানের উচ্চপ্রশংসা করে পল্লী কবি জসীম উদ্দীন বলেন, ‘মাঝে মাঝে দেশীয় গ্রাম্য গায়কদের মুখে বিজয়ের রচিত বিচ্ছেদ গান শুনিয়া পাগল হই। এমন সুন্দর সুর বুঝি কেহই রচনা করিতে পারে না।’ শুধু দেশি পন্ডিত ব্যক্তিরাই নয়, বিদেশি পন্ডিতরাও বিজয়ের গানের প্রশংসা করেছেন। এই প্রতিভাবান চারণকবি ১৩৩৬ সন থেকে ৫০ বছর কবিগান গেয়ে শেষ জীবনে অন্ধত্ববরণ করেন। পরবর্তীকালে ১৩৯২ সনের ১৮ অগ্রহায়ণ ১০.৫৫ মিনিটে এই মহাত্মা পাগল বিজয়ের দেহান্তর ঘটে।
তিনি এপার-বাংলা ওপার-বাংলা দুই বাংলারই মরমি গান এবং কবিগানের শক্তিশালী ভিত রচনা করেছেন। বিজয় সরকারের গান যেমন সাহিত্যগুণসম্পন্ন, তেমনই বিষয় ভাবনাও অভিনব। তার সৃজনশীলতার গভীরতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে বর্তমানে তিনি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। সমসাময়িক সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শান্তির আগমন ঘটাতে পারে বিজয় সরকারের গানের দর্শন। কেননা তার গানে মানুষকেই সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন। জাতি-ধর্ম বিষয়ে তার ধারণা খুবই স্বচ্ছ ছিল। কারণ নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকেই জাতি-বর্ণ বিভেদের অন্তঃসারশূন্যতা বুঝিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জন্মের পর মানুষ যে মৃত্যুপথে ধাবিত হয় সেই পথই একমাত্র অভিন্ন পথ। তাই তিনি তার গানে লিখেছেন ‘জাতি বলতে কী বুঝলে পন্ডিত মশাই, দেখি জগতে এক মানবজাতি দুই ভাগে বিভক্ত তাই’, ‘জাতি ভেদ মেনে হিন্দু দল, দিনের দিন গেল রসাতল’ অথবা
‘কেহ হিন্দু কেহ মুসলমান, কেহ বৌদ্ধ ইহুদি খ্রিস্টান
সৃষ্টির পানে দৃষ্টি দিয়ে স্রষ্টার প্রতি টান
ইহার মূলে নাই কিছু ব্যবধান, খুলে দেখ জ্ঞান নয়ন।’
এই মহাত্মার ১২২তম জন্মজয়ন্তী পালিত হবে আজ ৭ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ- ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার, ব্যারাকপুর মহকুমার কেউটিয়া গ্রামে কবির সমাধিস্থলে। মরমি কবি বিজয় সরকারের জন্মজয়ন্তী সফল হোক। তার গানের দর্শন ছড়িয়ে পড়ুক সব মানুষের হৃদয়ে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (সংগীত বিভাগ)
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
