শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার চাপ কমিয়ে যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী আনন্দের সঙ্গে শেখানোই নতুন শিক্ষাক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। আর এজন্য নতুন শিক্ষাক্রমে কমানো হয়েছে পরীক্ষা নির্ভরতা। বাড়ানো হয়েছে শিখনকালীন মূল্যায়ন। অর্থাৎ শিক্ষকরাই যার যার শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন। স্বাভাবিকভাবেই আশা করা হয়েছিল, এতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট-কোচিং কমবে। কিন্তু স্কুল-কলেজে দেখা যাচ্ছে এর উল্টো চিত্র। নতুন শিক্ষাক্রমের পর ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে শিক্ষকদের প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য।
অভিভাবকরা বলছেন, আগে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে প্রাইভেট পড়তো বা কোচিং করতো। এর বাইরে অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে কেউ হয়তোবা আরেকটাতে প্রাইভেট পড়তো, আবার কেউ পড়তো না। শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিজ স্কুলের শিক্ষকের বাইরে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী, কোচিং সেন্টার বা যার যার পছন্দের জায়গায় পড়তো। কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের হাতেই বেশিরভাগ নম্বর থাকায় শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে চার-পাঁচটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে। অনেক শিক্ষক আবার প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন।
গত বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়। এ বছর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। ২০২৫ সালে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি এবং এবং দশম শ্রেণি যাতে যুক্ত হবে। আর ২০২৬ সালে যুক্ত হবে একাদশ ও ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণি। নতুন এই শিক্ষাক্রমে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শিখনকালীন মূল্যায়ন শিক্ষকের হাতে রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাইভেট-কোচিং একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য মনিটরিংয়ে অনেক বেশি জোর দিতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তৎপর হতে হবে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠান প্রধানকেও উদ্যোগী হতে হবে। আর সবশেষে শিক্ষককে তো সচেতন হতেই হবে। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু সবকিছুর সমন্বয় হয়তো সেভাবে হচ্ছে না। প্রাইভেট বন্ধ করতে বললে অনেক শিক্ষক অপ্রতুল বেতনের কথা বলবেন। সে ব্যাপারে সরকারের নিশ্চয়ই চিন্তা আছে। কিন্তু বেতন কম বলে যে তিনি অন্যায় করবেন, নিয়ম ভেঙ্গে প্রাইভেট পড়াবেন, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
সম্প্রতি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার গণিত বিভাগের শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের যৌন নির্যাতনের ঘটনায় বেরিয়ে আসে স্কুলের শিক্ষকদের প্রাইভেট-কোচিংয়ের ভয়াবহ চিত্র। তিনি একটি বাসা ভাড়া নিয়ে দুই-তিনশ ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াতেন। নিজেকে নতুন শিক্ষাক্রমের জেলা মাস্টার ট্রেইনার (গণিত) ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পরীক্ষক (গণিত ও উচ্চতর গণিত) হিসেবে পরিচয় দিতেন। তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে নম্বর কম দিতেন। ফলে ছাত্রীরা বাধ্য হতো প্রাইভেট পড়তে। আর এই সুযোগে তিনি ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করতেন। মুরাদ হোসেনের যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে নিয়ে আসেন ভিকারুননিসারই আজিমপুর শাখার অপর দুই ‘কোচিংবাজ’ শিক্ষক কানিজ ফাতেমা ও লাভলী ইসলাম। যারা মুরাদ হোসেনের প্রাইভেট বাণিজ্যর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।
প্রাইভেট পড়ানোর ক্ষেত্রে সারা দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র প্রায় একই। রাজধানীর পাশাপাশি এ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে বিভাগ ও জেলা-উপজেলার স্কুলেও। আগে যেসব শিক্ষক তাদের বিষয়ের কারণে প্রাইভেট-কোচিংয়ে শিক্ষার্থী পেতেন না তাদের ব্যবসাও এখন রমরমা। নতুন শিক্ষাক্রম শুরুর পর বাংলা, বিজিএস, আইসিটি, ধর্মের মতো বিষয়গুলোর শিক্ষকরা একসঙ্গে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। আবার বেশকিছু শিক্ষক একসঙ্গে বাড়িভাড়া করে কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন। এতে স্কুল-কলেজের আশেপাশের বাড়িগুলো শিক্ষকদের দখলে চলে গেছে। তারা রীতিমত বেঞ্চ-টেবিল সাজিয়ে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কোচিং-প্রাইভেট পড়াচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে গড়পড়তা প্রায় সব স্কুলেই একটি কক্ষে কমপক্ষে ৫০ জন থেকে শুরু করে ৭০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ক্লাস হয়। বড় স্কুলের এক ক্লাসে থাকে এরচেয়েও বেশি শিক্ষার্থী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজ শুধু পড়া দেওয়া এবং দু-চারজনের পড়া ধরা। একটি বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলা, দুর্বলদের বাড়তি যত্ন নেওয়া বা কঠিন বিষয়ে বেশি সময় দেওয়ার রীতি কোনো স্কুলেই নেই বললেই চলে। ধর্ম হোক আর গণিত হোক, একটি বিষয়ের ক্লাসে পাঠদানের সময় ৪৫ মিনিট। ওই সময়ের মধ্যে খুব সামান্য অংশ শিক্ষার্থীদের বোঝাতে ব্যয় করেন শিক্ষক।
রাজধানীতে একটি স্কুলও পাওয়া যাবে না, যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ে নিরুৎসাহ করছেন। ঢাকার সুপরিচিত রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ সবকটির একই অবস্থা।
তবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য অনেক। সেখানে একটি ক্লাসে একসঙ্গে ২৫-৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর পাঠদান হয় না। শিক্ষকরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় যত্ন নেন। দুর্বলদের দিকে আলাদা নজর দেওয়া হয়। ৪৫ মিনিটের বদলে কঠিন বিষয়ে দেড় ঘণ্টাও ক্লাস হয়। এমনকি প্রয়োজনে তিন ঘণ্টাও ক্লাস নেওয়া হয়। অবশ্য শিক্ষকদের বেতন সেখানে বেশি, তাদের প্রাইভেট টিউশন করিয়ে বাড়তি আয়ের প্রয়োজন হয় না।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক আবদুল মজিদ সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এতদিন আমরা জিপিএ ৫-এর পেছনে দৌড়াতাম, এখন ‘ত্রিভুজ’-এর পেছনে দৌড়াতে হচ্ছে। এজন্য পাঁচ-ছয়জন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে। এখন যেহেতু শিক্ষকরাই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করেন। এজন্য প্রাইভেটে কী পড়ালেন সেটা বিষয় নয়, শিক্ষার্থী যে প্রাইভেট পড়ে সেটাই বড় বিষয়। এছাড়া শিক্ষকরাই ক্লাসে ক্লাসে প্রকাশ্যেই প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করছেন। না পড়লে শিক্ষার্থীদের নানাভাবে মানসিক টর্চারও করা হয়। এখন ক্রাফট ও ড্রইং এ জোর দেওয়ায় চারুকারু শিক্ষকের কাছেও পড়তে হচ্ছে।’
অথচ নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোচিং-প্রাইভেট পড়তে হয় না। অথচ রাজধানীর কয়েকটি স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষকরা বিপুল উৎসাহে প্রাইভেট-কোচিং করাচ্ছেন। প্রতি বিষয়ে ব্যাচে পড়াতে নিচ্ছেন ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। একজন শিক্ষক একাই ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ান। প্রতিমাসে তারা প্রাইভেট পড়িয়েই চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করছেন। এক্ষেত্রে স্কুলকে তারা সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন।
যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ভিকারুননিসার গণিত শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারকে গ্রেপ্তারের পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্কুলটির শিক্ষকদের কোচিং বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি ও পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক ড. ফারহানা খানম সবচেয়ে বেশি প্রাইভেট পড়ান বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তাকে দেখে উৎসাহিত হন অন্য শিক্ষকরা। সিদ্ধেশ্বরীর ৬৪ বইঘর গলিতে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য তিনি একটি ফ্ল্যাটই কিনে নিয়েছেন। ভিকারুননিসার পাশেই তিন কক্ষের এই ফ্ল্যাটে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রাইভেট পড়ান তিনি।
এছাড়াও ভিকারুননিসার শিক্ষক নাসিমা আক্তার (বায়োলজি, কলেজ), জহিরুল ইসলাম (ইংরেজি ভার্সন), মিল্কি (রসায়ন, ইংরেজি ভার্সন), রহমত উল্লাহ (পদার্থ, ইংরেজি ভার্সন), মো. শাহজাজান (ইংরেজি), জিয়াউর রহমান (দিবা শাখা), সুবল দেবনাথ (পদার্থ), সীমা সারমিন (বাংলা), মোরশেদা আইরিন (জীববিজ্ঞান), মোছা. শাহানাজ বেগম (জীববিজ্ঞান), মো. শরিফুল ইসলাম (আইসিটি), সুমন ফকির (বাংলা), আব্দুল হাই (বাংলা), রোকসানা (সমাজ), সুব্রত (ইংরেজি) ও সুবলসহ (গণিত) আরও অনেক শিক্ষক বিস্তৃত পরিসরে প্রাইভেট পড়ানো বাণিজ্যে জড়িত।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিজাম কামাল (ইংরেজি), সাখাওয়াত সোহেল (বিজিএস), লাভলী রেজা (ইংরেজি), মাহী উদ্দিন, জিসান আহমেদ (গণিত), বেলাল আহমেদ খান (পদার্থ বিজ্ঞান), তানিয়া আক্তার (বাংলা), খলিলুর রহমান (গণিত), সেলিম রেজা (বাংলা), সিহাব জব্বার (বিজিএস) এবং উম্মে ফাতিমা (বিজিএস) শাহজাহানপুর ও এর আশপাশের এলাকায় গণহারে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন।
মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রূপনগর শাখার মোহাম্মদ আলী পাপ্পু (হিসাববিজ্ঞান), ফেরদৌস হাসান (বাংলা), শওকত কবির (পদার্থ), মো. ইসরাফিল (ইংরেজি) এবং কয়েস উর রহমানও (গণিত) বিস্তৃত পরিসরে প্রাইভেট পড়ান। এছাড়া বিদ্যালয়টির শেওড়াপাড়া শাখার নূরে আলম (গনিত), মূল বালিকা শাখার সুশান্ত কুমার (ইংরেজি) এবং ইব্রাহীমপুর শাখার রাজ্জাক জোয়ার্দ্দার (রসায়ন) কোচিংবাজ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।
সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। সেখানে একজন শিক্ষককে তার প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ১০ জন শিক্ষার্থী পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে শুধুমাত্র অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান প্রধান অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি বিষয়ে মেট্টোপলিটন শহরে মাসিক ৩০০ টাকা, জেলা শহরে ২০০ টাকা এবং উপজেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে ১৫০ টাকা করে রসিদের মাধ্যমে নেয়া যাবে। কিন্তু নীতিমালা করেই যেন দায়িত্ব সেরেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এগুলোর তেমন কোনো মনিটরিং করে না মাউশি অধিদপ্তর।
