এখনকার যুদ্ধ ভেতরে বাইরে

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৫৬ এএম

গত শতকের ত্রিশের দশকের একটা ভয়াবহ কাহিনি শোনা যায়। জাপানের টোকিওতে এক বিশাল ভূমিকম্পের পর জাপানিরা সন্দেহ করে যে, কোরীয়রা লুটপাট শুরু করতে পারে। এ কারণে কোরীয় সন্দেহে লোকদের আটক করে।

আটককৃতরা আসলেই কোরীয় কিনা, এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য জাপানি পুলিশরা তাদের বলে জাপানি ভাষায় দশ ডলার পঞ্চাশ সেন্ট উচ্চারণ করার জন্য। এই উচ্চারণ করতে গেলে যে ঘোষবর্ণ দরকার হয়, যা কোরীয়রা জাপানিদের মতো উচ্চারণ করতে পারে না। ফলে সহজেই টের পাওয়া যায় কোরীয় কারা। এরপর সেই কোরীয়দের হত্যা করা হয়। অবশ্য এতে সীমান্ত এলাকায় জন্ম ভাষার দশা নেওয়া কিছু জাপানিও মারা যান, কারণ উনারা জাতে জাপানি হলেও উনাদের জাপানি উচ্চারণ কোরীয়দের মতোই ছিল।

জাপানের এই নির্মম গল্প নতুন নয়। যুগে যুগে এই ঘটনা ঘটেছে। প্রাচীন গ্রিসে এ ধরনের উপায়ে ভিন্ন জাতি লোকদের শনাক্ত করার কাহিনি শোনা যায়। অন্য সভ্যতাতেও প্রচুর উদাহরণ আছে। এমনকি, আমরা বাংলাদেশের মানুষরা কিন্তু একটু আলাপেই বুঝে ফেলি কার বাড়ি নোয়াখালী, কার চাটগা বা সিলেট।

ডায়ালেক্ট বা আঞ্চলিকতা গল্পটা দিয়ে শুরু করলাম ভাষার রাজনীতি বোঝার সুবিধার্থে। আরবি শিখতে গিয়ে জেনেছিলাম, আমরা আরবি ভাষা বলতে একটা ভাষা চিন্তা করলেও এই ভাষায় বহু ধরনের ডায়ালেক্ট আছে। মিসরীয় আরবির সঙ্গে সৌদি আরবের আরবির বিপুল পার্থক্য। আফ্রিকানদের সঙ্গে ফরাসিতে কথা বলতে গেলে মনে হয় পারিসীয় ফরাসির সঙ্গে বিপুল তফাত। ইংরেজির কথা তো বলাই বাহুল্য। অস্ট্রেলীয় ইংরেজি কিংবা ক্যারিবীয়দের ইংরেজি চোস্ত ইংরেজি জানা বাঙালদেরও বুঝতে কষ্ট হয়। বাংলার ব্যাপারে পরে আসছি।

আদতে, ভাষা একটি ভৌগোলিক রাজনীতির ব্যাপার। একেকটা দেশের ভৌগোলিক সীমানা এবং ইতিহাস ভাষা নির্ধারণ করে দেয়। আরবির উদাহরণটা যেমন দেওয়া হলো এর উল্টোটা হয়েছে ইউরোপে। লাতিন থেকে বহু বহু ভাষার উদ্ভব হয়েছে। ফরাসি, ইতালীয়, স্পেনিশ এদের মধ্যে প্রণিধানযোগ্য। আবার ইংরেজি, জার্মান, ডাচ এদের ভিন্ন মূল। সুইডিশ, পোলিশ, চেক ইউরোপে কত কত ভাষা। যদি ইউরোপের দেশগুলো অন্য কারও দ্বারা কলোনি হতো, দেখা যেত এই ভাষাগুলো হয়তো আলাদা হতো না। ডায়ালেক্টের বিপুল পার্থক্যের কারণে আমরা বাইরের লোকেরা এদের হয়তো এক ভাষা বলেই জানতাম।

ভৌগোলিক সীমানার আলাপে আবার ফিরি। প্রমথ চৌধুরী বলতেন বাংলা ভাষা নিহত হয়েছে সিলেট ও চাটগায়ে এসে। উনার আলাপটা সত্য এবং সমস্যাযুক্ত। সত্য এই কারণে যে, সিলেট এবং চট্টগ্রামের মানুষ যেই ভাষায় কথা বলে সেই ভাষা বাংলা কিনা এই নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে সমস্যাযুক্ত এ কারণে যে, উনার এই কথায় কেউ কেউ ইঙ্গিত দিতে চান এসব অঞ্চলের মানুষ ‘ভাষা বিকৃতি’ করেছে। এই বলে বাংলাকে আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

জাতি ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সেই আলোচনা কঠিন। কিন্তু চৌধুরীর আলোচনায় একটা বিষয়ের উদ্রেক করে। সিলেটি এবং চাটগাইয়াদের ভাষা নিয়ে লড়াইটা দ্বিমুখী। সিলেটিরা একদিকে নিজেদের নাগরী লিপি ও ভাষাকে রক্ষার জন্য লড়াই করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশি হিসেবে বাংলাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। লড়াইটা ভেতরের ও বাইরের। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে এই লড়াইয়ের মাত্রা নির্ধারিত হয়।

আবার, বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা অবাঙালি নানা নৃ-গোষ্ঠীর লড়াইটা ভিন্ন ধরনের। ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে থাকলেও অন্তত উনাদের ভাষা যে বাংলা নয়, এই ব্যাপারটা পরিষ্কার। কিন্তু তাদের লড়াই আবার কিছু ক্ষেত্রে জাতিগত, কিছু ক্ষেত্রে অস্তিত্বের সংকটের।

এই ভিন্ন ভাষার মানুষরা সংখ্যায় কম হওয়ায় বাংলার আধিপত্যের শিকার হন। আবার, বাংলার বাইরে বাকি ভাষাভাষীদের প্রায় এক ব্র্যাকেটে ফেলায় সেখানে আরেক ধরনের আধিপত্য দেখা যায়। পাহাড়ের বড় গোষ্ঠী চাকমা বা মারমাদের কাছে বাকিরা ম্লান হয়ে পড়েন। পাহাড়ের রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন ধরনের রাজনীতি হয় সমতলে থাকা সাঁওতালদের মতো অবাঙালি নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে। একদিকে নিজেদের জীবনাচরণ, প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে ভাষাকে বাঁচানোর সংগ্রাম।

এই মানুষগুলো কীভাবে ভাষাকে বাঁচাবেন? সেই লড়াইয়ের কৌশল কী হবে। শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে ভালো কোনো উপায় নেই। ফলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পাঠ্যবই এবং ভালো ভালো শিশুতোষ বই এসব ভাষায় অনুবাদ করা দরকার। সাহিত্যের রূপ কেমন হবে?

এই নিয়ে একটা অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব আছে। আফ্রিকান লেখক চিনুয়া আচেবে ‘আফ্রিকান ইংরেজিতে’ লেখালেখি করতেন। উনার যুক্তি ছিল, এর মাধ্যমে উনার সংস্কৃতি আরও ছড়িয়ে যাবে। ভাষা রক্ষায় সুবিধা হবে। বিপরীতে এনগুগি ওয়া থিয়োংগো। তিনি শুরুতে ইংরেজিতে লিখলেও পরে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন নিজের মাতৃভাষা গিকুইয়ু।

সেই তর্ক থেকে আবার বাংলাদেশে ফিরি। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর আলাপ তো করা হলো। কিন্তু উর্দুভাষীদের কী হবে? ভোজপুরিতে যারা কথা বলেন? আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর আগে পাকিস্তান আমলের ইতিহাসের কারণে উর্দু নিয়ে আমাদের কারও কারও বিবমিষা কাজ করে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিত ছিল উর্দুকে বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়া।

কিন্তু দোষটা তো উর্দু নিয়ে রাজনীতির, ভাষার নয়। যার মাতৃভাষা উর্দু, তাকে যদি আমরা এখন ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখি তবে কিন্তু আমরা ভাষাশহীদদের যে চেতনা তার ঠিক বিপরীতে, পাকিস্তানি শাসকদের মতোই আচরণ করছি। নানাসময় এ দেশে আসা ভোজপুরি ভাষার লোকেরা মূলত মেথর বা সমাজের চোখে নিম্নমানের কাজ করে। চা বাগানে কাজ করা মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহালী, সবর, পাসি, রবিদাস, হাজরা, নায়েক, বাউরি, তেলেগু, তাঁতি, কৈরী, দেশোয়ারা, বর্মা, কানু, পানিকা, কুর্মী, চাষা, অলমিক, মোদি, তেলি, পাত্র, মাঝি, রাজবংশী, মোদক, বাড়াইক, ভূমিজসহ বেশির ভাগ মানুষের নিজস্ব ভাষা এখন নেই। নিজেদের মধ্যে তারা ভোজপুরি ভাষাই ব্যবহার করেন। বলা বাহুল্য, প্রচণ্ড নিষ্পেষিত এই মানুষগুলোর ভাষা রক্ষার লড়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

তবে বাংলাদেশের প্রধান ভাষা হলেও বাংলারও লড়াই কম নয়। এই লড়াইটাও ঘরের এবং বাইরের। প্রথমত, বাংলার প্রমিতকরণের রাজনীতি। ঐতিহাসিকভাবে আমরা দেখি যে, বাংলা ভাষার প্রমিত রূপটি গঠিত হয়েছে উপনিবেশিক আমলে। মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত মানুষের ভাষা ও রুচির ওপর ভিত্তি করে প্রমিতকরণ হয়।

ফলত, এর সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের মুখের ভাষার একটা তফাত দেখা দেয়। নতুন দেশ এবং সেই দেশে কৃষক শ্রেণির শিক্ষিত হয়ে ওঠা এই দুই রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা ভাষাকে নতুন রূপ দিতে থাকে। এই লড়াইটা জরুরি, কারণ ভাষা দিন শেষে খুবই চলমান একটি বিষয়। স্থবিরতা দিয়ে ভাষা টিকে না। প্রবল প্রতাপশালী লাতিন ও সংস্কৃতের প্রমাণ।

ফলে ভাষা পুলিশি আচরণের বিরুদ্ধে, পুরনো চল আঁকড়ে ধরে ভাষাকে যারা স্থবির করতে চায় তাদের সঙ্গে লড়াইটা জরুরি। বিশ্বায়নের ফলে ভাষায় প্রচুর বিদেশি প্রতিশব্দ ঢুকে পড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভাষা হচ্ছে যোগাযোগের মাধ্যম, তা যত সহজ ও সাবলীল হয় তার কার্যকারিতা বাড়ে। ফলে ভাষায় যদি প্রচুর বিদেশি শব্দ ঢুকে ভাষাকে সহজ ও সাবলীল করে, তাকে পুলিশি বাধা দেওয়াটাও ভাষার সমৃদ্ধির বিরুদ্ধেই লড়াই। ইংরেজির মতো ভাষা প্রচুর বিদেশি শব্দ আত্মীকরণ করেই প্রচন্ড শক্তিশালী হয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, প্রমিতকরণকেও অগ্রাহ্য করা যাবে না। শুরুতেই বলছিলাম নানা ধরনের ডায়ালেক্টের কথা। প্রমিত কোনো রূপ না থাকলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভাষা বিপদে পড়বে। রাষ্ট্রীয় কাজ তো বটেই, মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতেও একটা প্রমিতরূপ দরকার। ফলে প্রমিতকরণের বিরুদ্ধে যে লড়াই তা হঠকারী যাতে না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা দরকার। ভাষা এমন এক বহতা নদী, একে বাইরে থেকে পানি ঢেলে জোর করে গতি পরিবর্তন করে বাঁচানো কঠিন। একে নিজের মতো চলতে দেওয়া জরুরি।

বাংলা ভাষার শেষ লড়াইটা বিদেশি ভাষার সঙ্গে। বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি ভাষাটা জানতেই হবে। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতে হিন্দি ভাষা নিয়ে বিপুল রাজনীতি হচ্ছে। হিন্দির আগ্রাসনে বাকিদের কোণঠাসা করার চেষ্টা হচ্ছে। এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে উপচে পড়ছে।

এই দুই ভাষা যেন বাংলাকে গিলে না খায় সেই লড়াই জরুরি। এর জন্য অবশ্য কেবল রাজনীতি বা আবেগ যথেষ্ট নয়। আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য, বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন জীবনের সব স্তরে বাংলাকে গ্রহণযোগ্য ও সাবলীল করতে হবে। জাপানিদের থেকে এই ব্যাপারে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য সব স্তরে জাপান নিজের ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই সমৃদ্ধির জোরেই সে শক্তভাবে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

লেখক, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত