বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার হয়েছে, হচ্ছে সেটি সবাই জানেন। তাহলে বন্ধ হচ্ছে না কেন? আসলে কালোটাকা দেশে থাকে কম, পাচার হয় বেশি। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায়, দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা মূলত কালোটাকা বা অবৈধভাবে অর্জিত। সংগত কারণেই দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকার পরিমাণ ঠিক কত সেটা বর্তমান বাস্তবতায় জানা সহজ নয়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের মূল কৌশল হচ্ছে আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং। এর মানে হচ্ছে, অধিকাংশ অর্থ পাচার বাণিজ্যভিত্তিক।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। এর ৮০ শতাংশই হয়েছে ব্যাংকের মাধ্যমে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে বুধবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘৮০ ভাগ অর্থ পাচার ব্যাংক মাধ্যমে’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হচ্ছে তার সিংহভাগই বিদেশি বাণিজ্যের মাধ্যমে হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাচার হচ্ছে। মূলত আমদানিতে বেশি মূল্য ও রপ্তানিতে কম মূল্য দেখিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচার করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানির অনুমতিপত্র জালিয়াতি করে পণ্য পাঠানো হয়েছে। আর যে মূল্যের পণ্য পাঠানো হয়েছে, তার চেয়ে কম মূল্য দেখানো হয়েছে। শুল্ক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ পাচারের ঘটনা বেশি ঘটছে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে।
তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে ৩৩টি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের ৮২১ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দেশের সবচেয়ে বড় অর্থপাচার কেলেঙ্কারির অন্যতম এই ঘটনা কিছুদিন আগে উদঘাটন হলেও এসব পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানাচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান ১৩ হাজার ৮১৭টি চালানে ৯৩৩ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করলেও দেশে এনেছে মাত্র ১১১ কোটি টাকা। বাকি ৮২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ ২৫টি দেশে পাচার করতে ভুয়া রপ্তানি নথি ব্যবহার করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ২০২০ সালের তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়, টাকার অঙ্কে তা প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা। সাত বছরে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
সরকারকে বিদেশি মুদ্রার সংকট মোকাবিলা করতে আইএমএফ থেকে সাড়ে তিন বছরের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ করতে হয়েছে, যা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যেমন বাংলাদেশকে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হতো না, তেমনি দেশে রিজার্ভ সংকটও তৈরি হতো না। এর চেয়েও বড় কথা, যে চ্যানেলেই অর্থ পাচার হোক সরকার কি সবকিছুই জানে? অর্থ পাচারের ঘটনা যেহেতু তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে, সে কারণেই কি সব পক্ষ চুপ!
বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম বড় হাব সিঙ্গাপুর। বৈশ্বিক আর্থিক গোপনীয়তার সূচকে দেশটির অবস্থান এখন তৃতীয়। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এ আর্থিক ও বাণিজ্যিক হাবের সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে সেখানে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বস্ত্র ও পোশাক খাতের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য খাতটির অনেক ব্যবসায়ীকে নিয়মিতভাবেই সেখানে আসা-যাওয়া করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের কেউ কেউ সেখানে অর্থ স্থানান্তর করছেন। এসব টাকা কোথায়, কোন দেশে যাচ্ছে তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে বের করা দরকার। এটা যদি করা যায়, তাহলে অর্থ পাচার বন্ধ হতে পারে। না হলে চলতেই থাকবে। আসলে মূল সমস্যা কোথায়, সরকার কি জানে না!
