বিশ্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি নৈসর্গিক সুন্দরবন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় তিন লাখ মানুষের রুটি-রুজির উৎস এই বন বছরের অধিকাংশ সময়ই থাকে অরক্ষিত ও অনিরাপদ। দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা হলেও জনবল সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে এই বনবিভাগ।
ইউনেসকো ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সুন্দরবনকে। একে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে সামুদ্রিক স্রোতোধারা, কাদাচর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই বন নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। জনবল সংকটে ক্রমেই অরক্ষিত হয়ে পড়ছে ইউনেসকো-ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এবং বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে সোমবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘জনবল সংকটে অরক্ষিত সুন্দরবন’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে সুন্দরবনে অপরাধ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনকে সুরক্ষিত করতে হলে প্রয়োজনীয় জনবল লাগবে। কিন্তু খুলনা অঞ্চলের সুন্দরবন বিভাগে জনবলের চিত্র হতাশাজনক। ১ হাজার ১৯০টি মঞ্জুরি করা পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৩২৩টি। সবচেয়ে বেশি শূন্য রয়েছে ফরেস্ট ও ডেপুটি রেঞ্জার, ফরেস্টার, সারেং, নৌকাচালক ও ইঞ্জিনম্যান পদ। ফরেস্ট রেঞ্জার ৩০ জনের ২৭ জন থাকলেও ডেপুটি রেঞ্জার পদে ৪৫ জনের একজনও নেই।
বিশেষজ্ঞ ও বনসংশ্লিষ্টদের অভিমত, জনবল সংকটে কার্যত সুরক্ষা পাচ্ছে না ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। বাঘ, হরিণ, মাছ শিকারসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটছে। বনবিভাগ সূত্র জানাচ্ছে প্রথম শ্রেণির মধ্যে উপবন সংরক্ষকের ৩টি পদের মধ্যে ১টি ও সহকারী বন সংরক্ষকের ৮টি পদের মধ্যে ৩টি শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যে ফরেস্ট রেঞ্জারের ৩০টি পদের ২৭টিই শূন্য।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির মধ্যে শূন্য রয়েছে কয়েকশ পদ। যে কারণে সুন্দরবনে চলছে যথেচ্ছাচার ধ্বংসযজ্ঞ। জনবল সংকটের কারণে বাঘ, হরিণ, মাছ শিকারসহ নানা অপরাধ ঘটছে। বন্যপ্রাণী পাচার, অবৈধভাবে বনে প্রবেশ, চোরাচালান, আগুন লাগানো ও বনজসম্পদ ধ্বংস ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে বনবিভাগ। মনে হয়, এখানে কোনো বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নেই।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে যেমন, ঠিক তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রথাগত বনজসম্পদের পাশাপাশি এ বন থেকে নিয়মিত ব্যাপকভাবে আহরণ করা হয় ঘর ছাওয়ার পাতা, মধু, মৌচাকের মোম, মাছ, কাঁকড়া এবং শামুক-ঝিনুক। বৃক্ষপূর্ণ সুন্দরবনের এই ভূমি একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড়প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী, শক্তি সম্পদের আধার এবং পর্যটনকেন্দ্র। এই ম্যানগ্রোভের একাংশ থেকে অন্য অংশে যেতে জলপথই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সুন্দর এই বন ঘিরে অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আবার সুন্দরবনে আশ্রয় নেয় অনেক অপরাধী। বনের কাঠ চুরি করে নিয়ে যায় দস্যুরা। হরিণ শিকার করে কেউ কেউ। কিন্তু বনবিভাগের জলযান তেমন নেই, যা রয়েছে তাও তেলের অভাবে চালানো যায় না। বিশাল ও দুর্গম এই বন রক্ষার কাজে নিয়োজিত বনবিভাগ, কোস্ট গার্ড, নেভাল, র্যাব ও পুলিশ। দুর্গম বনাঞ্চল রক্ষায় বনবিভাগের যেসব রক্ষী দায়িত্ব পালন করেন, তাদের জীবনই এখন অরক্ষিত।
সুন্দরবন সুরক্ষায় দায়িত্বে থাকা বনবিভাগের লোকবল সংকট প্রচুর। এ ছাড়া নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরে যাচ্ছেন। সেই অনুপাতে আবার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। এজন্য জনবল সংকটের ফলে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সম্পদ চুরি, অবৈধ মৎস্য শিকার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিগগিরই শূন্যপদে দ্রুত জনবল নিয়োগ হওয়া দরকার। যদি আমরা এই বনের জনবল সংকটকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বিবেচনা না করি তাহলে মর্মান্তিক পরিণতি অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতের জন্য।
